ঘড়ি ও মানিব্যাগ পবিত্র করা সম্পর্কে

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 3774
Questioner: Farhan
Question Asked: 10 Aug 2026, 03:18 PM
Reviewed & Published: 10 Aug 2026, 03:47 PM
Views: 14
Tokens: 4,771
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।

১. গোসল শেষ করে কাপড় পরার পর আমি ফেস ওয়াশ দিয়ে মুখমণ্ডল ধুয়েছিলাম। এটাতে আলকোহল (alcohol) আছে, ধোয়ার সময় পানি কাপড়ে লাগতে পারে। আমার এই কাপড়ে ও শরীরে কি আমি নামাজ, কুরআন পড়া, তাসবিহ পড়া ইত্যাদি পারবো?

২. আমি হোমিওপ্যাথি ঔষধ সেবন করছি যাতে একটু কড়া গন্ধ আছে, আমি কি এই অবস্থায় নামাজ, কুরআন পড়া, তাসবিহ পড়া ইত্যাদি পারবো?

৩. যে টেবিলে কুরআন শরীফ পড়বো, সেই টেবিল আমার মনে হচ্ছে যে নাপাক হলেও হতে পারে, নিশ্চিত না। আমি কি নিচে কাগজ বিছিয়ে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারবো?

৪. আমার ঘড়ি ও মানিব্যাগে নাপাক পানি লেগেছিল। বেশি করে ধুতে গেলে বিশেষ করে ঘড়িতে সমস্যা হতে পারে। শুধু ভিজা হাতে (টপ টপ করে পানি পড়বে না হাত থেকে) ঘড়ি ও মানিব্যাগ মুছে নিতে পারবো?

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নরূপ দেওয়া হলো। আশা করি, উত্তরগুলো হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী হবে।


১. ফেস ওয়াশে (Alcohol যুক্ত) পানি কাপড়ে লাগলে নামাজ-কুরআন পড়া যাবে কি?

উত্তর: আধুনিক ফেস ওয়াশ, সাবান, শ্যাম্পু বা প্রসাধনীতে যে অ্যালকোহল (Alcohol) থাকে, তা সাধারণত সিন্থেটিক (কৃত্রিম) বা রাসায়নিকভাবে প্রস্তুতকৃত হয়ে থাকে, যা নাপাক (অপবিত্র) নয়। এমনকি যদি তা আঙুর বা খেজুর থেকেও তৈরি হয়, কিন্তু এমনভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরিবর্তিত হয়ে যায় যে তা আর মাদকদ্রব্য হিসেবে গণ্য হয় না, তাহলেও তা ব্যবহার করা জায়েয এবং তা নাপাক নয়।

আপনি ফেস ওয়াশ দিয়ে মুখ ধোয়ার পর যে পানি কাপড়ে লেগেছে, তা যদি উক্ত অ্যালকোহলযুক্ত ফেস ওয়াশের সাথে মিশ্রিত হয়েও থাকে, তবুও তা নাপাক নয়। তাই আপনার কাপড় ও শরীর পবিত্রই থাকবে। এই অবস্থায় আপনি নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, তাসবিহ পাঠ ইত্যাদি সবকিছু করতে পারবেন। কোনো সমস্যা নেই।

দলিল: হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহে উল্লেখ আছে যে, নাপাক কেবল সেই জিনিসই যা শরীয়ত কর্তৃক নাপাক ঘোষিত (যেমন- মদ, প্রস্রাব, পায়খানা ইত্যাদি)। আধুনিক যুগের ফকিহগণ (যেমন- মুফতি মুহাম্মদ শফি, মুফতি তাকি উসমানি) স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, প্রসাধনী ও ঔষধে ব্যবহৃত কৃত্রিম অ্যালকোহল পবিত্র এবং তা দিয়ে তৈরি জিনিস ব্যবহার করা জায়েয।


২. হোমিওপ্যাথি ঔষধের গন্ধ থাকা অবস্থায় নামাজ-কুরআন পড়া যাবে কি?

উত্তর: হোমিওপ্যাথি ঔষধে সাধারণত অ্যালকোহল (Alcohol) ব্যবহার করা হয়। তবে এই অ্যালকোহলও সাধারণত কৃত্রিম বা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি, যা পবিত্র। এমনকি যদি তা আঙুর বা খেজুরের তৈরি হয়েও থাকে, তবে হোমিওপ্যাথি ঔষধে তা এত অল্প পরিমাণে থাকে যে তা আর মাদকদ্রব্য হিসেবে গণ্য হয় না এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে তা নাপাকও নয়।

আপনি এই ঔষধ সেবন করার পর যে গন্ধ মুখে বা শরীরে থাকবে, তা দ্বারা আপনার শরীর বা পোশাক নাপাক হবে না। তাই এই অবস্থায় নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, তাসবিহ পাঠ করা সম্পূর্ণ জায়েয। তবে যদি ঔষধের গন্ধ খুব তীব্র হয় এবং অন্য মুসল্লিদের কষ্ট হয়, তবে নামাজের আগে মুখ ধুয়ে নেওয়া বা মিসওয়াক করা উত্তম। কিন্তু তা ফরজ বা ওয়াজিব নয়।

দলিল: ফতোয়ায়ে উসমানি ও ইমদাদুল ফতোয়ায় উল্লেখ আছে যে, পবিত্রতা হলো নাপাকি থেকে মুক্ত থাকা। ঔষধের গন্ধ নাপাকি নয়। তাই এটি নামাজের জন্য বাধা নয়।


৩. নাপাক হওয়ার সন্দেহে টেবিলে কাগজ বিছিয়ে কুরআন তেলাওয়াত করা যাবে কি?

উত্তর: ইসলামী বিধান হলো, কোনো জিনিস নাপাক হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়ে তাকে পবিত্রই গণ্য করা হবে। সন্দেহের ভিত্তিতে কোনো জিনিসকে নাপাক বলা যাবে না। আপনার টেবিলটি নাপাক হয়েছে কিনা তা আপনি নিশ্চিত নন। তাই উক্ত টেবিলটি পবিত্রই গণ্য হবে। আপনি সরাসরি টেবিলের উপর কুরআন শরীফ রেখে তেলাওয়াত করতে পারবেন।

তবে যদি আপনার মনে খুবই প্রবল ধারণা হয় (যা নিশ্চিত পর্যায়ে পৌঁছে যায়) যে টেবিলটি নাপাক, তাহলে আপনি নিচে কাগজ বা পরিষ্কার কাপড় বিছিয়ে তার উপর কুরআন শরীফ রেখে তেলাওয়াত করতে পারবেন। এতে কোনো অসুবিধা নেই। বরং এটি সতর্কতা ও সম্মানের খাতিরে উত্তম।

দলিল: ইসলামের মূলনীতি হলো, "اليقين لا يزول بالشك" অর্থাৎ, সন্দেহের কারণে নিশ্চিত বিষয় (পবিত্রতা) বাতিল হয় না। (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম)


৪. ঘড়ি ও মানিব্যাগে নাপাক পানি লেগে থাকলে ভেজা হাতে মুছে নেওয়া যাবে কি?

উত্তর: জ্বী, আপনি পারবেন। নাপাকি দূর করার জন্য জিনিসটিকে সম্পূর্ণ ভিজিয়ে ধোয়া বা পানিতে ডুবানো জরুরি নয়। নাপাকি দূর করার মূল শর্ত হলো, নাপাকির চিহ্ন (গন্ধ, রং, স্বাদ) দূর হয়ে যাওয়া

আপনি যদি ভেজা কাপড় বা ভেজা হাত দিয়ে বারবার ঘষে ঘড়ি ও মানিব্যাগ মুছে দেন, যাতে নাপাক পানি বা তার চিহ্ন (গন্ধ/রং) দূর হয়ে যায়, তাহলে তা পবিত্র হয়ে যাবে। তবে খেয়াল রাখবেন, ভেজা হাত থেকে পানি এমনভাবে পড়বে না যাতে তা অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। টপ টপ করে পানি না পড়লে এবং মুছে দেওয়ার পর নাপাকির কোনো চিহ্ন না থাকলে তা পবিত্র হয়ে যাবে।

তবে মনে রাখবেন, ঘড়ির ভেতরের অংশে বা মানিব্যাগের ভেতরে যদি নাপাক পানি ঢুকে থাকে, তাহলে সেগুলোও মুছে ফেলতে হবে। যদি ঘড়ির ভেতরে পানি ঢুকে যাওয়ার কারণে ঘড়ি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে ঘড়িটি খুলে ভেতরের অংশ মুছে ফেলার চেষ্টা করুন। সম্ভব না হলে, ঘড়ির বাইরের অংশ মুছে ফেলুন এবং ভেতরের অংশ সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে পবিত্রই গণ্য করুন (যেহেতু সন্দেহের ভিত্তিতে নাপাক বলা যাবে না)।

দলিল: রদ্দুল মুহতার (ফতোয়ায়ে শামি)-এ উল্লেখ আছে যে, নাপাক বস্তুকে পানি দিয়ে ধৌত করা বা মুছে ফেলার মাধ্যমে নাপাকির চিহ্ন দূর হয়ে গেলে তা পবিত্র হয়ে যায়। (রদ্দুল মুহতার, ১/৩৩২)


সংক্ষিপ্ত উত্তর:

১. ফেস ওয়াশের অ্যালকোহল নাপাক নয়, তাই কাপড়ে লাগলেও নামাজ-কুরআন পড়া যাবে। ২. হোমিওপ্যাথি ঔষধের গন্ধ নাপাক নয়, তাই নামাজ-কুরআন পড়া যাবে। ৩. নিশ্চিত না হলে টেবিল পবিত্রই গণ্য হবে। সন্দেহ থাকলে কাগজ বিছিয়ে পড়তে পারবেন। ৪. ভেজা হাতে মুছে নাপাকির চিহ্ন দূর করলে ঘড়ি ও মানিব্যাগ পবিত্র হয়ে যাবে।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.