দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও ডিপ্রেশনের কারণে মনে যদি আল্লাহ দূরে, দোয়া কবুল হবে না, এমন চিন্তা আসে, তাহলে করণীয় কি?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 3806
Questioner: Afsana Sultana Ankon
Question Asked: 11 Aug 2026, 12:13 PM
Reviewed & Published: 11 Aug 2026, 12:18 PM
Views: 30
Tokens: 5,917
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমি অনেক অসুস্থ। অনেক বেশি অষুধ খেয়ে মাথা আগের মত কাজ করেনা। মাঝেমাঝে ডিপ্রেশন চলে আসে। মনে হয় আল্লাহ অনেক দূরে। দুয়া করার সময়ও আল্লাহর অস্তিত্ব আগের মত ফিল হয়না, শান্তি লাগেনা। কবুল হওয়ার ইয়াক্বীন থাকেনা। হঠাৎ হঠাৎ এমন চিন্তা আসে, যে আমার অসুখ কখনো ভালো হবেনা। আল্লাহ আমার দুয়া কবুল করবেননা। আল্লাহ চাননা আমি জান্নাতে যাই। আবার মনে হয় যে জীবন-বাঁচানো, হিদায়ত, শিফা এগুলো আল্লাহ আমাকে দিবেননা তাই মানুষের কাছে চেয়ে ফেলি? এসব চিন্তা আসার সাথেসাথে আমি বুঝি যে এগুলো ভুল চিন্তা। তখন তাড়াতাড়ি বলি, যে আল্লাহ তুমি ছাড়া এগুলো আর কেউ দিতে পারবেনা৷ তখনও আবার কানের কাছে বাজতে থাকে যে, "দিতে পারবে।" আর শান্তিও লাগেনা। এসব চিন্তার জন্য কি আমার ঈমান চলে গেছে, নাকী এগুলো শয়তানের ওয়াসওয়াসা?
কী করলে এসব চিন্তা আসবেনা?

Answer

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন/ভাই, আপনার প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার বর্ণিত উপসর্গগুলো (দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ডিপ্রেশন, এবং ধর্মীয় বিষয়ে উদ্বেগজনক চিন্তা) অত্যন্ত কষ্টদায়ক। আমরা আপনার জন্য দোয়া করি, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে পূর্ণ সুস্থতা দান করুন এবং আপনার অন্তরকে শান্তি দান করুন। (আমিন)

প্রথমেই জেনে রাখুন, আপনার ঈমান চলে যায়নি ইনশাআল্লাহ। আপনি যে চিন্তাগুলোর কথা বলেছেন এবং সাথে সাথে সেগুলোকে ভুল মনে করে আল্লাহর দিকে ফিরে যাচ্ছেন, এটি আপনার ঈমানেরই প্রমাণ। একজন মুমিনের অন্তরেই শয়তান এসব ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) সৃষ্টি করে থাকে। যাদের অন্তরে ঈমান নেই, তাদেরকে শয়তান এসব নিয়ে ভাবায়ও না।

১. আপনার ঈমান চলে গেছে কি না? না, আপনার ঈমান চলে যায়নি। এটি সম্পূর্ণরূপে শয়তানের ওয়াসওয়াসা। হাদিস শরিফে এসেছে, সাহাবায়ে কিরাম (রা.) একদা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে আরজ করলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মনে এমন কিছু খেয়াল আসে, যা বলতে আমাদের কারো পক্ষে খুবই লজ্জাজনক।" রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, "সত্যিই কি তোমাদের এমন খেয়াল আসে?" তারা বললেন, "হ্যাঁ।" তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, "এটাই তো (স্পষ্ট) ঈমান।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩২)। অর্থাৎ, এই খেয়াল আসা এবং তা অপছন্দ করা ও প্রতিরোধ করাই হলো ঈমানের প্রমাণ। শয়তান মুমিনের ঈমান নষ্ট করার জন্যই এসব কুমন্ত্রণা দেয়, কিন্তু আপনি যেহেতু সাথে সাথে তা প্রত্যাখ্যান করছেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করছেন, তাই আপনার ঈমান অটুট আছে।

২. এটি কি শয়তানের ওয়াসওয়াসা? হ্যাঁ, এটি সম্পূর্ণ শয়তানের ওয়াসওয়াসা এবং তার ধোঁকা। শয়তান অসুস্থতা ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মুমিনের মনে হতাশা ও আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। কুরআন মজিদে আল্লাহ তা'আলা বলেন, "শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়।" (সূরা আল-বাকারা: ২৬৮)। আপনার মনে যে চিন্তাগুলো আসছে—যেমন "আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করবেন না", "আল্লাহ আমাকে জান্নাতে নিতে চান না", "আল্লাহ আমাকে শিফা দেবেন না"—এগুলো সবই শয়তানের পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণা (সুয়ে-জান) সৃষ্টির চেষ্টা। আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা (হুসনে-জান) রাখা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, "আমি আমার বান্দার ধারণা অনুযায়ী তার সাথে আচরণ করি।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৪০৫)। তাই আল্লাহর প্রতি সর্বদা ভালো ধারণা রাখুন।

৩. কী করলে এসব চিন্তা আসবে না? এসব চিন্তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হয়তো কঠিন, তবে এগুলো মোকাবিলার কার্যকরী উপায় রয়েছে। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেওয়া হলো:

  • ১. চিন্তাকে গুরুত্ব না দেওয়া: যখনই এসব চিন্তা আসবে, তখনই বুঝে নিন এটি শয়তানের পক্ষ থেকে। এতে ভয় পাবেন না এবং চিন্তাটিকে গুরুত্ব দেবেন না। যত বেশি গুরুত্ব দেবেন বা ভয় পাবেন, শয়তান তত বেশি সুযোগ পাবে। চিন্তাটিকে উপেক্ষা করুন এবং "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ে আল্লাহর কাছে পানাহ চান। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি শয়তানের কুমন্ত্রণা অনুভব করবে, সে যেন 'আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি' বলে ঘোষণা করে।" (মুসনাদ আহমাদ)।

  • ২. আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করা: আল্লাহর রহমত, দয়া এবং ক্ষমা সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের আয়াতগুলো বেশি বেশি পড়ুন এবং চিন্তা করুন। আল্লাহ বলেন, "বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)। এই আয়াত থেকে জেনে নিন, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি শয়তানের কাজ।

  • ৩. দোয়া ও যিকিরে লিপ্ত থাকা: নামাজের পর, সকাল-সন্ধ্যায় এবং যেকোনো সময় আল্লাহর যিকির করুন। "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" (আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি বা উপায় নেই) বেশি বেশি পড়ুন। এটি শয়তানের বিরুদ্ধে ঢালস্বরূপ। দোয়া করার সময় মনে রাখবেন, দোয়া কবুল হওয়ার জন্য শর্ত হলো আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে চাওয়া, তবে কবুল হওয়া আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। দোয়া কবুল হতে দেরি হওয়া বা না হওয়া আমাদের জন্য ভালোও হতে পারে। হাদিসে আছে, মুমিনের দোয়া কবুল হয়, হয় দুনিয়াতে, না হয় আখিরাতে, অথবা তার থেকে কোনো বিপদ দূর করা হয়। (মুসনাদ আহমাদ)।

  • ৪. চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া: আপনি যে ওষুধ সেবন করছেন এবং ডিপ্রেশনে ভুগছেন, এটি একটি মানসিক রোগ। এটিরও চিকিৎসা প্রয়োজন। একজন ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নিন এবং নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যান। মনে রাখবেন, চিকিৎসা করাও আল্লাহর নির্দেশ এবং এটি তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "প্রতিটি রোগেরই নিরাময় আছে।" (সহিহ বুখারি)।

  • ৫. মানুষের কাছে চাওয়া থেকে বিরত থাকা: আপনার মনে যে চিন্তা আসে, "মানুষের কাছে চেয়ে ফেলি", এটি শয়তানের আরেকটি কুমন্ত্রণা। আল্লাহর কাছে চাওয়াই হলো ইবাদত। মানুষের কাছে চাওয়া আল্লাহর কাছে চাওয়ার বিপরীত। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করুন, সবকিছু দান করার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনি ছাড়া কেউ উপকার বা অপকার করতে পারে না। কুরআনে আল্লাহ বলেন, "যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো কষ্ট দেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই। আর যদি তিনি তোমাকে কল্যাণ দেন, তবে তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।" (সূরা আল-আনআম: ১৭)।

  • ৬. ধৈর্য ধারণ করা: অসুস্থতা ও বিপদে ধৈর্য ধরার নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন। ধৈর্যের বিনিময়ে আল্লাহ অফুরন্ত পুরস্কার দেবেন। হাদিসে আছে, "মুসলিমের জন্য যে কোনো কষ্ট, রোগ, দুশ্চিন্তা, এমনকি কাঁটাবিদ্ধ হওয়া পর্যন্ত যা কিছু ঘটে, এর বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন।" (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। তাই এই অসুস্থতাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা মনে করুন এবং ধৈর্য ধরুন। এটি আপনার জন্য জান্নাতের পথকে সহজ করবে।

  • ৭. আলেম বা বিশ্বস্ত মানুষের সাথে কথা বলা: আপনার এই সমস্যা সম্পর্কে পরিবারের কাউকে বা কোনো বিশ্বস্ত আলেমকে জানান। তাদের সাথে কথা বললে মন হালকা হবে এবং তারা আপনাকে সঠিক পথ দেখাতে পারবেন। একা একা চিন্তা না করে কারো সাথে শেয়ার করুন।

মনে রাখবেন: এই চিন্তাগুলো আপনার দোষ বা গুনাহের কারণে আসছে না, বরং এটি আপনার অসুস্থতা ও শয়তানের প্ররোচনার কারণে আসছে। আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত এই চিন্তাগুলোকে মিথ্যা মনে করছেন এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি নিরাপদ। আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হবেন না। আল্লাহ আপনার অসুস্থতা দূর করে দেবেন এবং আপনাকে শান্তি দান করবেন ইনশাআল্লাহ।

আপনার জন্য বিশেষ দোয়া: اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَأْسَ اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا (উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বান্নাস, আজহিবিল বা'সা, ইশফি আনতাশ শাফি, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউকা, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাকামা) (অর্থ: হে আল্লাহ! মানুষের প্রতিপালক! আপনি এই কষ্ট দূর করুন এবং আরোগ্য দান করুন। আপনিই আরোগ্য দানকারী। আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দান করুন যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখবে না।) (সহিহ বুখারি)

আল্লাহ তা'আলা আপনাকে দ্রুত সুস্থতা দান করুন এবং আপনার অন্তর থেকে এসব ওয়াসওয়াসা দূর করে দিন। (আমিন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.