কাবিননামার ১৮ নং ঘরে তালাকের অধিকার দেওয়া ও ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান
Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi
Question
ডিটেইলস উওর দেন
Answer
তালাকের অধিকার ও ওয়াসওয়াসা সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনার প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। এটি একটি জটিল বিষয় এবং এতে ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ-প্রবণতা) স্পষ্ট লক্ষণীয়। নিচে ধাপে ধাপে উত্তর দেওয়া হলো:
১. কাবিননামার ১৮ নং ঘরে তালাকের অধিকার দেওয়া ও ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান
বিয়ে রেজিস্ট্রির সময় কাবিননামার ১৮ নং ঘরে স্বামী স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিতে পারেন। এটি একটি বৈধ শর্ত। তবে শর্তটি ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইসলামী আইনবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে:
-
ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর মতে: স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেয়, তবে তা ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। কারণ এটি একটি চুক্তি বা শর্ত যা একতরফাভাবে বাতিল করা যায় না। (আল-মুগনী, ৭/৩৮৫)
-
ইমাম শাফিঈ (রহ.)-এর মতে: স্বামী চাইলে তা ফিরিয়ে নিতে পারে, তবে স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া নয়। (আল-মাজমূ', ১৭/১৬৫)
-
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: তালাকের অধিকার দেওয়া একটি বৈধ শর্ত; এটি ফিরিয়ে নেওয়া স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া বৈধ নয়। (মাজমূ' ফাতাওয়া, ৩৩/১০৯)
আপনার ক্ষেত্রে: আপনি যখন স্বামীকে বলেছেন "অধিকার ফিরিয়ে নাও" এবং তিনি বলেছেন "ফিরিয়ে নিলাম" — এতে আপনার সম্মতি ছিল। তাই আপনার সম্মতিতে অধিকার ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে গণ্য হবে। তবে প্রশ্ন হলো, এটি কি যথেষ্ট ছিল?
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: তালাকের অধিকার ফিরিয়ে নিতে হলে স্পষ্টভাবে বলতে হবে এবং উভয় পক্ষের সম্মতি থাকতে হবে। (আশ-শারহুল মুমতি', ১২/৩৮৫)
যেহেতু আপনি নিজেই বলেছেন "অধিকার ফিরিয়ে নাও" এবং তিনি ফিরিয়ে নিয়েছেন, তাই আপনার সম্মতিতে তা ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে লিখিতভাবে কাবিননামা সংশোধন না করায় পরবর্তীতে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, যা আপনার ওয়াসওয়াসার কারণ।
২. মৌখিকভাবে তালাকের অধিকার দেওয়া ও ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান
আপনি বলেছেন, স্বামী মাঝে মাঝে বলতেন: "তুমি তালাক দাও, তোমাকে অধিকার দিলাম" — এরপর আপনি বলতেন "অধিকার ফিরিয়ে নাও" এবং তিনি ফিরিয়ে নিতেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
- মৌখিকভাবে তালাকের অধিকার দেওয়া বৈধ। (মাজমূ' ফাতাওয়া ইবনে বায, ২১/১৪৩)
- তবে এটি সাময়িক না হয়ে স্থায়ী হবে, যতক্ষণ না ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
- আপনি যখনই বলেছেন "ফিরিয়ে নাও" এবং তিনি ফিরিয়ে নিয়েছেন — সাথে সাথে অধিকার ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে গণ্য হবে।
শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন: তালাকের অধিকার দেওয়া একটি বৈধ শর্ত; স্ত্রীর সম্মতিতে তা ফিরিয়ে নেওয়া যায়। (আল-মুলাখ্খাসুল ফিকহী, ২/৩৩৫)
আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনি প্রতিবারই "ফিরিয়ে নাও" বলেছেন এবং তিনি ফিরিয়ে নিয়েছেন, তাই প্রতিবারই অধিকার ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে গণ্য হবে। এতে কোনো সমস্যা নেই।
৩. "চলে যাব" বলা ও তালাকের নিয়তের বিধান
আপনি বলেছেন, একদিন আপনি বলেছিলেন "চলে যাব" — স্বামী জিজ্ঞেস করলে আপনি বলেছিলেন "তালাকের নিয়তে" — কিন্তু আপনার ভেতরে তালাকের নিয়ত ছিল না।
এখানে মূল বিষয়:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"ইন্নামাল আ'মালু বিন নিয়্যাত..." "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল..." (সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)
তালাকের ক্ষেত্রে নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানে একটি জটিলতা আছে:
- আপনি মৌখিকভাবে বলেছেন "তালাকের নিয়তে" — এটি একটি স্পষ্ট ঘোষণা।
- কিন্তু আপনার অন্তরের নিয়ত ছিল না।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: তালাকের ক্ষেত্রে মৌখিক উচ্চারণ এবং অন্তরের নিয়ত — উভয়টি বিবেচনা করা হয়। যদি কেউ তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে কিন্তু অন্তরে নিয়ত না থাকে, তবে সেটি তালাক গণ্য হবে না যদি প্রমাণিত হয় যে তার নিয়ত ছিল না। (মাজমূ' ফাতাওয়া, ৩৩/৮৫)
তবে সতর্কতা: আপনি স্বামীকে বলেছেন "তালাকের নিয়তে" — এটি একটি স্পষ্ট ঘোষণা। এখন আপনি বলছেন আপনার অন্তরে নিয়ত ছিল না। এটি একটি দ্বিধাদ্বন্দ্বের বিষয়।
শায়খ আল-আলবানী (রহ.) বলেন: তালাকের শব্দ উচ্চারণ করলে সাধারণত তা তালাক হিসেবে গণ্য হয়, যদি না প্রমাণিত হয় যে উচ্চারণকারী তালাকের অর্থ জানত না বা তার নিয়ত অন্য কিছু ছিল। (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর)
আপনার ক্ষেত্রে: আপনি বলেছেন "চলে যাব" — এটি তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয়। এরপর স্বামী জিজ্ঞেস করলে আপনি বলেছেন "তালাকের নিয়তে" — এটি একটি ব্যাখ্যা। কিন্তু আপনি বলছেন আপনার অন্তরে তালাকের নিয়ত ছিল না।
বিশুদ্ধ মত: যেহেতু "চলে যাব" তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয় এবং আপনার অন্তরে নিয়ত ছিল না, তাই এতে তালাক পতিত হবে না — ইনশাআল্লাহ। তবে ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে হলে আপনাকে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে।
৪. ৯০% নিশ্চিত হওয়া ও ওয়াসওয়াসার বিধান
আপনি বলেছেন, আপনি ৯০% নিশ্চিত যে স্বামী মৌখিকভাবে তালাকের অধিকার দেননি। এখন কাবিননামার অধিকারের কারণে তালাক হবে কি না — এই প্রশ্নে:
শায়খ ইবনে বায (রহ.) বলেন: ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ-প্রবণতা) থেকে বাঁচতে হলে নিশ্চিত জ্ঞান (ইয়াকীন) এর ওপর নির্ভর করতে হবে। সন্দেহ দ্বারা নিশ্চিত বিষয় বাতিল হয় না। (মাজমূ' ফাতাওয়া ইবনে বায, ২৯/৩৫)
ইসলামী নীতি:
"আল-ইয়াকীনু লা ইয়াযুলু বিশ শাক্ক" "নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না।" (আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর, ৬০)
আপনার ক্ষেত্রে:
- আপনি ৯০% নিশ্চিত যে স্বামী মৌখিকভাবে অধিকার দেননি।
- কাবিননামায় ১৮ নং ঘরে অধিকার দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আপনি বলেছেন তা ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
- আপনার সম্মতিতে তা ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সুতরাং: কাবিননামার ১৮ নং ঘরের অধিকারের কারণে তালাক পতিত হবে না — ইনশাআল্লাহ। কারণ আপনি আপনার সম্মতিতে অধিকার ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং স্বামী তা ফিরিয়ে নিয়েছেন।
৫. ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার উপায়
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় উপায় হলো:
- আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা
- ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়া
- নিশ্চিত বিষয়ের ওপর নির্ভর করা
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"লিমা ইয়াজি'উশ শাইতানু..." "শয়তান তোমাদের কাছে আসে এবং প্রশ্ন করে — কে সৃষ্টি করেছে? কে সৃষ্টি করেছে? এমনকি বলে — আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন কেউ এরূপ অনুভব করবে, সে যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং ওয়াসওয়াসা ছেড়ে দেয়।" (সহীহ বুখারী: ৩২৭৬, সহীহ মুসলিম: ১৩৪)
৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- কাবিননামার ১৮ নং ঘরের অধিকার — আপনার সম্মতিতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাই এটি আর কার্যকর নেই।
- মৌখিকভাবে তালাকের অধিকার দেওয়া — প্রতিবারই আপনি "ফিরিয়ে নাও" বলেছেন এবং তিনি ফিরিয়ে নিয়েছেন। তাই প্রতিবারই তা বাতিল হয়েছে।
- "চলে যাব" বলা — এটি তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয় এবং আপনার অন্তরে নিয়ত ছিল না। তাই এতে তালাক পতিত হয়নি।
- ৯০% নিশ্চিত হওয়া — সন্দেহ দ্বারা নিশ্চিত বিষয় বাতিল হয় না। তাই কাবিননামার অধিকারের কারণে তালাক পতিত হবে না।
সুতরাং, আপনার বিবাহ বৈধ এবং তালাক পতিত হয়নি — ইনশাআল্লাহ।
৭. গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ
- ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না। শয়তান আপনাকে বিভ্রান্ত করতে চায়।
- আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করুন — "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন।
- স্বামীর সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন এবং নিশ্চিত হন।
- বিশ্বস্ত আলেমের সাথে পরামর্শ করুন — প্রয়োজনে স্থানীয় কোনো আলেমের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করুন।
- অতীতের বিষয়ে চিন্তা না করে বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে মনোযোগ দিন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ওয়াসওয়াসা থেকে হিফাযত করুন। আমিন।
"রাব্বানা লা তুআখিযনা ইন নাসীনা আও আখতানা..." "হে আমাদের রব! আমরা ভুলে গেলে বা ভুল করলে আমাদের পাকড়াও করবেন না..." (সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৬)