মেয়েদের পোষাক আর পারফিউমের ব্যবসা
Business and Job · Hanafi
Question
আর আমি মেয়েদের সুগন্ধি বা আতর বা পারফিউম বিক্রি করলে সেটা কি হারাম হবে? আমি চাই তারা বাসায় পারফিউম ব্যবহার করুক কিন্তু তারা হয়তো বাইরেও দিয়ে যাবে কিন্তু সেটা তো আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, জিজ্ঞেস ও করতে পারি না।
Answer
মেয়েদের পোশাক ও পারফিউমের ব্যবসা সংক্রান্ত ইসলামি বিধান
প্রশ্ন: মেয়েদের বিভিন্ন ধরনের পোশাক (লম্বা, খাটো, ফুল হাতা, হাফ হাতা) বিক্রি করা জায়েজ কি? আর মেয়েদের সুগন্ধি/আতর/পারফিউম বিক্রি করা কি হারাম? আমি তো শুধু বিক্রি করি, ক্রেতারা কোথায় ব্যবহার করবে তা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই।
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
আলহামদুলিল্লাহ ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক। ইসলামি ফিকহের আলোকে আমরা এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. মেয়েদের পোশাক বিক্রির বিধান
মেয়েদের পোশাক বিক্রি করা মূলত জায়েজ, তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে। ইসলামি ফিকহের নীতিমালা অনুযায়ী:
ক. বৈধ পোশাক বিক্রি: যেসব পোশাক শরিয়তসম্মত পর্দার মানদণ্ড পূরণ করে—অর্থাৎ পুরো শরীর ঢেকে রাখে, আকর্ষণীয় ও স্বচ্ছ নয়, পুরুষের পোশাকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়—এমন পোশাক বিক্রি করা সম্পূর্ণ জায়েজ। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, এমন পোশাক তৈরি, বিক্রি ও ক্রয়-বিক্রয় বৈধ।
খ. অশ্লীল বা অশালীন পোশাক বিক্রি: যেসব পোশাক শরিয়তসম্মত পর্দার মানদণ্ড পূরণ করে না—যেমন অত্যন্ত খাটো, স্বচ্ছ, আঁটসাঁট বা শরীরের সৌন্দর্য প্রকাশ করে এমন পোশাক—সেগুলো বিক্রি করা জায়েজ নয়। কেননা এতে গুনাহের সহযোগিতা করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)
গ. ক্রেতার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন: আপনি যদি এমন পোশাক বিক্রি করেন যা সাধারণত বৈধ এবং শরিয়তসম্মত পর্দার মানদণ্ড পূরণ করে, কিন্তু ক্রেতা সেটি অপব্যবহার করতে পারে—তাহলে আপনার ওপর তা দায়বদ্ধ নয়। কেননা প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের আমলের জন্য দায়ী। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ "তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।" (সহিহ বুখারি: ৮৯৩)
তবে যদি পোশাকটি এমন হয় যা সাধারণত শরিয়তসম্মত পর্দার মানদণ্ড পূরণ করে না এবং এর দ্বারা গুনাহ হওয়া নিশ্চিত বা প্রবল ধারণা হয়, তাহলে তা বিক্রি করা জায়েজ হবে না।
ঘ. কামিজ টাইপ পোশাক: আপনি উল্লেখ করেছেন যে আপনি শুধু কামিজ টাইপ পোশাক বিক্রি করেন। যদি এই কামিজগুলো শরিয়তসম্মত পর্দার মানদণ্ড পূরণ করে—অর্থাৎ লম্বা, প্রশস্ত, অ-স্বচ্ছ এবং শরীরের সৌন্দর্য প্রকাশ করে না—তাহলে তা বিক্রি করা জায়েজ। তবে যদি কামিজগুলো খাটো, আঁটসাঁট বা স্বচ্ছ হয়, তাহলে সেগুলো বিক্রি করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)在其著名的《রাদ্দুল মুহতার》 গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
"পোশাক বিক্রির ক্ষেত্রে মূল নীতি হলো—যা দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয় তা বিক্রি করা হারাম, আর যা দ্বারা বৈধ কাজে সহযোগিতা করা হয় তা বিক্রি করা জায়েজ।"
২. মেয়েদের সুগন্ধি/আতর/পারফিউম বিক্রির বিধান
ক. সাধারণ নিয়ম: সুগন্ধি, আতর বা পারফিউম তৈরি, বিক্রি ও ব্যবহার করা ইসলামে বৈধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং সাহাবাগণকে উৎসাহিত করতেন। তবে মহিলাদের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ বিধান রয়েছে।
খ. মহিলাদের সুগন্ধি ব্যবহারের বিধান: মহিলাদের জন্য ঘরে বা মাহরাম পুরুষদের সামনে সুগন্ধি ব্যবহার করা জায়েজ। তবে বাইরে যাওয়ার সময় এমন সুগন্ধি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ যা পুরুষদের আকর্ষণ করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
أَيُّمَا امْرَأَةٍ اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ عَلَى قَوْمٍ لِيَجِدُوا رِيحَهَا فَهِيَ زَانِيَةٌ "যে মহিলা সুগন্ধি ব্যবহার করে এমন সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে যায় যাতে তারা তার সুগন্ধি পায়, সে ব্যভিচারিণী।" (সুনানে তিরমিজি: ২৭৮৬, সুনানে আবু দাউদ: ৪১৭৩)
গ. সুগন্ধি বিক্রির বিধান: সুগন্ধি বিক্রি করা মূলত জায়েজ, কারণ এটি বৈধ পণ্য। তবে যদি বিক্রেতা জানেন যে ক্রেতা এটি হারাম উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে, তাহলে সেক্ষেত্রে বিক্রি করা মাকরূহে তাহরিমি বা হারাম হবে। কিন্তু সাধারণত বিক্রেতা জানেন না যে ক্রেতা কোথায় ব্যবহার করবে—এমতাবস্থায় বিক্রি করা জায়েজ।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তার তাফসিরে মা'আরিফুল কুরআনে উল্লেখ করেছেন:
"যে পণ্য নিজে বৈধ, কিন্তু কেউ তা হারাম কাজে ব্যবহার করতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিক্রি করা নিষিদ্ধ নয়, যতক্ষণ না বিক্রেতা নিশ্চিতভাবে জানেন যে ক্রেতা তা হারাম কাজে ব্যবহার করবে।"
ঘ. আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম: যেহেতু আপনি জানেন না যে ক্রেতারা পারফিউম কোথায় ব্যবহার করবে, এবং আপনি চান তারা ঘরে ব্যবহার করুক, তাই আপনার পক্ষ থেকে সুগন্ধি বিক্রি করা জায়েজ। তবে উত্তম হলো, ক্রেতাদেরকে ইসলামি বিধান সম্পর্কে অবহিত করা এবং তাদেরকে বাইরে সুগন্ধি ব্যবহার না করার উপদেশ দেওয়া।
৩. ফিকহি নীতিমালা
ইসলামি ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো:
"الْأَصْلُ فِي الْأَعْيَانِ الْإِبَاحَةُ" "পদার্থের মূল বিধান হলো বৈধতা।"
অর্থাৎ কোনো বস্তু নিজে হারাম না হলে তা বৈধ। পোশাক ও সুগন্ধি নিজে হারাম নয়, তাই এগুলো বিক্রি করা বৈধ। তবে যদি কোনো নির্দিষ্ট পোশাক বা সুগন্ধি এমন হয় যা শরিয়তসম্মত পর্দার মানদণ্ড লঙ্ঘন করে বা হারাম কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেগুলো বিক্রি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৪. ব্যবহারিক পরামর্শ
১. পোশাক নির্বাচনে সতর্কতা: আপনি যে পোশাক বিক্রি করেন সেগুলো যেন শরিয়তসম্মত পর্দার মানদণ্ড পূরণ করে—লম্বা, প্রশস্ত, অ-স্বচ্ছ এবং শরীরের সৌন্দর্য প্রকাশ করে না এমন।
২. ক্রেতাদের সচেতন করা: সম্ভব হলে ক্রেতাদেরকে ইসলামি পর্দার বিধান সম্পর্কে সচেতন করুন এবং তাদেরকে শরিয়তসম্মত পোশাক ব্যবহারে উৎসাহিত করুন।
৩. সুগন্ধি বিক্রির ক্ষেত্রে: সুগন্ধি বিক্রি করা জায়েজ, তবে ক্রেতাদেরকে বাইরে সুগন্ধি ব্যবহার না করার উপদেশ দিন।
৪. নিয়তের গুরুত্ব: আপনার নিয়ত যদি ভালো হয়—যেমন আপনি চান তারা ঘরে ব্যবহার করুক—তাহলে ইনশাআল্লাহ আপনার জন্য কোনো গুনাহ হবে না।
৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
পোশাক বিক্রি: শরিয়তসম্মত পর্দার মানদণ্ড পূরণ করে এমন পোশাক (লম্বা, প্রশস্ত, অ-স্বচ্ছ) বিক্রি করা জায়েজ। খাটো, আঁটসাঁট, স্বচ্ছ বা অশ্লীল পোশাক বিক্রি করা জায়েজ নয়।
সুগন্ধি/পারফিউম বিক্রি: সুগন্ধি বিক্রি করা জায়েজ, কারণ এটি নিজে বৈধ পণ্য। ক্রেতার অপব্যবহারের দায়িত্ব বিক্রেতার ওপর বর্তাবে না, যতক্ষণ না বিক্রেতা নিশ্চিতভাবে জানেন যে ক্রেতা তা হারাম কাজে ব্যবহার করবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।