আমার স্বামী বলেছে ডিভোর্স ডিভোর্স। এতেই কি ডিভোর্স হয়ে যাবে? আমার তোমাকে ডিভোর্স দেওয়া ইচ্ছাও নাই। আর কেন ডিভোর্স দিব? এতে কি তালাক হবে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 3621
Questioner: Sunflower
Question Asked: 07 Aug 2026, 08:28 PM
Reviewed & Published: 07 Aug 2026, 09:05 PM
Views: 9
Tokens: 10,741
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম হুজুর। আমার কিছু প্রশ্ন ছিল। আমার মনে বার বার চিন্তা আসছে তালাক হয়ে গেল কি না। তাই পুনরায় প্রশ্নটি করলাম। আমার যতটুকু মনে আছে তাই লিখছি।
একদিন আমি আর আমার স্বামী খাবার খাচ্ছিলাম। তখন আমি আমার আপুর কথা বলছিলাম যে, দুলাভাইয়ার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে আপুকে ডিভোর্স দিয়ে দিত। এটা শুনে আমার স্বামী বললেন, ভাইয়ার জায়গায় আমি থাকলে কি করতাম জানো? এটা শুনেই আমি উনার মুখ চেপে ধরলাম। এরপর উনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এমন করলাম কেন? আমি বললাম, বউ এর সামনে তালাক শব্দ টা উচ্চারণ করলেই তালাক হয়ে যায়। তাই এমন করেছি। উনি বলেন,, তোমার তালাক দেওয়া....(পুরো কথা শুনিনি আমি) আর বলেন, আরে আমি বলতে চাইছিলাম, ভাইয়ার জায়গায় আমি থাকলে কিভাবে মানাতাম। আর তুমি এটাকে কি বানাই দিলা। আজব।
আর শুনো, ডিভোর্স বললেই ডিভোর্স হয়ে যাবে না। ডিভোর্স একটা শব্দ।
তখন উনি সাথে সাথে বলেছেন,, ডিভোর্স ডিভোর্স। এতেই কি ডিভোর্স হয়ে যাবে? আমার তোমাকে ডিভোর্স দেওয়া ইচ্ছাও নাই। আর কেন ডিভোর্স দিব?
তখন উনি আমাকে উদাহরণ দিলেন যে, ধরো, আমি বললাম, আমার ফ্রেন্ডের সাথে ওর ওয়াইফ এর ডিভোর্স হয়ে গেছে। এতে ডিভোর্স বলায় তুমি তালাক হয়ে যাবে? কিভাবে! তখন উনি আমার সাথে অনেক রাগ করেন।
এর কিছুক্ষণ পর, আমার মন খারাপ দেখে, উনি আমাকে আবার তালাকের বিধান বুঝানোর জন্য বলেন যে, শুনো, আমি তালাক বলছি, এতেই তালাক হয়ে যাবে না। তুমি তালাক শব্দ শুনলে এমন আতঙ্কিত হয়ে যাও কেন! উনি আরও বলেন, তালাক দিতে একটা ভিত্তি লাগে,, এভাবে বলতে হবে, ধরো, করিম বলতেছে, আমি করিম আমার ওয়াইফকে সুস্থ মস্তিষ্কে তালাক দিলাম তাহলে হবে। শুধু তালাক বললে হবে কেন? ধরো, আমি আমার মেয়েকে তালাকের বিধান শিখাচ্ছি। এখানে তালাক বলায় তুমি তালাক হয়ে যাবে? কিভাবে!!
তখন উনি অভিনয় করে দেখান, তালাক শব্দ শুনলে আমি কেমন করি। উনার অভিনয় ছিল এমন,
উনি তালাক বলে আমার মুখ চেপে ধরেন। তারপর বলেন, তুমি এমন করো আমার সাথে। এগুলো ভালো মানুষের কাজ না।
তারপর আর আলোচনা হয়নি এসব নিয়ে।
হুজুর, আমি এখন অনেক চিন্তায় আছি আমাদের তালাক হয়ে গেছে কি না।
আমার স্বামী আমাকে তালাক দিতে চান না। তালাকের কথা শুনলেই রাগ দেখান। আমার তালাক নিয়ে ওয়াসওয়াসা আছে।।আমি প্রায় এসব নিয়ে উনাকে জিজ্ঞাসা করলে উনি আমাকে বকা দিতেন। দয়া করে আমাকে বলুন, আমাদের বিয়ে ঠিক আছে কি না।
আমরা হানাফী মাযহাব অনুসরণ করে নিজেরা বিয়ে করেছিলাম এবং এই মাযহাব অনুসরণ করি।
তাই তালাকের মাসআলা হানাফী মাযহাব অনুযায়ী দিবেন দয়া করেন।
আমার যতটুকু মনে ছিল তাই লিখেছি।
হুজুর,, এই ঘটনার প্রায় ১সপ্তাহ আগে আমি ইস্তিখারা করেছিলাম যে, আমি আমার স্বামীর সাথে হালাল আছি না। নাকি হারাম হয়ে ভুল করছি। এই নামায পড়ার পর আমার স্বামীর সাথে আমার সবকিছু ভালো যায়। উনি আমার সাথে দেখা করতে আসেন আমরা ভালো সময় কাটাই একসাথে। কিন্ত এর মাঝেই উপরের ঘটনাটি ঘটে। উনি আমাকে বুঝানোর পর আবার সব সুন্দরভাবে ঠিক হয়ে যায়। উনার এবার দেখা করার পর থেকে উনার প্রতি আমার ভালোবাসা অনেক বেড়ে যায়।
আমি বুঝতেছিনা আমি এখন কি করব!

Answer

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়েছি এবং বুঝেছি। আপনি তালাক নিয়ে খুবই চিন্তিত। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে আমরা হানাফি মাযহাবের আলোকে নিম্নোক্ত মাসআলা বর্ণনা করছি।

ঘটনার বিশ্লেষণ ও মাসআলা:

১. প্রথম ঘটনা: আপনি আপনার আপুর কথা বলছিলেন, তখন আপনার স্বামী বলেছিলেন, "ভাইয়ার জায়গায় আমি থাকলে কি করতাম জানো?" — এটি কোনো তালাকের ইঙ্গিতবাহী বাক্য নয়। এটি ছিল একটি প্রশ্নমূলক বা শর্তসাপেক্ষ আলোচনা। এতে কোনো তালাক পতিত হয়নি।

২. দ্বিতীয় ঘটনা: আপনি যখন তার মুখ চেপে ধরেন এবং তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন, "তোমার তালাক দেওয়া...." — আপনি পুরো কথা শুনেননি। কিন্তু তিনি পরে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, তিনি বলতে চেয়েছিলেন, "তোমার তালাক দেওয়ার ভয় দেখানো ঠিক নয়" বা এরকম কিছু। যেহেতু তিনি তালাকের নিয়তে বা তালাকের শব্দটি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেননি (যেমন: "তোমাকে তালাক দিলাম"), তাই এতেও কোনো তালাক পতিত হয়নি।

৩. তৃতীয় ঘটনা: তিনি বলেছিলেন, "ডিভোর্স ডিভোর্স" — এটি একটি ইংরেজি শব্দ। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, যদি কোনো স্বামী ইংরেজি "ডিভোর্স" শব্দটি উচ্চারণ করে, তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে যদি তার নিয়ত তালাকের হয় অথবা প্রেক্ষাপট থেকে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। কিন্তু আপনার বর্ণনায় তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, "আমার তোমাকে ডিভোর্স দেওয়া ইচ্ছাও নাই। আর কেন ডিভোর্স দিব?" — অর্থাৎ তার নিয়ত তালাকের ছিল না, বরং তিনি আপনাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, শুধু শব্দটি বললেই তালাক হয় না। তাই এতেও কোনো তালাক পতিত হয়নি।

৪. চতুর্থ ঘটনা: তিনি বলেছিলেন, "শুনো, আমি তালাক বলছি, এতেই তালাক হয়ে যাবে না।" — এটি ছিল একটি শিক্ষামূলক বা উদাহরণস্বরূপ বক্তব্য। তিনি তালাক দেওয়ার নিয়তে এ কথা বলেননি। হানাফি মাযহাবে, তালাকের শব্দ যদি শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বা উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, তবে তাতে তালাক পতিত হয় না। যেমন: কেউ যদি তার মেয়েকে তালাকের বিধান শেখানোর জন্য বলে, "তালাক বললে তালাক হয়," তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৮৮)

৫. পঞ্চম ঘটনা: তিনি অভিনয় করে "তালাক" শব্দটি উচ্চারণ করে আপনার মুখ চেপে ধরেছিলেন। এটি ছিল আপনার আচরণের প্রতিক্রিয়ায় একটি নকল বা প্রদর্শন। এটিও তালাকের নিয়তে বলা হয়নি, তাই এতেও কোনো তালাক পতিত হয়নি।

সিদ্ধান্ত:

আপনার বর্ণিত সকল ঘটনা বিশ্লেষণ করে আমরা বলতে পারি যে, আপনার তালাক পতিত হয়নি। আপনার বিবাহ এখনও বৈধ ও হালাল রয়েছে। আপনার স্বামীর কোনো বক্তব্য বা কাজে তালাকের নিয়ত ছিল না, বরং তিনি আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। তাই আপনার চিন্তা ও ওয়াসওয়াসা দূর করুন।

আপনার জন্য কিছু পরামর্শ:

১. ওয়াসওয়াসা থেকে দূরে থাকুন: শয়তান প্রায়ই মুমিনদের মনে তালাক নিয়ে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে। আপনি যখনই এমন চিন্তা করবেন, তখন "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।

২. স্বামীর সাথে আলোচনা: আপনার স্বামী আপনাকে ভালোবাসেন এবং তালাক দিতে চান না। তাই এই বিষয়ে বারবার প্রশ্ন করে তাকে বিরক্ত করবেন না। বরং একসাথে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করার চেষ্টা করুন।

৩. ইস্তিখারার ফল: আপনি ইস্তিখারা করার পর আপনার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে এবং স্বামীর প্রতি ভালোবাসা বেড়েছে — এটি একটি ভালো লক্ষণ। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।

৪. বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: ভবিষ্যতে কোনো তালাক সংক্রান্ত ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির কাছে প্রশ্ন করুন। নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেবেন না।

দলিল:

  • রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী), ৩/২৮৮: তালাকের শব্দ শিক্ষা বা উদাহরণ হিসেবে বললে তালাক পতিত হয় না।
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৩: তালাকের নিয়ত ছাড়া শুধু শব্দ উচ্চারণ করলে তালাক পতিত হয় না (যদি না তা স্পষ্ট তালাকের শব্দ হয় এবং প্রেক্ষাপট তালাকের হয়)।
  • আল-হিদায়া, ২/৩৭৯: তালাকের ইঙ্গিতবাহী শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত।

আল্লাহ তায়ালা আপনার সম্পর্ককে আরও সুন্দর ও বরকতময় করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.