শাফিঈ মাযহাব অনুযায়ী তাফবীযে তালাকের বিধান।
Marriage and Divorce · Shafei
Question
Answer
তালাকের অধিকার (তাফভীযে তালাক) সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো: যদি স্বামী স্ত্রীকে একটি নির্দিষ্ট মজলিশের (সমাবেশ/সময়) জন্য তালাকের অধিকার দেয়, এবং সেই মজলিশ শেষ হয়ে যায়, তাহলে সেই অধিকার বাতিল হয়ে যাবে। মেসেজটি ইনবক্সে থাকা বা না থাকা এতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। মেসেজ ডিলিট করা জরুরি নয়।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. তাফভীযে তালাক (تفویض الطلاق) কী?
তাফভীযে তালাক হলো স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অধিকার অর্পণ করা। এটি দুটি প্রকারে হয়ে থাকে:
ক. শর্তহীন তাফভীয: স্বামী স্ত্রীকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেয় যে, সে যেকোনো সময় তালাক দিতে পারবে।
খ. শর্তযুক্ত তাফভীয: স্বামী স্ত্রীকে নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট মজলিশ বা নির্দিষ্ট শর্তের সাথে তালাকের অধিকার সংযুক্ত করে দেয়।
২. শর্তযুক্ত তাফভীযের বিধান
যখন স্বামী স্ত্রীকে একটি নির্দিষ্ট মজলিশের জন্য তালাকের অধিকার দেয়, তখন সেই মজলিশ শেষ হওয়ার সাথে সাথে সেই অধিকার বাতিল হয়ে যায়। স্ত্রী আর তালাক দিতে পারবে না।
ইমাম শাফিঈ (রহ.)-এর মতে:
ইমাম শাফিঈ (রহ.) তাঁর আল-উম্ম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, যদি স্বামী স্ত্রীকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তালাকের অধিকার দেয়, তাহলে সেই সময় পার হয়ে গেলে অধিকার বাতিল হয়ে যাবে। (আল-উম্ম, কিতাবুত তালাক)
ইমাম নববী (রহ.)-এর বক্তব্য:
ইমাম নববী (রহ.) আল-মাজমূ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
"إذا قال لامرأته: أمرك بيدك إلى شهر، فمضى الشهر بطل ذلك"
"যদি কেউ তার স্ত্রীকে বলে: তোমার ব্যাপার তোমার হাতে এক মাস পর্যন্ত, অতঃপর মাস শেষ হয়ে গেলে সেই অধিকার বাতিল হয়ে যাবে।" (আল-মাজমূ', ১৭তম খণ্ড, তালাক অধ্যায়)
৩. মেসেজ ইনবক্সে থাকার প্রভাব
মেসেজটি ইনবক্সে থাকা বা না থাকা তালাকের অধিকারের উপর কোনো প্রভাব ফেলে না। কারণ:
১. অধিকারটি মজলিশের সাথে সংযুক্ত ছিল: স্বামী যখন "এই মজলিশের জন্য" তালাকের অধিকার দিয়েছে, তখন সেই মজলিশ শেষ হওয়ার সাথে সাথে অধিকারটি বাতিল হয়ে গেছে। মেসেজটি ইনবক্সে থাকা মানে এই নয় যে, অধিকারটি এখনও বলবৎ আছে।
২. মেসেজ ডিলিট করা জরুরি নয়: মেসেজটি ডিলিট করা বা না করা কোনো শর্ত নয়। এটি কেবল একটি মাধ্যম ছিল অধিকার প্রদানের। অধিকার প্রদানের মাধ্যমটি (মেসেজ) থাকা বা না থাকা অধিকারের অস্তিত্বের উপর প্রভাব ফেলে না।
৪. শাফিঈ মাযহাবের মূলনীতি
শাফিঈ মাযহাবের মূলনীতি অনুযায়ী:
- তালাকের অধিকার যদি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেওয়া হয়, তবে সেই সময় শেষ হলে অধিকার বাতিল হয়। (মুগনী আল-মুহতাজ, ৪র্থ খণ্ড, তালাক অধ্যায়)
- তালাকের অধিকার যদি নির্দিষ্ট মজলিসের জন্য দেওয়া হয়, তবে সেই মজলিস শেষ হলে অধিকার বাতিল হয়। (তুহফাতুল মুহতাজ, ৮ম খণ্ড, তালাক অধ্যায়)
ইমাম ইবনে হাজার আল-হায়তামী (রহ.) তাঁর তুহফাতুল মুহতাজ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
"ولو قال: طلقي نفسك في هذا المجلس، فلم تطلق حتى تفرقا، لم يكن لها ذلك بعد التفرق"
"যদি স্বামী বলে: এই মজলিসে তুমি নিজেকে তালাক দাও, অতঃপর স্ত্রী তালাক না দিয়ে মজলিস শেষ করে দেয়, তাহলে মজলিস শেষ হওয়ার পর তার তালাক দেওয়ার অধিকার থাকবে না।" (তুহফাতুল মুহতাজ, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৫)
৫. আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- স্বামী স্ত্রীকে মেসেঞ্জারে মেসেজ পাঠিয়ে একটি নির্দিষ্ট মজলিশের জন্য তালাকের অধিকার দিয়েছে
- সেই মজলিশ পার হয়ে গেছে
- কিন্তু মেসেজটি ইনবক্সে থেকে গেছে
এই অবস্থায়:
- মজলিশ শেষ হওয়ার সাথে সাথে তালাকের অধিকার বাতিল হয়ে গেছে
- স্ত্রীর আর কোনো তালাকের অধিকার অবশিষ্ট নেই
- মেসেজটি ডিলিট করা জরুরি ছিল না
- মেসেজটি ইনবক্সে থাকা বা না থাকা কোনো প্রভাব ফেলে না
৬. সতর্কতামূলক পরামর্শ
যদিও শরীয়তের বিধান অনুযায়ী অধিকার বাতিল হয়ে গেছে, তবুও নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি:
১. মেসেজটি ডিলিট করা ভালো: যদিও এটি জরুরি নয়, তবে ভবিষ্যতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে মেসেজটি ডিলিট করে দেওয়া ভালো।
২. স্ত্রীকে জানিয়ে দেওয়া: স্ত্রীকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া উচিত যে, নির্দিষ্ট মজলিশের জন্য দেওয়া তালাকের অধিকারটি মজলিশ শেষ হওয়ায় বাতিল হয়ে গেছে।
৩. ভবিষ্যতে সতর্কতা: ভবিষ্যতে তালাকের অধিকার দেওয়ার সময় স্পষ্টভাবে শর্ত উল্লেখ করা উচিত।
উপসংহার
শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট মজলিশের জন্য দেওয়া তালাকের অধিকার (তাফভীযে তালাক) সেই মজলিশ শেষ হওয়ার সাথে সাথে বাতিল হয়ে যায়। মেসেজটি ইনবক্সে থাকা বা না থাকা এতে কোনো প্রভাব ফেলে না। মেসেজ ডিলিট করা জরুরি ছিল না, তবে ভালো উদ্দেশ্যে ডিলিট করা যেতে পারে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।