জমির ওপর যাকাত প্রদান করা আবশ্যক?
Zakat and Charity · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি যে জমিগুলো কিনেছেন সেগুলো মূলত বিক্রির উদ্দেশ্যে কেনা হয়েছে (অর্থাৎ বাণিজ্যের জন্য), যদিও বিকল্প হিসেবে ভাড়া দেওয়ার কথাও ভেবেছেন। ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় একে "উরুদ আল-তিজারাহ" (বাণিজ্যের পণ্য/সম্পদ) বলা হয়।
নিম্নে সালাফি/আহলে হাদিস পণ্ডিতদের মত অনুযায়ী বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো:
১. জমির উপর যাকাতের বিধান
ক. যদি জমি বিক্রির উদ্দেশ্যে কেনা হয় (বাণিজ্যের নিয়ত): যদি আপনি জমি কেনার সময় মূল উদ্দেশ্য ছিল "ভালো দাম পেলে বিক্রি করা" (যা আপনার প্রশ্নে স্পষ্ট), তাহলে এই জমিগুলো বাণিজ্যের পণ্য হিসেবে গণ্য হবে। প্রতিবছর যাকাতের হিসাব করার সময় এই জমিগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য ধার্য করতে হবে এবং অন্যান্য নগদ অর্থ, সোনা-রূপা বা ব্যবসার মালের সাথে যোগ করে মোট সম্পদের ২.৫% যাকাত দিতে হবে।
দলিল:
- আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা উপার্জন করো তা থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি তা থেকে ব্যয় করো।" (সূরা আল-বাকারা: ২৬৭)
- ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ক্রয় করে (পণ্য), তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে।" (দারাকুতনী, হাদিসটি সহীহ)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন:
"যে ব্যক্তি জমি বা ঘর ক্রয় করে বিক্রির উদ্দেশ্যে, তা বাণিজ্যের মাল। প্রতি বছর তার মূল্য হিসাব করে যাকাত দিতে হবে।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ২৫তম খণ্ড)
শায়খ ইবনে বায (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: "যে ব্যক্তি জমি কিনেছে বিক্রির উদ্দেশ্যে, তার উপর যাকাত আছে কি?" তিনি বলেন:
"হ্যাঁ, যদি সে জমি বিক্রির উদ্দেশ্যে ক্রয় করে থাকে, তবে তা বাণিজ্যের পণ্য। প্রতি বছর তার বাজারমূল্য নির্ধারণ করে ২.৫% যাকাত দিতে হবে।" (মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে বায, ১৪তম খণ্ড)
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহঃ) বলেন:
"যে জমি বিক্রির উদ্দেশ্যে কেনা হয়, তা বাণিজ্যের পণ্য। প্রতি বছর যাকাতের হিসাব করার সময় তার মূল্য ধার্য করতে হবে এবং ২.৫% যাকাত দিতে হবে।" (আশ-শারহুল মুমতি', ৬ষ্ঠ খণ্ড)
খ. যদি জমি ভাড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে কেনা হয় (স্থায়ী সম্পদ): যদি আপনি জমি কেনার সময় মূল উদ্দেশ্য ছিল "ঘর তুলে ভাড়া দেওয়া" (স্থায়ী আয়ের জন্য), তাহলে জমির মূল্যের উপর যাকাত নেই। তবে, ভাড়া থেকে যে আয় হবে, তা যদি এক বছর পর্যন্ত জমা থাকে এবং নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে সেই জমাকৃত অর্থের উপর যাকাত দিতে হবে।
দলিল:
- রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"মুসলিমের উপর তার ক্রীতদাস ও ঘোড়ার (ব্যবহারের জন্য) কোনো সদকা নেই।" (সহীহ বুখারী: ১৪৬৩)
- ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "যে ঘর বা জমি ভাড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাখে, তার উপর মূল্যের যাকাত নেই, তবে ভাড়ার আয়ের উপর যাকাত আছে যদি তা নিসাব পরিমাণ হয় এবং এক বছর পূর্ণ হয়।" (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা)
শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:
"ভাড়ার জন্য রাখা জমি বা বাড়ির মূল্যের উপর যাকাত নেই। তবে ভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ যদি এক বছর পর্যন্ত জমা থাকে এবং নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে তার উপর ২.৫% যাকাত দিতে হবে।" (আল-মুলাখ্খাস আল-ফিকহী)
২. আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান
যেহেতু আপনি বলেছেন: "ভালো দাম পেলে বা দাম বাড়লে বিক্রি করব অথবা সেগুলোতে ঘর তুলে ভাড়া দিব" — এখানে মূল নিয়ত হলো বিক্রি করা, আর ভাড়া দেওয়া হলো বিকল্প ব্যবস্থা। তাই এই জমিগুলো বাণিজ্যের পণ্য হিসেবে গণ্য হবে।
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহঃ) এই ধরনের ক্ষেত্রে বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি জমি কেনে এই নিয়তে যে, দাম বাড়লে বিক্রি করবে, তবে তা বাণিজ্যের পণ্য। আর যদি কেনে এই নিয়তে যে, ভাড়া দিয়ে লাভবান হবে, তবে তা স্থায়ী সম্পদ। যদি উভয় নিয়ত থাকে, তবে প্রধান নিয়তটি দেখতে হবে। যদি প্রধান নিয়ত বিক্রি হয়, তবে যাকাত দিতে হবে।" (ফাতাওয়া নুরুন আলাদ-দারব)
৩. যাকাত কীভাবে ধার্য করবেন?
যেহেতু জমিগুলো বাণিজ্যের পণ্য, তাই:
- প্রতি বছর (চান্দ্রবর্ষ হিসাবে) যাকাতের হিসাব করার সময় জমিগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণ করুন।
- আপনার অন্যান্য নগদ অর্থ, সোনা-রূপা, ব্যবসার মাল ইত্যাদির সাথে যোগ করুন।
- মোট সম্পদের পরিমাণ যদি নিসাব (৮৫ গ্রাম সোনার মূল্য বা ৫৯৫ গ্রাম রূপার মূল্য) পরিমাণ হয়, তাহলে ২.৫% যাকাত প্রদান করুন।
উদাহরণ:
- ৩টি জমির বর্তমান বাজারমূল্য = ৩০,০০,০০০ টাকা
- নগদ অর্থ = ২,০০,০০০ টাকা
- মোট = ৩২,০০,০০০ টাকা
- যাকাত = ৩২,০০,০০০ × ২.৫% = ৮০,০০০ টাকা
৪. গুরুত্বপূর্ণ নোট
- যাকাতের বছর হিসাব করার সময় আপনি যে তারিখ থেকে ব্যবসা শুরু করেছিলেন বা জমি কেনার তারিখ থেকে হিসাব করতে পারেন।
- জমি বিক্রি করার আগ পর্যন্ত প্রতি বছর যাকাত দিতে হবে।
- যদি জমি বিক্রি করে দেন, তাহলে বিক্রয়লব্ধ অর্থ নগদে পরিণত হবে এবং সেটিও যাকাতের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হবে।
উপসংহার: আপনার জমিগুলো যেহেতু বিক্রির উদ্দেশ্যে কেনা, তাই সেগুলোর বর্তমান বাজারমূল্যের উপর প্রতি বছর ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা আপনার যাকাত কবুল করুন এবং আপনার সম্পদে বরকত দিন। (আমিন)
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।