স্বামীর দ্বীনের প্রতি চরম অবহেলাঃ আমার করণীয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
দ্বীনহিন এমন স্বামীর সাথে আমার মন মানসিকতার অনেক পার্থক্য আছে।
সারাদিন শুধু মনে হয় সংসার করা পসিবল হবে না। সে নামাজের জন্য ও উদাসীন।
বিয়ে করার ফলে আমি ও মনে হচ্ছে দ্বীন থেকে ছিটকে যাচ্ছি। নামাজে সুকুন পাচ্ছি না। Alim course করছিলাম ঐটাও কন্টিনিউ করতে ইচ্ছে করে না।
এমতবস্থায় আমার করনীয় কি?
Answer
বিবাহ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: আমি পারিবারিকভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। ছেলের পরিবার দ্বীনদার নয়, কিন্তু বিয়ের আগে বলেছিল আমাকে সম্পূর্ণ পর্দায় রাখবে। বর্তমানে অনেক নন-মাহরামের সামনে যেতে হয়, ছবি তোলা হয়েছে। আমার তীব্র অনুশোচনা কাজ করছে। স্বামী দ্বীনহিন, নামাজে উদাসীন। আমার করণীয় কী?
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ, আপনি দ্বীন সম্পর্কে সচেতন এবং আপনার অন্তরে দ্বীনের জন্য চিন্তা রয়েছে—এটি আপনার জন্য একটি বড় নেয়ামত। আল্লাহ তায়ালা যাকে হেদায়েত দিতে চান, তার অন্তরে দ্বীনের ব্যাপারে সংবেদনশীলতা সৃষ্টি করেন।
১. পর্দা ও ছবি সংক্রান্ত বিধান
পর্দার গুরুত্ব: ইসলামে পর্দা ফরজ। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন:
"হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ ও মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে এবং তাদেরকে কষ্ট দেওয়া হবে না।" (সূরা আহযাব: ৫৯)
ছবি তোলা ও সংরক্ষণ: নন-মাহরামদের কাছে আপনার ছবি থাকা অত্যন্ত গুনাহের বিষয়। তবে আপনার করণীয় হলো:
১. তওবা করুন: আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করুন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন।" (সূরা যুমার: ৫৩)
২. ছবি মুছে ফেলার চেষ্টা করুন: যাদের কাছে ছবি আছে বলে জানেন, তাদেরকে অনুরোধ করে ছবি মুছে ফেলতে বলুন। যদি না পারেন, তবে চিন্তা করবেন না—আপনার দায়িত্ব হলো যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করা।
৩. ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন: এখন থেকে পর্দা কঠোরভাবে মেনে চলুন এবং নন-মাহরামদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন।
২. স্বামীর দ্বীনহীনতা ও আপনার করণীয়
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেছেন যে, স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য ফরজ, তবে আল্লাহর নাফরমানিতে আনুগত্য নেই।
আপনার করণীয়:
১. ধৈর্য ধারণ করুন: স্বামী দ্বীনদার না হলেও, আপনি তার স্ত্রী। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যখন কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে ডাকে এবং স্ত্রী তার ডাকে সাড়া না দেয়, তখন ফেরেশতারা তার উপর অভিশাপ দেয়।" (বুখারি)
২. দ্বীনের দাওয়াত দিন: আপনার স্বামীকে উত্তম পদ্ধতিতে নামাজের গুরুত্ব বোঝান। হাদিসে এসেছে:
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে তার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম।" (তিরমিজি)
৩. আলিম কোর্স চালিয়ে যান: দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ। আলিম কোর্স বন্ধ করবেন না। এটি আপনার জন্য দ্বীনের উপর অটল থাকার মাধ্যম হবে।
৩. বিবাহ বিচ্ছেদের বিষয়ে
বিবাহ বিচ্ছেদ ইসলামে অপছন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"আল্লাহর নিকট হালাল বস্তুর মধ্যে সর্বাপেক্ষা অপছন্দনীয় হলো তালাক।" (আবু দাউদ)
তবে যদি স্বামী দ্বীনহীন হওয়ার কারণে আপনার দ্বীন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং আপনি একত্রে থাকা সম্ভব না হয়, তবে খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ) করার সুযোগ আছে। কিন্তু এর পূর্বে:
- পরিবারের সাথে পরামর্শ করুন
- দ্বীনদার আলেমের সাথে পরামর্শ করুন
- স্বামীকে দ্বীনের দিকে আহ্বান করার চেষ্টা করুন
৪. নামাজে সুকুন না পাওয়া
নামাজে সুকুন না পাওয়া একটি অস্থায়ী অবস্থা। শয়তান আপনার ইবাদতে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। ইমাম আল-তাহাবী (রহ.) বলেছেন, নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন হয়। আপনি:
- বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়ুন
- কুরআন তিলাওয়াত করুন
- দ্বীনদার বান্ধবী ও আত্মীয়দের সাহচর্য গ্রহণ করুন
উপসংহার
১. আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং পর্দা কঠোরভাবে মেনে চলুন ২. স্বামীকে উত্তম পদ্ধতিতে দ্বীনের দিকে আহ্বান করুন ৩. আলিম কোর্স চালিয়ে যান ৪. ধৈর্য ধারণ করুন—আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন ৫. প্রয়োজনে দ্বীনদার আলেমের সাথে পরামর্শ করুন
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা তার ধারণায়ও আসে না।" (সূরা তালাক: ২-৩)
আল্লাহ তায়ালা আপনার দ্বীনি অবস্থা উন্নত করুন এবং আপনাকে ধৈর্য ও সাহস দান করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- সূরা আহযাব: ৫৯ (পর্দার আদেশ)
- সূরা যুমার: ৫৩ (তওবার দরজা)
- সূরা তালাক: ২-৩ (তাকওয়ার পুরস্কার)
- বুখারি (স্বামীর অধিকার)
- আবু দাউদ (তালাক অপছন্দনীয়)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)