ব্যাংকের মুনাফা দিয়ে ঋণ পরিশোধের বিধান
Halal and Haram · Hanafi
Question
প্রেক্ষাপট ১:-আমার বাবা কুরবানির সময় আমার মামার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে কুরবানি করে।পরবর্তীতে আমার বাবার ব্যাংক ডিপোজিট(আসল+মুনাফা ছিল) ওই টাকা পরিশোধ করে। আমার বাবা+দাদা মিলে এইবার কুরবানি দিয়েছিল।বাবা ২০হাজার, দাদা ৪০হাজার টাকা দেয়।যদিও আলাদা কুরবানি দেয় কিন্তু মাংস একসাথে রাখা হয়। এই মাংস খাওয়া কি জায়েজ হবে?
প্রেক্ষাপট ২: আমার বাবার ব্যবসার জন্য মামার(মামার টাকা হালাল) কাছ থেকে টাকা ধার নিবে। পরবর্তীতে ডিপোজিটের(আসল+মুনাফা) টাকা থেকে পরিশোধ করবে। আমি কাছে কিছু টাকা ছিল যা আমি বাবার ব্যবসার জন্য দিতে চাচ্ছিলাম। এখন আমার টাকা দেওয়া কি উচিত হবে? এই ব্যবসা কি হালাল হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রেক্ষাপট ১-এর উত্তর:
আপনার বাবা মামার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে কুরবানি করেছেন এবং পরবর্তীতে ব্যাংক ডিপোজিটের টাকা দিয়ে তা পরিশোধ করেছেন। এখানে মূল বিষয় হলো:
১. ধার করা টাকায় কুরবানি: কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিজের মালিকানাধীন সম্পদ থাকা শর্ত। ধার করা টাকা দিয়ে কুরবানি করলে তা আদায় হবে কি না—এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মতভেদ রয়েছে। তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যদি কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার পর (অর্থাৎ ১০ই জিলহজ ফজর হওয়ার পর) ধার করা টাকা দিয়ে কুরবানি করা হয়, তবে তা আদায় হয়ে যাবে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৬)
২. ব্যাংক ডিপোজিটের মুনাফা: ব্যাংকের মুনাফা সুদ (রিবা) হওয়ার কারণে তা নাজায়েয। এই মুনাফার টাকা নিজের জন্য ব্যবহার করা জায়েয নয়। তবে যদি কেউ সুদের টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে, তাহলে ঋণ আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু সুদের টাকা ব্যবহারের গুনাহ থাকবে। আপনার বাবার উচিত ছিল সুদের টাকা থেকে শুধু আসল টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা এবং মুনাফার টাকা গরিব-মিসকিনকে সদকা করে দেওয়া।
৩. মাংস একসাথে রাখা: বাবা ও দাদা আলাদা কুরবানি দিয়েছেন, কিন্তু মাংস একসাথে রাখা হয়েছে। যদি মাংস একসাথে রাখা হয় কিন্তু প্রত্যেকের কুরবানির মাংস আলাদা করে চেনা যায় বা হিসাব করে ভাগ করা যায়, তাহলে খাওয়া জায়েয। তবে যদি মাংস সম্পূর্ণ মিশ্রিত হয়ে যায় এবং আলাদা করা সম্ভব না হয়, তাহলে উভয়ের সম্মতিতে সমানভাবে ভাগ করে নিলে খাওয়া জায়েয হবে। যেহেতু উভয়ের কুরবানিই বৈধ, তাই মাংস খাওয়া জায়েয হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩০০)
প্রেক্ষাপট ২-এর উত্তর:
১. মামার কাছ থেকে ধার: মামার টাকা হালাল উল্লেখ করেছেন, তাই মামার কাছ থেকে ধার নেওয়া জায়েয। তবে শর্ত হলো, এই ধার কোনো সুদ বা অতিরিক্ত লাভের শর্তে না হয়। যদি শুধু ধার হয় এবং পরিশোধের সময় শুধু আসল টাকা ফেরত দেওয়া হয়, তাহলে তা সম্পূর্ণ জায়েয।
২. ব্যাংক ডিপোজিট থেকে পরিশোধ: ব্যাংক ডিপোজিটের মুনাফা সুদ। এই সুদের টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা জায়েয হবে, কিন্তু সুদের গুনাহ থেকে বাঁচতে হলে উচিত হলো আসল টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা এবং মুনাফার টাকা গরিব-মিসকিনকে সদকা করা। তবে যদি আসল টাকা আলাদা করা সম্ভব না হয় এবং মুনাফাসহ টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা হয়, তাহলে ঋণ আদায় হবে, কিন্তু সুদের টাকা ব্যবহারের গুনাহ থাকবে।
৩. আপনার টাকা দেওয়া: আপনার কাছে হালাল টাকা আছে এবং তা বাবার ব্যবসায় দিতে চাচ্ছেন—এটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। পিতা-মাতাকে আর্থিক সহায়তা করা এবং তাদের ব্যবসায় সাহায্য করা ইসলামে অত্যন্ত পছন্দনীয়। আপনার টাকা দেওয়া উচিত হবে। তবে খেয়াল রাখবেন, আপনার টাকা যেন সুদের লেনদেনে ব্যবহৃত না হয়।
৪. ব্যবসা হালাল হবে কি না: ব্যবসা হালাল হওয়ার জন্য শর্ত হলো:
- পণ্য ও লেনদেন হালাল হতে হবে
- সুদ (রিবা) যুক্ত লেনদেন না করা
- প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি না করা
যদি আপনার বাবা মামার কাছ থেকে সুদমুক্ত ঋণ নেন এবং ব্যবসায় সুদের লেনদেন না করেন, তাহলে ব্যবসা হালাল হবে। তবে ব্যাংক ডিপোজিটের মুনাফা সুদ হওয়ায় তা থেকে বাঁচতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা: ২৭৫)
উপসংহার: আপনার বাবার উচিত হবে: ১. ব্যাংকের মুনাফা (সুদ) থেকে তওবা করা এবং ভবিষ্যতে সুদী লেনদেন থেকে বিরত থাকা ২. মুনাফার টাকা নিজে ব্যবহার না করে গরিব-মিসকিনকে সদকা করা ৩. মামার কাছ থেকে সুদমুক্ত ঋণ নেওয়া ৪. আপনার হালাল টাকা বাবার ব্যবসায় দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ
দলিলসমূহ:
- সূরা বাকারা: ২৭৫
- রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৬
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩০০
- ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫০
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৮০
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হালাল রিজিকের তাওফিক দান করুন। আমিন।