পর্দার ক্ষেত্রে সামাজিকতা।

Family Life · Hanafi

Question No: 366
Questioner: Mayma Bhuiyan
Question Asked: 19 May 2026, 03:48 PM
Reviewed & Published: 19 May 2026, 03:53 PM
Views: 40
Tokens: 3,554
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।আমি নন-প্র্যাক্টিসিং মুসলিম পরিবারে দ্বীন পালন করার চেষ্টা করছি। দাদু-নানু সবার পরিবারে আমি প্রথম পূর্ণাঙ্গ পর্দা করার চেষ্টা করছি। এতে পরিবার থেকে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। তাঁরা বলেন, পর্দা করে রুমে বসে থাকলে হবে না। সামাজিকতা রক্ষা করতে হবে। যেমন, আমার নন-মাহরামদের সামনে যেতে হবে, কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করতে হবে, তাদের আপ্যায়ন করতে হবে সামনে গিয়ে। যেহেতু সমস্যা আমার দাদু বাড়িতে হয় না আলহামদুলিল্লাহ। তবে নানু বাড়িতে কাজ করার সময় মাহরামরা চলে আসে। অনেক সময় তারা ঐ স্থানে বসে থাকেন।(যদিও আমি আমার মাহরামদের বলেছি এটা যেন না করেন। তখন বলা হয় আমি বাড়াবাড়ি করছি!) এমন ও হয়েছে এর জন্য আমি আত্মীয়দের বাড়িতে কোনো ধরনের আয়োজনে যাওয়া বন্ধ করেছি। কারন যেহেতু আমি কোনো পরিবেশ পাই না। বার বার নন মাহরামদের সামনে পরতে হয়! তখনও পরিবার থেকে বলা হয়েছে সামাজিকতা রক্ষা করতে হবে পর্দা করে। যদি না করি এতে ফিতনা সৃষ্টি হবে। মানুষ ইসলামকে কঠিন মনে করবেন। তাই আমিও খিমার পড়ে তাদের সামনে যাই।
এ পরিবেশে আমার করণীয় কী ? অনেক সময় তাদের সামনে কাজ করতে গেলে হাত, পা বের হয়ে আসে!! আমার খালামুনি তাদের নতুন বাড়িতে উঠবেন। এতে আমাকে বলা হয়েছে যেতে। খালামনির কোনো মেয়ে নেই সাহায্য করার জন্য। কিন্তু খালামনির দুই ছেলে আছেন! এখন সামাজিকতা রক্ষা করতে গেলে তাদের সামনে কাজ করতে হবে। কথা বলতে হবে !এ পরিবেশে আমার করণীয় কী? আমার কি যাওয়া উচিত ? ইসলাম কি বলে? আমার সকল সমস্যার সমাধান দিবেন ইন শা আল্লাহ।

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমেই আপনাকে সালাম ও অভিনন্দন জানাই যে, আপনি দ্বীন পালনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এবং পরিবারের বিরোধিতা সত্ত্বেও পর্দা রক্ষায় অবিচল আছেন। আল্লাহ তাআলা আপনার এই সংকল্প ও ধৈর্যকে কবুল করুন এবং আপনার জন্য উত্তম পথ সহজ করে দিন। আমিন।

আপনার প্রশ্নটি মূলত দুইটি বিষয়কে ঘিরে:
১. নন-মাহরাম আত্মীয়দের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও সামাজিকতা রক্ষার নামে পর্দার শিথিলতা।
২. নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে (যেমন খালামনির বাড়িতে সাহায্য করতে গেলে) নন-মাহরামের সামনে হাত-পা বের হওয়া বা কথা বলা।

আমরা কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর দেব।

১. পর্দার বিধান ও সামাজিকতার ভারসাম্য

ইসলামে পর্দা ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা (নবী-পত্নীগণ) নবীগৃহে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিক পবিত্র।" (সূরা আহযাব, ৩৩:৫৩)
এ আয়াতটি সাধারণ মুমিন নারীদের জন্যও নির্দেশনা বহন করে। আরও নির্দেশ এসেছে:
"তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া; এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বুকের ওপর ফেলে রাখে।" (সূরা নূর, ২৪:৩১)

হানাফি ফিকহে পর্দার হুকুম অত্যন্ত সুস্পষ্ট। মাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ চিরতরে হারাম, যেমন পিতা, ভাই, চাচা, নানা) ব্যতীত সকল পুরুষ নন-মাহরাম। নন-মাহরামের সামনে চেহারা ও হাতের তালু ছাড়া শরীরের কোনো অংশ দেখা জায়েজ নয়। তবে ফেতনার আশঙ্কা থাকলে চেহারাও ঢাকতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭০; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৯৮)

আপনার পরিবারের দাবি ‘সামাজিকতা রক্ষা’ বা ‘কঠিন মনে হবে’—এগুলো ইসলামের বিধানের বিপরীতে গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহর বিধানের সামনে কোনো পারিবারিক চাপ বা সামাজিক অপবাদ অগ্রাধিকার পাবে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"আল্লাহর সন্তুষ্টির ব্যাপারে কোনো সৃষ্টির অনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ, ১০৯৪২)

২. নানুবাড়ি ও খালামনির বাড়ির পরিস্থিতি

আপনি নানুবাড়িতে কাজ করার সময় মাহরাম (যেমন মামা, খালুর ছেলে) আসলে তা অস্বস্তিকর। তবে হানাফি ফিকহ অনুসারে:

  • মাহরাম পুরুষ (যেমন মামা, খালুর স্বামী) আপনার জন্য মাহরাম নন। কারণ মামা মাহরাম হলেও তার স্ত্রী বা সন্তান নন-মাহরাম। আর খালামনি মানে খালার স্বামী? খালা মানে মা'র বোন, তার স্বামী নন-মাহরাম। এখানে সতর্ক থাকতে হবে।
  • খালামনির ছেলে (আপনার খালাতো ভাই) নন-মাহরাম। তাদের সামনে পর্দা ফরজ। আপনি তাদের সামনে কাজ করতে গেলে হাত-পা বের হওয়া বৈধ নয়, কারণ নন-মাহরামের সামনে পর্দা না রাখা কবিরা গুনাহ।

উল্লেখ্য, খালামনির বাড়িতে সাহায্য করতে যাওয়া—যদি সেখানে নন-মাহরাম ছেলে থাকে এবং আপনি তাদের সামনে আসা-যাওয়া করবেন, তাহলে তা জায়েজ নয়। বরং আপনি যদি নিম্নোক্ত শর্তগুলো মানতে পারেন তবেই যাওয়া জায়েজ হতে পারে:

  • সম্পূর্ণ পর্দা (বোরকা বা খিমার যা চেহারা, হাত, পা সম্পূর্ণ ঢেকে রাখে) পরিহিত থাকা।
  • প্রয়োজনীয় কাজ সীমিত রাখা, অনর্থক কথা না বলা।
  • সম্ভব হলে নারীরা (খালামনি ও অন্য আত্মীয়) ছাড়া অন্য পুরুষের সামনে না যাওয়া।

যদি এসব শর্ত পালন করা সম্ভব না হয়, তাহলে যাওয়া থেকে বিরত থাকা ফরজ। কেননা নবীজি ﷺ বলেছেন:
"তোমরা নারী-পুরুষের মেলামেশা থেকে দূরে থাকো।" (সহিহ বুখারি, ৫২৩২)

৩. আপনি কী করবেন?

  • প্রথমত, দৃঢ় সংকল্প করুন যে আল্লাহর বিধান সবার আগে। পরিবারের বিরোধিতা ও কথার জন্য বিধান ছাড়বেন না।
  • দ্বিতীয়ত, সম্ভব হলে দাদু-নানুর বাড়িতে অবস্থানকালে এমন ব্যবস্থা করুন যে, নন-মাহরাম ঘরে এলে আপনি নিজের কক্ষে চলে যান বা পর্দার ব্যবস্থা রাখুন। প্রয়োজনে দরজায় পর্দা টাঙিয়ে নিন।
  • তৃতীয়ত, খালামনির বাড়িতে যাওয়া তখনই জায়েজ হবে যখন আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে নন-মাহরাম ছেলেরা কাজের সময় সেখানে থাকবে না, অথবা আপনি সম্পূর্ণ পর্দায় থাকবেন এবং প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া কিছু বলবেন না। কিন্তু সাধারণত বাস্তবে তা সম্ভব নয়, তাই বিরত থাকাই উত্তম
  • চতুর্থত, আত্মীয়দের সামনে পর্দা না করে গিয়ে তারা যাতে ‘ইসলাম কঠিন’ মনে না করেন—এ যুক্তি ঠিক নয়। বরং ইসলামের বিধান মেনে চললে মানুষ সম্মান করে, আর আপনি যদি নরম ও হেকমতের সাথে বোঝান, তবে ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে পরিবারও মানিয়ে নেবে।

দলিল-সংগ্রহ

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): নন-মাহরামের সামনে পর্দার বিধান ও ফেতনার ভিত্তিতে চেহারা ঢাকার নির্দেশ।
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি): পরিবারের চাপে পর্দা ছাড়া যাবে না, বরং হেকমত ও নমনীয়তা অবলম্বন করতে হবে।
  • বাহিশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলি থানভি): নারীদের পর্দার নির্দেশনা ও সামাজিক আচার-আচরণের সীমারেখা।

আপনার জন্য পরামর্শ:
পরিবারের সাথে নমনীয় আচরণ করুন, তাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, ইসলামের বিধান মানতে গিয়ে আপনি তাদের প্রতি ভালোবাসা কমিয়ে দিচ্ছেন না, বরং আল্লাহর আদেশ পালন করছেন। ধৈর্য ধরে দোয়া করতে থাকুন। যদি কোনো কাজে বাধ্য হন, তবে সতর্কতার সাথে পর্দা রক্ষা করুন।

আল্লাহ আপনার ধৈর্য ও ইবাদতে বরকত দিন এবং আপনার পরিবারকে হেদায়েত দান করুন। (آمين)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.