স্বপ্নে অনেক সময় এডভান্স ইঙ্গিতপূর্ণ জিনিস দেখি
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
আমি অনেক সময় এডভান্স ইঙ্গিতপূর্ণ স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন গুলো সাধারণত ম্যাটাফোরিক্যাল হয়। আর দিনের বেলায় ঘুমালে আমার অনুপস্থিতিতে কোথাও কিছু ভালো, মন্দ হলে এটাও রূপক ভাবে দেখি। কিংবা আজকের দিনে কিছু ঘটলে ইঙ্গিত বুঝি স্বপ্নে। ভয়ংকর কিছু থাকে না কিন্তু সাথে সাথে ঘুম থেকে উঠে যাই। মাঝে মাঝে ঘুমাতে ভয় পাই খুব আতঙ্ক লাগে।আমি কোথাও শুনে ছিলাম জ্বীন এর ওয়াসওয়াসা থাকলে এমন হয়।
আমি এই বিষয়ে জানতে চাই।আর আমার কি করা উচিত।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি যে বিষয়ে জানতে চেয়েছেন, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক ইনশাআল্লাহ।
১. স্বপ্নের প্রকৃতি ও প্রকারভেদ
ইসলামী পরিভাষায় স্বপ্ন সাধারণত তিন প্রকার:
১. রহমানী স্বপ্ন (সত্য স্বপ্ন): এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ বা নির্দেশনা বহন করে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "সত্য স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে।" (সহীহ বুখারী: ৬৯৮৬)
২. শয়তানী স্বপ্ন (ভয়-ভীতি প্রদর্শন): এটি শয়তানের পক্ষ থেকে হয়, যাতে মানুষকে ভয় দেখানো হয় বা মনকে অস্থির করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "আর দুঃস্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে।" (সহীহ মুসলিম: ২২৬৩)
৩. মনস্তাত্ত্বিক স্বপ্ন (নফসের খেয়াল): এটি মানুষের নিজের চিন্তা-ভাবনা, দৈনন্দিন কাজকর্ম বা মনের অবস্থার প্রতিফলন। ইবনে সীরীন (রহ.) বলেন, "স্বপ্ন তিন প্রকার: নফসের কথা, শয়তানের ভয় দেখানো এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ।" (সহীহ বুখারী, বাবু ক্বাওলিল্লাহি তাআলা: ৬৯৮৩)
আপনি যে স্বপ্নগুলো দেখেন, সেগুলো যদি রূপক (মেটাফোরিক্যাল) হয় এবং দিনের ঘটনার সাথে সম্পর্কিত হয়, তবে সেগুলো মূলত মনস্তাত্ত্বিক স্বপ্ন হতে পারে। অর্থাৎ, আপনার অবচেতন মন দিনের ঘটনাগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে স্বপ্নের মাধ্যমে প্রকাশ করে।
২. জ্বীনের ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে
আপনি শুনেছেন যে, জ্বীনের ওয়াসওয়াসার কারণে এমন হয়। এটি সম্পূর্ণ সঠিক নয়। জ্বীনের প্রভাব বা ওয়াসওয়াসা সাধারণত ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন, আতঙ্ক, বা খারাপ চিন্তা নিয়ে আসে। কিন্তু আপনি বলেছেন, আপনার স্বপ্নে ভয়ংকর কিছু থাকে না, বরং সেগুলো ইঙ্গিতপূর্ণ। তাই এটি জ্বীনের ওয়াসওয়াসা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে, ঘুমাতে ভয় পাওয়া এবং আতঙ্ক বোধ করা শয়তানের ওয়াসওয়াসা হতে পারে। শয়তান মানুষকে ভয় দেখিয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয়ই শয়তান তার বন্ধুদের ভয় দেখিয়ে থাকে।" (সূরা আলে ইমরান: ১৭৫)
৩. আপনার করণীয়
আপনার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মেনে চলা উচিত:
ক. ঘুমানোর আগে দোয়া ও যিকির:
- আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমানো। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "যে ব্যক্তি রাতে ঘুমানোর সময় আয়াতুল কুরসি পড়বে, তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিয়োজিত থাকবে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে আসতে পারবে না।" (সহীহ বুখারী: ২৩১১)
- সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে সমস্ত শরীরে মালিশ করা। (সহীহ বুখারী: ৫০১৭)
- ঘুমানোর আগে বিছানায় শোয়ার সময় দোয়া পড়া: "বিসমিকা আল্লাহুম্মা আহইয়া ওয়া বিসমিকা আমুতু" (হে আল্লাহ! আপনার নামে আমি জীবিত হই এবং আপনার নামেই মৃত্যুবরণ করি)। (সহীহ বুখারী: ৬৩২৪)
খ. দুঃস্বপ্ন দেখলে করণীয়: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "যদি কেউ এমন কিছু দেখে যা সে অপছন্দ করে, তবে সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করে (হালকা ফুঁ দেয়), শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং অন্যদিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে।" (সহীহ মুসলিম: ২২৬১)
গ. স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে মাথা ঘামানো থেকে বিরত থাকা: যেহেতু আপনার স্বপ্নগুলো ভয়ংকর নয় এবং সেগুলো নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করলে ওয়াসওয়াসা বাড়তে পারে, তাই স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করাই ভালো। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন, "স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকা এবং প্রতিটি স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া ওয়াসওয়াসার কারণ হতে পারে।" (রদ্দুল মুহতার: ১/৪৩)
ঘ. নিয়মিত নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত: নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত অন্তরকে প্রশান্তি দেয় এবং শয়তানের প্রভাব থেকে রক্ষা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, "জেনে রাখো, আল্লাহর যিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।" (সূরা রাদ: ২৮)
ঙ. ঘুমানোর আগে অজু করা: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "তোমরা যখন ঘুমাতে যাও, তখন অজু করে ডান কাত হয়ে শুয়ো।" (সহীহ বুখারী: ২৪৭)
চ. দিনের বেলা ঘুমানো: দিনের বেলা ঘুমালে (ক্বাইলুলাহ) অনেক সময় মনস্তাত্ত্বিক স্বপ্ন বেশি দেখা যায়। তাই দিনের বেলা ঘুমানোর সময়ও উপরোক্ত দোয়াগুলো পড়ে ঘুমাবেন।
৪. গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
- স্বপ্নকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেবেন না: ইসলামী পণ্ডিতগণ বলেন, সাধারণ মানুষের উচিত স্বপ্ন নিয়ে অতিরিক্ত মাথা ঘামানো নয়। শুধুমাত্র সত্য স্বপ্নই গুরুত্বপূর্ণ, যা নবী-রাসূল বা অতি নেককার ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। সাধারণ মানুষের স্বপ্ন নিয়ে চিন্তা করা ওয়াসওয়াসা বাড়ায়।
- ভয়কে জয় করুন: ঘুমাতে ভয় পাওয়া শয়তানের কুমন্ত্রণা। আপনি যখন ভয় পাবেন, তখন শয়তান আরও প্রভাব বিস্তার করবে। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং উপরোক্ত দোয়াগুলো পড়ে নিশ্চিন্তে ঘুমান।
- ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার দোয়া: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিখিয়েছেন, "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" (আশ্রয় চাই অভিশপ্ত শয়তান থেকে) পড়তে।
৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার স্বপ্নগুলো জ্বীনের ওয়াসওয়াসা নয়, বরং এটি আপনার মনের অবস্থা ও দৈনন্দিন চিন্তার প্রতিফলন। আপনি যদি উপরোক্ত আমলগুলো নিয়মিত করেন, ইনশাআল্লাহ আপনার ভয় ও আতঙ্ক দূর হয়ে যাবে। যদি সমস্যা অব্যাহত থাকে, তবে কোনো অভিজ্ঞ আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হিফাজত করুন। আমিন।