ইসলামী আইনে পিতা জীবদ্দশায় মেয়েদের নামে সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করার বিধান কী?
Family Life · Hanafi
Question
বি:দ্র: বাবার মৃত্যুর পর চাচারা মেয়েদেরকে সম্পত্তি দিবে এর সম্ভাবনা নেই।
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো: দাদার সম্পত্তি পিতার নামে এসেছে, পিতা তার জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তির সবটুকুই মেয়েদের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন (ছেলে সন্তান নেই)। এখন জানতে চান, এতে কি কোনো গুনাহ হবে?
উত্তর: শরিয়তের দৃষ্টিতে, পিতা তার নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তি জীবদ্দশায় যাকে খুশি দান করতে পারেন। এটি তার বৈধ অধিকার। তবে ইসলামী আইন (ফিকহ) অনুযায়ী সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও সমতা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. পিতার জীবদ্দশায় দান (হেবা):
- পিতা তার জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি কারো নামে রেজিস্ট্রি করে দিলে তা "হেবা" (দান) হিসেবে গণ্য হবে।
- হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়াহ ও রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে, পিতা তার জীবদ্দশায় সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করা ওয়াজিব (আবশ্যক)। যদি কোনো সন্তানকে অন্য সন্তানের চেয়ে বেশি দেওয়া হয়, তবে তা মাকরুহে তাহরিমি (ঘৃণিত কাজ) হবে এবং গুনাহের কারণ হবে।
- হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: নবী (সা.) বলেছেন, "তোমরা সন্তানদের মধ্যে দান-উপহারের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করো।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৮৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২৩)
২. আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্যতা:
- যেহেতু আপনার পিতার কোনো ছেলে সন্তান নেই, তাই তার কাছে শুধু মেয়েরাই উত্তরাধিকারী।
- এই অবস্থায় পিতা তার সমস্ত সম্পত্তি মেয়েদের নামে রেজিস্ট্রি করে দিলে সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে না, কারণ সব সন্তানই (মেয়েরা) সমান অংশ পাচ্ছে। তাই এখানে "সমতা রক্ষার" শর্তটি পূরণ হয়ে যাচ্ছে।
- তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: পিতা যদি জীবদ্দশায় সম্পত্তি দান করে দেন, তাহলে তা তার মৃত্যুর পর আর "উত্তরাধিকার" (মিরাস) হিসেবে বণ্টিত হবে না। যেহেতু তিনি নিজের জীবদ্দশায় তা মেয়েদের মালিকানা করে দিয়েছেন। এটি সম্পূর্ণ বৈধ।
৩. চাচাদের সম্ভাব্য আপত্তি:
- আপনি উল্লেখ করেছেন, বাবার মৃত্যুর পর চাচারা মেয়েদের সম্পত্তি দেবে না। এটি একটি পারিবারিক জটিলতা।
- ইসলামী আইনে, পিতা যদি তার সম্পত্তি জীবদ্দশায় মেয়েদের নামে লিখে দেন, তাহলে চাচাদের সেখানে কোনো দাবি থাকে না। কারণ পিতার মৃত্যুর পর শুধুমাত্র তার ওয়ারিশরাই (উত্তরাধিকারী) সম্পত্তির মালিক হয়। যেহেতু পিতা সম্পত্তি দান করে দিয়েছেন, তাই তা আর তার সম্পত্তি থাকে না, ফলে চাচারা (যারা ভাই) সেখানে উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি করতে পারবে না।
- রদ্দুল মুহতার-এ আছে, "যদি পিতা তার জীবদ্দশায় সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টন করে দেন এবং তা কবজা (দখল) করে দেন, তবে তা বৈধ এবং তা আর মিরাসের অন্তর্ভুক্ত হবে না।"
৪. গুনাহের বিষয়:
- যেহেতু আপনার পিতার ছেলে সন্তান নেই এবং তিনি তার সমস্ত সম্পত্তি তার মেয়েদের (একমাত্র সন্তানদের) মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করে দিয়েছেন, তাই এতে কোনো গুনাহ হবে না। বরং এটি একটি বৈধ ও নিরাপদ ব্যবস্থা, যাতে মেয়েরা বঞ্চিত না হয়।
- তবে যদি পিতা কোনো মেয়েকে বেশি এবং অন্য মেয়েকে কম দিতেন, তাহলে সেটা গুনাহ হতো। কিন্তু যেহেতু সব মেয়েকে সমানভাবে দেওয়া হয়েছে, তাই এটি সম্পূর্ণ বৈধ।
৫. একটি সতর্কতা:
- পিতা যদি সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার পরও নিজের কাছে রেখে দেন (দখল না দিয়ে) এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজেই ভোগদখল করেন, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি "দান" হিসেবে সম্পূর্ণ হবে না। দান সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য দানকৃত সম্পত্তির দখল (কবজা) হস্তান্তর করা জরুরি।
- হানাফি ফিকহের নিয়ম: "হেবা (দান) কবজা (দখল) ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না।" (আল-হিদায়াহ, কিতাবুল হিবা)। তাই রেজিস্ট্রি করার সাথে সাথে মেয়েদের দখলে দিয়ে দেওয়া জরুরি। যদি রেজিস্ট্রি করে দেন কিন্তু দখল না দেন, তাহলে তা দান হিসেবে গণ্য হবে না এবং মৃত্যুর পর তা মিরাস হিসেবে বণ্টিত হবে।
সারসংক্ষেপ:
- পিতার ছেলে সন্তান না থাকায় এবং সব মেয়েকে সমান অংশ দেওয়ায় কোনো গুনাহ নেই। এটি বৈধ।
- রেজিস্ট্রি করার সময় দখল (কবজা) হস্তান্তর নিশ্চিত করতে হবে।
- পরবর্তীতে চাচারা চাইলেও এই সম্পত্তিতে দাবি করতে পারবে না, কারণ পিতা জীবদ্দশায় তা মেয়েদের মালিকানা করে দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন। (আমিন)