দাঁড়িয়ে থেকে ভাইবা দেওয়া প্রসঙ্গে
Halal and Haram · Hanafi
Question
যদি এমন হয় শিক্ষক বসার অনুমতি দিল কিন্তু ছাত্ররা বসল না এক্ষেত্রে তাদের দেখাদেখি "ক" নামক ছাত্রটি ফর্মালিটি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকল, শিক্ষকের সম্মানার্থে নয়।তা কি জায়েয?
শিক্ষক ভাইবার সময় ছাত্রদের বসার অনুমতি দিল না এক্ষেত্রে ছাত্রদের গুণাহ হবে যদি তারা দাঁড়িয়ে থাকে?
Answer
উত্তর
১. শিক্ষক বসে ভাইভা নেওয়া এবং ছাত্ররা দাঁড়িয়ে থাকা প্রসঙ্গে
ইসলামী আদব-কায়দা অনুযায়ী, সাধারণভাবে ছাত্রের জন্য শিক্ষকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এবং শিক্ষক বসে থাকা—এতে কোনো সমস্যা নেই। এটি সম্মান প্রদর্শনের একটি সাধারণ রূপ, যা ইসলামী সংস্কৃতিতে নিষিদ্ধ নয়। তবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মানে দাঁড়ানো সম্পর্কে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, কিন্তু সাধারণ শিক্ষক বা অন্য কারো সম্মানে দাঁড়ানো জায়েয।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, সাধারণ মানুষের সম্মানে দাঁড়ানো মাকরূহ নয়, তবে রাসূল (সা.)-এর সম্মানে দাঁড়ানো বিশেষভাবে নিষিদ্ধ ছিল কারণ তিনি তা পছন্দ করতেন না। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, কোনো ব্যক্তির সম্মানে দাঁড়ানো মাকরূহে তানযিহি (অপছন্দনীয়) হতে পারে যদি তা এমনভাবে করা হয় যে, ব্যক্তিটি নিজেকে বড় মনে করে।
রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
"قِيَامُ الْإِنْسَانِ لِلرَّجُلِ إذَا قَدِمَ مِنْ سَفَرٍ أَوْ نَحْوِهِ لَا بَأْسَ بِهِ إذَا لَمْ يَكُنْ عَلَى وَجْهِ التَّعْظِيمِ وَالْإِكْرَامِ"
অর্থাৎ: "কোনো ব্যক্তি সফর থেকে আগমন করলে বা এরূপ ক্ষেত্রে তার জন্য দাঁড়ানোতে সমস্যা নেই, যদি তা সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে না হয়।"
তবে ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে যে, শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জায়েয, বিশেষত ভাইভা বা পরীক্ষার সময়, কারণ এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় আদব হিসেবে গণ্য হয়।
২. শিক্ষক বসার অনুমতি দিলেও ছাত্ররা না বসলে এবং ফর্মালিটি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকলে
যদি শিক্ষক বসার অনুমতি দেন কিন্তু ছাত্ররা না বসে, এবং "ক" ছাত্রটি ফর্মালিটি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে (শিক্ষকের সম্মানার্থে নয়), তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ:
১. এটি শিক্ষকের সম্মানার্থে নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম বা ফর্মালিটি হিসেবে করা হচ্ছে। ২. ইসলামী ফিকহে নিয়তের গুরুত্ব রয়েছে। যেহেতু নিয়ত শিক্ষকের সম্মান প্রদর্শন নয়, তাই এটি নিষিদ্ধের মধ্যে পড়বে না।
হাদিসের আলোকে: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ" "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" (সহিহ বুখারী: ১)
যেহেতু "ক" ছাত্রটির নিয়ত শিক্ষকের সম্মানার্থে দাঁড়ানো নয়, বরং ফর্মালিটি হিসেবে দাঁড়ানো, তাই এটি জায়েয।
৩. শিক্ষক বসার অনুমতি না দিলে ছাত্রদের দাঁড়িয়ে থাকার কারণে গুনাহ হবে কি?
যদি শিক্ষক বসার অনুমতি না দেন এবং ছাত্ররা দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে তাদের কোনো গুনাহ হবে না। কারণ:
১. শিক্ষকের আদেশ মানা ওয়াজিব নয় যদি তা শরিয়তের কোনো বিধানের পরিপন্থী না হয়। তবে শিক্ষকের আদেশ মানা আদব ও শিষ্টাচারের অংশ। ২. দাঁড়িয়ে থাকা নিজেই কোনো গুনাহের কাজ নয়। গুনাহ তখনই হবে যদি দাঁড়ানো কোনো নিষিদ্ধ কাজের সাথে জড়িত থাকে। ৩. শিক্ষকের অনুমতি না দেওয়া সত্ত্বেও ছাত্ররা দাঁড়িয়ে থাকলে তারা শিক্ষকের আদেশ অমান্য করছে, যা আদবের পরিপন্থী হতে পারে, কিন্তু গুনাহ নয়।
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি)-তে উল্লেখ আছে:
"لَا بَأْسَ بِالْقِيَامِ لِلْإِنْسَانِ إذَا لَمْ يَكُنْ عَلَى وَجْهِ التَّعْظِيمِ"
অর্থাৎ: "যদি তা সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে না হয়, তাহলে কারো জন্য দাঁড়ানোতে কোনো সমস্যা নেই।"
সারসংক্ষেপ
১. শিক্ষক বসে ভাইভা নেওয়া এবং ছাত্ররা দাঁড়িয়ে থাকা জায়েয—এতে কোনো সমস্যা নেই, বিশেষত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রেক্ষাপটে এটি একটি সাধারণ ও গ্রহণযোগ্য রীতি।
২. ফর্মালিটি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা জায়েয—যদি নিয়ত শিক্ষকের সম্মানার্থে না হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম মেনে চলার জন্য হয়, তাহলে তা জায়েয।
৩. শিক্ষক অনুমতি না দিলে ছাত্রদের দাঁড়িয়ে থাকার কারণে গুনাহ হবে না—তবে শিক্ষকের আদেশ অমান্য করা আদবের পরিপন্থী হতে পারে, কিন্তু গুনাহ নয়। ছাত্রদের উচিত শিক্ষকের নির্দেশ মেনে চলা, তবে যদি তারা দাঁড়িয়ে থাকে তাতে গুনাহ হবে না।
উল্লেখ্য: ইসলামে বড়দের সম্মান করা এবং শিক্ষকের আদব রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে দাঁড়ানো বা বসা নিয়ে অতিরিক্ত কঠোরতা না করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত নিয়ম মেনে চলাই উত্তম।