অঙ্গ হানীর ক্ষেত্রে যদি শিরক কুফর করে সেই ক্ষেত্রে বিধান

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 3595
Questioner: Shahriar Muktadir
Question Asked: 07 Aug 2026, 11:55 AM
Reviewed & Published: 07 Aug 2026, 03:00 PM
Views: 8
Tokens: 3,548
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কারো অঙ্গ হানীর ক্ষেত্রে যদি শিরক কুফর করে সে কি কাফের হবে কি বা এই ক্ষেত্রে আসলে বিধান কি হবে ?

Answer

অঙ্গ হানির ক্ষেত্রে জুয়া/শিরক/কুফর করার বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

কারো অঙ্গ হানির (ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার) ক্ষেত্রে যদি কেউ জুয়া খেলে, শিরক করে বা কুফরী কথা বলে, তাহলে সে কি কাফের হবে? এই ক্ষেত্রে শরয়ী বিধান কী?

উত্তর

১. কুফরী কথা বললে কাফের হওয়ার বিধান

যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে, জেনে-বুঝে এবং নিজের ইচ্ছায় কুফরী কথা বলে, তাহলে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে এবং কাফের হয়ে যাবে। এটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।

কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে:

وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ "আর যদি আপনি তাদের জিজ্ঞেস করেন, তারা অবশ্যই বলবে, আমরা তো কেবল কথার কথা বলছিলাম এবং খেলাধুলা করছিলাম। আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসূলকে উপহাস করছিলে? তোমরা ওজর পেশ করো না, তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরী করেছ।" (সূরা আত-তাওবাহ: ৬৫-৬৬)

রদ্দুল মুহতার (শামী)-এ বর্ণিত আছে:

مَنْ تَكَلَّمَ بِكَلِمَةِ الْكُفْرِ صَارَ كَافِرًا وَإِنْ كَانَ مَازِحًا "যে ব্যক্তি কুফরী শব্দ উচ্চারণ করল, সে কাফের হয়ে গেল, যদিও সে ঠাট্টা-তামাশা করে থাকে।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/২৩৬)

২. জুয়া খেলার বিধান

জুয়া খেলা সম্পূর্ণ হারাম এবং কবীরা গুনাহ। তবে জুয়া খেলার কারণে ব্যক্তি কাফের হয় না, বরং সে ফাসেক (গুনাহগার মুসলিম) থাকে।

কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ "হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী এবং ভাগ্য-নির্ধারক তীর—এসব শয়তানের কাজের অন্তর্ভুক্ত নাপাক বস্তু। সুতরাং তোমরা এসব থেকে বিরত থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ৯০)

৩. শিরক করার বিধান

শিরক দুই প্রকার:

  • শিরকে জালী (স্পষ্ট শিরক): যেমন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করা, সিজদা করা ইত্যাদি। এটি করলে ব্যক্তি কাফের হয়ে যায়।
  • শিরকে খফী (গোপন শিরক): যেমন রিয়া (লোক দেখানো আমল)। এটি কবীরা গুনাহ, তবে কুফরী নয়।

যদি কেউ অঙ্গ হানির ক্ষেত্রে কোনো মাজারের কাছে, পীরের কাছে, বা অন্য কারো কাছে এমনভাবে প্রার্থনা করে যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে উদ্দেশ্য করে করা হয় এবং তাকে ক্ষমতাধর মনে করে, তাহলে এটি শিরকে জালী হবে এবং ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: যদি ব্যক্তি অজ্ঞতার কারণে বা ভুল বোঝাবুঝির কারণে এমনটি করে থাকে, তাহলে তাকে প্রথমে শিরক ও কুফর সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে এবং তাওবা করার সুযোগ দিতে হবে। যদি সে তাওবা করে এবং শিরক পরিত্যাগ করে, তাহলে তার ঈমান ফিরে আসবে।

৪. অঙ্গ হানির ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা

অঙ্গ হানি বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে মানসিক চাপ, হতাশা বা পাগলামির মতো অবস্থা থাকলে সেক্ষেত্রে বিধান ভিন্ন হতে পারে:

ফতোয়ায়ে আলমগীরী-তে বর্ণিত আছে:

وَإِذَا غَلَبَهُ الْوَسْوَاسُ وَالْخَوْفُ حَتَّى تَكَلَّمَ بِكَلِمَةِ الْكُفْرِ لَا يَكْفُرُ "যদি কাউকে ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ) এবং ভয় এমনভাবে গ্রাস করে যে সে কুফরী শব্দ উচ্চারণ করে ফেলে, তাহলে সে কাফের হবে না।" (ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ২/২৫৫)

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) থেকে বর্ণিত:

مَنْ أُكْرِهَ عَلَى الْكُفْرِ فَتَكَلَّمَ بِهِ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ لَا يَكْفُرُ "যাকে কুফরী করতে বাধ্য করা হয় এবং সে তা উচ্চারণ করে কিন্তু তার অন্তর ঈমানে প্রশান্ত থাকে, সে কাফের হবে না।" (আল-হিদায়া, ২/১৮৫)

৫. মানসিক ভারসাম্যহীনতার ক্ষেত্রে

যদি অঙ্গ হানির কারণে ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং পাগল বা অচেতন অবস্থায় কুফরী কথা বলে, তাহলে সে কাফের হবে না। কেননা পাগল ও অচেতন ব্যক্তির উপর শরয়ী বিধান প্রযোজ্য নয়।

হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:

رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ "তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে (তাদের উপর শরয়ী বিধান প্রযোজ্য নয়): ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগে, শিশু যতক্ষণ না বালেগ হয়, এবং পাগল যতক্ষণ না সুস্থ হয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৪৩৯৮)

৬. তাওবার সুযোগ

যদি কেউ অঙ্গ হানির ক্ষেত্রে কুফরী কথা বলে ফেলে, তাহলে তার জন্য বিধান হলো:

১. তাওবা করা: সাথে সাথে তাওবা করতে হবে এবং ইস্তিগফার পড়তে হবে। ২. কালেমা শাহাদাত পুনরায় পড়া: ঈমান পুনর্নবীকরণ করতে হবে। ৩. গোসল করা: অনেক আলিমের মতে কুফরী থেকে ফিরে এলে গোসল করা মুস্তাহাব। ৪. নিকাহ পুনর্বহাল: যদি বিবাহিত হয় এবং স্ত্রী থাকে, তাহলে নিকাহ পুনরায় করা প্রয়োজন হতে পারে (যদি কুফরী প্রমাণিত হয়)।

ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:

وَإِذَا ارْتَدَّ الْمُسْلِمُ ثُمَّ أَسْلَمَ يُجَدِّدُ النِّكَاحَ "যদি কোনো মুসলিম মুরতাদ হয় এবং পরে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তাকে নিকাহ পুনর্বহাল করতে হবে।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/২৩৬)

সারসংক্ষেপ

| অবস্থা | বিধান | |--------|--------| | ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরী কথা বলা | কাফের হবে, তাওবা ও ঈমান পুনর্নবীকরণ প্রয়োজন | | জুয়া খেলা | হারাম ও কবীরা গুনাহ, তবে কাফের হবে না | | শিরকে জালী (স্পষ্ট শিরক) | কাফের হবে, তাওবা প্রয়োজন | | মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় | কাফের হবে না | | ভয় বা বাধ্য হয়ে | কাফের হবে না (যদি অন্তর ঈমানে অটল থাকে) | | অজ্ঞতাবশত | কাফের হবে না, তবে শিক্ষা দিতে হবে |

দলিলসমূহ

  1. সূরা আত-তাওবাহ: ৬৫-৬৬
  2. সূরা আল-মায়িদাহ: ৯০
  3. রদ্দুল মুহতার, ৪/২৩৬
  4. ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ২/২৫৫
  5. আল-হিদায়া, ২/১৮৫
  6. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৪৩৯৮

উপসংহার: অঙ্গ হানির ক্ষেত্রে কেউ যদি জেনে-বুঝে ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরী কথা বলে বা শিরকে জালী করে, তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে এবং তাকে তাওবা করে ঈমান পুনর্নবীকরণ করতে হবে। তবে জুয়া খেললে সে কাফের হবে না, বরং গুনাহগার হবে। আর যদি মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় বা অজ্ঞতাবশত এমনটি হয়ে থাকে, তাহলে সে কাফের হবে না। অঙ্গ হানির মতো কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.