ঘরে পুরুষের দায়িত্ব

Family Life · Hanafi

Question No: 3523
Questioner: Qurrata Ain
Question Asked: 05 Aug 2026, 02:45 PM
Reviewed & Published: 05 Aug 2026, 02:54 PM
Views: 11
Tokens: 4,006
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। একজন পুরুষের ঘরে কি কি দায়িত্ব পালন করা উচিত? অবিবাহিত অবস্থায় এবং বিবাহিত অবস্থায়। তার নিজের ব্যবহৃত পোশাক, বিছানা কি যথাস্থানে গুছিয়ে রাখা উচিত না? ইসলামে ছেলেদের যেহেতু ঘরের বাইরে দায়িত্ব তাই বলে ঘরকে প্রশান্তিদায়ক পরিপাটি রাখতে কি ছেলেদের কোনো ভূমিকা নেই? ইসলাম এখানে কি বলে। ডিটেইল এনসার দিলে ভালো হয়

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। ঘরে পুরুষের দায়িত্ব সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং ভারসাম্যপূর্ণ। ইসলাম শুধু নারী বা পুরুষকে একতরফা দায়িত্ব দেয়নি, বরং প্রত্যেকের উপর তাদের সামর্থ্য ও অবস্থান অনুযায়ী দায়িত্ব অর্পণ করেছে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. অবিবাহিত অবস্থায় পুরুষের দায়িত্ব

অবিবাহিত অবস্থায় একজন পুরুষের ঘর সংক্রান্ত দায়িত্বগুলো হলো:

ক. নিজের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা: ইসলাম পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটিতাকে ঈমানের অর্ধেক বলে ঘোষণা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

"পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।" (সহীহ মুসলিম: ২২৩)

তাই নিজের ব্যবহৃত পোশাক, বিছানা যথাস্থানে গুছিয়ে রাখা শুধু উচিত নয়, বরং এটি একটি প্রশংসনীয় কাজ এবং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নত। তিনি নিজেও ঘরে থাকতেন, নিজের কাজ নিজে করতেন এবং ঘর পরিপাটি রাখতেন। হাদিসে এসেছে, আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে কী করতেন?" তিনি বললেন:

"তিনি ঘরে থাকতেন, পরিবারের কাজে সাহায্য করতেন এবং নিজের কাপড় নিজে সেলাই করতেন, নিজের জুতা নিজে মেরামত করতেন।" (মুসনাদ আহমাদ: ২৫৬০৬)

খ. ঘরের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা: ঘরকে প্রশান্তিদায়ক ও পরিচ্ছন্ন রাখা প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব। এটি শুধু নারীর কাজ নয়।

গ. পরিবারের সাথে সদ্ব্যবহার: অবিবাহিত অবস্থায় মা-বাবা, ভাই-বোনদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা এবং তাদের সেবা করা একজন পুরুষের অন্যতম দায়িত্ব।


২. বিবাহিত অবস্থায় পুরুষের দায়িত্ব

বিবাহিত অবস্থায় একজন পুরুষের দায়িত্ব আরও বিস্তৃত হয়। ইসলাম তাকে পরিবারের "অভিভাবক" বা "দায়িত্বশীল" হিসেবে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"পুরুষরা নারীদের অভিভাবক, কারণ আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং কারণ তারা নিজেদের মাল থেকে খরচ করে।" (সূরা আন-নিসা: ৩৪)

বিবাহিত পুরুষের প্রধান দায়িত্বগুলো হলো:

ক. ভরণ-পোষণের দায়িত্ব: স্ত্রী ও সন্তানদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা পূরণ করা স্বামীর উপর ফরজ (আবশ্যক)। এটি ইসলামের মৌলিক বিধান। (সূরা আত-তালাক: ৭)

খ. স্ত্রীর সাথে উত্তম ব্যবহার: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

"তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।" (তিরমিজি: ১১৬২)

গ. ঘরের নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখা: স্বামীকে ঘরে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে স্ত্রী ও সন্তানরা নিরাপদ ও শান্তিতে থাকে। এটি স্বামীর দায়িত্ব

ঘ. ঘরের কাজে সাহায্য করা: ঘরের কাজ শুধু স্ত্রীর দায়িত্ব নয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে ঘরের কাজে সাহায্য করতেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন:

"তিনি (নবী) ঘরের কাজে সাহায্য করতেন, আর যখন নামাজের সময় হতো, তখন নামাজে চলে যেতেন।" (বুখারি: ৬০৪)


৩. ঘর পরিপাটি রাখায় পুরুষের ভূমিকা

আপনি প্রশ্নে উল্লেখ করেছেন, "ইসলামে ছেলেদের যেহেতু ঘরের বাইরে দায়িত্ব, তাই বলে ঘরকে প্রশান্তিদায়ক পরিপাটি রাখতে কি ছেলেদের কোনো ভূমিকা নেই?"

এর উত্তর হলো: এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। ইসলাম কখনোই বলে না যে ঘর পরিপাটি রাখা শুধু নারীর কাজ। বরং ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছে:

১. ঘরের বাইরে উপার্জন করা পুরুষের প্রধান দায়িত্ব। ২. ঘরের ভেতরের ব্যবস্থাপনা নারীর প্রধান দায়িত্ব। ৩. কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, পুরুষ ঘরের কাজ করবে না বা ঘর পরিপাটি রাখবে না। বরং উভয়েই একে অপরের সহযোগী।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনই এর সর্বোত্তম উদাহরণ। তিনি ছিলেন উম্মতের নেতা, যুদ্ধের সেনাপতি, বিচারক—সবকিছু। তবুও তিনি ঘরে ফিরে নিজের কাজ নিজে করতেন, ঘরের কাজে সাহায্য করতেন।


৪. গুরুত্বপূর্ণ হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) এবং ফাতাওয়া আলমগীরি-তে বলা হয়েছে:

  • স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণ-পোষণ (খোরাকি) ফরজ। এর মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান অন্তর্ভুক্ত।
  • ঘরের কাজ করা স্ত্রীর উপর ফরজ নয়, বরং এটি স্বেচ্ছামূলক ও সওয়াবের কাজ। তবে উত্তম ব্যবহারের অংশ হিসেবে স্ত্রী ঘরের কাজ করবে এবং স্বামীও তার সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করবে।
  • স্বামী যদি স্ত্রীকে ঘরের কাজে বাধ্য করে এবং স্ত্রী তা না চায়, তাহলে ইসলামি দৃষ্টিতে স্ত্রীকে ঘরের কাজে বাধ্য করা যায় না। তবে উত্তম ব্যবহারের জন্য স্ত্রীর উচিত স্বামীর সহযোগিতা করা।

৫. চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ

| অবস্থা | দায়িত্ব | |--------|----------| | অবিবাহিত | নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা, ঘর পরিপাটি রাখা, মা-বাবার সেবা করা, ঘরের কাজে সাহায্য করা | | বিবাহিত | ভরণ-পোষণ করা, স্ত্রীর সাথে উত্তম ব্যবহার করা, ঘরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঘরের কাজে সাহায্য করা, সন্তানদের ইসলামি তালিম দেওয়া |

মূল কথা: ঘরকে প্রশান্তিদায়ক ও পরিপাটি রাখা শুধু নারীর দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি যৌথ দায়িত্ব। পুরুষের বাইরের দায়িত্ব থাকলেও ঘরের ভেতরে তার ভূমিকা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনই এর সর্বোত্তম প্রমাণ। তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, তবুও তিনি ঘরের কাজে সাহায্য করতেন এবং নিজের জিনিসপত্র নিজে গুছিয়ে রাখতেন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ইসলামের সঠিক অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.