উপশমের উদ্দেশ্যে শিয়ালের গোশত খাওয়ার হুকুম

Food and Drink · Hanafi

Question No: 3665
Questioner: Taslima Akter
Question Asked: 08 Aug 2026, 11:16 AM
Reviewed & Published: 08 Aug 2026, 11:26 AM
Views: 6
Tokens: 3,262
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুমুস সালাম।ফিকহের গতক্লাসে হুজুর বলেছিলেন যে হিংস্র পশুর মাংস নাাপাক।
বাংলাদেশে অনেক এ শিয়াল খায় ব্যাথা উপশমের মাধ্যম হিসেবে। এর মাংস নাকি খুবই কাজে দেয়।নাপাক মানেই তো খারাপ। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে যে শিয়াল যে খায় এটা হালাল নাকি হারাম?মানে নাপাক আর হারাম কি এক বিষয় না?

Answer

উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

প্রিয় প্রশ্নকারিণী, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিকহের ক্লাসে হুজুর যা বলেছেন, তা সঠিক। তবে "নাপাক" (নাজিস) এবং "হারাম" এই দুটি শব্দের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। নিচে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।

১. নাপাক (নাজিস) এবং হারামের মধ্যে পার্থক্য

ইসলামি ফিকহের পরিভাষায়, "নাপাক" (নাজিস) বলতে সাধারণত সেই জিনিসকে বোঝায় যা শারীরিকভাবে অপরিচ্ছন্ন বা অপবিত্র, যেমন: রক্ত, মূত্র, মল, মদ ইত্যাদি। এগুলো স্পর্শ করলে বা কাপড়ে লাগলে পবিত্রতা অর্জনের জন্য ধৌত করা আবশ্যক।

অন্যদিকে, "হারাম" বলতে সেই জিনিসকে বোঝায় যা আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্পষ্টভাবে খাওয়া বা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করেছেন। হারাম জিনিস নাপাক (নাজিস) হতে পারে, আবার পাক (পবিত্র)-ও হতে পারে।

উদাহরণ:

  • বিষ: এটি পাক (পবিত্র) কিন্তু খাওয়া হারাম।
  • মদ: এটি নাপাক (নাজিস) এবং পান করা হারাম।
  • শিয়ালের মাংস: এটি নাপাক (নাজিস) নয়, বরং পাক (পবিত্র) দেহের অংশ, তবে খাওয়া হারাম।

সুতরাং, প্রতিটি নাপাক জিনিস খাওয়া হারাম, কিন্তু প্রতিটি হারাম জিনিস নাপাক নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি নীতি।

২. শিয়ালের মাংস খাওয়ার বিধান

হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মতানুসারে, শিয়ালের মাংস খাওয়া হারাম। কারণ, শিয়াল একটি হিংস্র প্রাণী (যে প্রাণী শিকার করে এবং দাঁত ও নখর দিয়ে আক্রমণ করে)।

  • হাদিসের দলিল: হযরত আবু সা'লাবা আল-খুশানি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতিটি হিংস্র দাঁতওয়ালা প্রাণী (যেমন: সিংহ, নেকড়ে, শিয়াল, বাঘ, কুকুর) খেতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ বুখারী: ৫৫৩০, সহিহ মুসলিম: ১৯৩৩)
  • হানাফি ফিকহের উক্তি:
    • ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর মতে, হিংস্র প্রাণী (যেমন: শিয়াল, নেকড়ে, বাঘ, সিংহ) খাওয়া হারাম। (বাদায়েউস সানায়ি, ৫/১৩৯)
    • ফাতাওয়া আলমগীরি (৫/২৯০) তে উল্লেখ আছে, "শিয়াল, নেকড়ে, বাঘ, সিংহ ইত্যাদি হিংস্র প্রাণী খাওয়া হারাম।"
    • রদ্দুল মুহতার (৬/৩০৬) তে ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) লিখেছেন, হিংস্র প্রাণী খাওয়া হারাম হওয়ার ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) একমত।

৩. শিয়ালের মাংস কি নাপাক (নাজিস)?

না, শিয়ালের মাংস নাপাক (নাজিস) নয়। এটি পাক (পবিত্র) দেহের অংশ। তবে এটি খাওয়া হারাম। অর্থাৎ, শিয়ালের মাংস স্পর্শ করলে বা কাপড়ে লাগলে কাপড় নাপাক হবে না, শুধু ধুয়ে ফেললেই হবে না, বরং এটি খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

৪. রোগ নিরাময়ের জন্য শিয়ালের মাংস খাওয়ার বিধান

আপনি উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশে অনেকে ব্যথা উপশমের জন্য শিয়ালের মাংস খেয়ে থাকে। ইসলামি শরিয়তে হারাম জিনিস দ্বারা চিকিৎসা করা জায়েয নয়, যদি হালাল বিকল্প থাকে।

  • হাদিসের দলিল: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা রোগ নিরাময়কারী ও রোগ উভয়ই নাযিল করেছেন। প্রতিটি রোগের জন্য তিনি একটি করে ঔষধ তৈরি করেছেন। সুতরাং তোমরা হারাম ঔষধ ব্যবহার করো না।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৭৪)
  • হানাফি ফিকহের নীতি: ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এবং অন্যান্য ফকিহগণ বলেছেন, হারাম বস্তু দ্বারা চিকিৎসা করা জায়েয নয়, যদি হালাল ঔষধ পাওয়া যায়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৫)

সুতরাং, ব্যথা উপশমের জন্য শিয়ালের মাংস খাওয়া হারাম। এর পরিবর্তে হালাল ও বৈধ ঔষধ ব্যবহার করা উচিত। আল্লাহ তাআলা হালাল রিজিকের মধ্যে যথেষ্ট বারাকাহ রেখেছেন।

৫. সংক্ষিপ্ত উত্তর

  • শিয়ালের মাংস খাওয়া হারাম (হানাফি মাযহাবে)।
  • শিয়ালের মাংস নাপাক (নাজিস) নয়, বরং এটি পাক কিন্তু হারাম।
  • নাপাক এবং হারাম এক জিনিস নয়। নাপাক মানে শারীরিক অপবিত্রতা, আর হারাম মানে শরিয়তের নিষিদ্ধতা।
  • রোগ নিরাময়ের জন্য হারাম জিনিস খাওয়া জায়েয নয়, বিশেষত যখন হালাল বিকল্প বিদ্যমান।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক খাওয়ার এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। (আমিন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.