বই নতুন করে লেখার জন্য সম্মানি প্রাপ্তির বিধান।
Business and Job · Hanafi
Question
যদি সম্মানি পায় তাহলে সেই সম্মানি কিভাবে নির্ধারণ করা হবে?
Answer
বই নতুন করে লেখার জন্য সম্মানি প্রাপ্তির বিধান
প্রশ্ন: একটি প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কিছু বই স্কুলের টিচাররা লিখে থাকেন। যেই টিচার বই লিখেন তাকে পৃষ্ঠা সংখ্যা হিসাব করে একটি নির্দিষ্ট সম্মানি দেওয়া হয়। এখন একজন শিক্ষক কর্তৃক লিখিত বই যদি পরের বছর অন্য কোনো শিক্ষক দিয়ে ওই একই বই পুনরায় নতুন করে লিখানো হয় এবং ২য় এডিটেড ভার্সন বইতে লেখা থাকে। তাহলে কি তা ঠিক হবে এবং নতুন করে লিখানো শিক্ষক কোনো সম্মানি পাবে? যদি সম্মানি পায় তাহলে সেই সম্মানি কিভাবে নির্ধারণ করা হবে?
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على رسوله الكريم
১. নতুন করে বই লেখানো ও সম্মানি প্রাপ্তির বিধান
প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয়টি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে:
ক) বই লেখা একটি বৈধ পেশা ও উপার্জনের মাধ্যম:
বই লেখা, সংকলন করা এবং শিক্ষামূলক কাজে নিয়োজিত থাকা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ বৈধ এবং প্রশংসনীয় কাজ। কুরআন ও হাদীসে জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞান বিতরণের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আল্লাহ তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন যারা তোমাদের মধ্যে ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে।" (সূরা আল-মুজাদালা: ১১)
খ) নতুন শিক্ষক কর্তৃক বই পুনর্লিখন ও সম্মানি প্রাপ্তি:
যদি কোনো প্রতিষ্ঠান পূর্বের লেখা বইটি নতুন করে লেখানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং একজন নতুন শিক্ষক তা লিখেন, তাহলে:
১. নতুন শিক্ষকের সম্মানি প্রাপ্তি বৈধ: নতুন শিক্ষক যদি প্রকৃত অর্থেই বইটি নতুন করে লেখেন (পুনর্বিন্যাস, সংশোধন, সংযোজন ইত্যাদি সহ), তাহলে তিনি তার শ্রম ও পরিশ্রমের বিনিময়ে সম্মানি পাওয়ার সম্পূর্ণ অধিকারী। এটি একটি বৈধ চুক্তি (জু'আলাহ) হিসেবে গণ্য হবে।
২. পূর্বের লেখকের অধিকার: পূর্বের লেখক যদি বইটি লেখার জন্য সম্মানি পেয়ে থাকেন, তাহলে তার প্রাপ্য সম্মানি তাকে দেওয়া হয়েছে। নতুন সংস্করণে তার বইয়ের অংশ ব্যবহার করা হলে সেটি কপিরাইট বা বৌদ্ধিক সম্পত্তির অধিকারের প্রশ্ন। তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণে, যদি প্রতিষ্ঠান পূর্বের লেখকের সাথে কোনো চুক্তি না করে থাকে যে "বইটি শুধুমাত্র আপনার লেখা থাকবে" বা "আপনার অনুমতি ছাড়া কেউ এটি পরিবর্তন করতে পারবে না", তাহলে প্রতিষ্ঠান চাইলে অন্য কাউকে দিয়ে বইটি নতুন করে লেখাতে পারবে।
গ) ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নীতি:
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, কোনো কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা বৈধ, যদি কাজটি পরিষ্কার ও নির্দিষ্ট হয়। বই লেখা একটি নির্দিষ্ট কাজ, এবং এর জন্য সম্মানি নির্ধারণ করা জায়েয।
ঘ) ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:
"যদি কেউ কাউকে বলে, 'তুমি আমার জন্য এই বইটি লিখে দাও, আমি তোমাকে এত টাকা দেব', তাহলে তা বৈধ হবে এবং লেখক সম্মানি পাওয়ার অধিকারী হবে।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, কিতাবুল ইজারাহ)
২. সম্মানি নির্ধারণের নিয়ম
নতুন শিক্ষকের সম্মানি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত:
ক) কাজের পরিমাণ ও মান: নতুন শিক্ষক কতটুকু কাজ করেছেন, বইটি কতটুকু নতুন করে লিখেছেন (সম্পূর্ণ নতুন নাকি আংশিক সংশোধন) — এর ভিত্তিতে সম্মানি নির্ধারণ করা উচিত।
খ) পৃষ্ঠা সংখ্যা: প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী পৃষ্ঠা সংখ্যা হিসাব করে সম্মানি নির্ধারণ করা যেতে পারে, যেমনটি পূর্বের শিক্ষকের ক্ষেত্রে করা হয়।
গ) সময় ও শ্রম: কাজে ব্যয়কৃত সময় ও শ্রম বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
ঘ) চুক্তি: প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের মধ্যে স্পষ্ট চুক্তি থাকা উচিত যে, কত টাকা বা কীভাবে সম্মানি নির্ধারিত হবে।
ঙ) ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত:
তাঁদের মতে, কোনো কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নির্ধারণের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের সম্মতি এবং কাজের প্রকৃতি বিবেচনা করা জরুরি। কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পর ন্যায্য পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত।
৩. গুরুত্বপূর্ণ শর্তসমূহ
১. সততা ও আমানতদারিতা: নতুন শিক্ষককে বইটি লেখার সময় সততা ও আমানতদারিতা বজায় রাখতে হবে। পূর্বের লেখকের অবদান অস্বীকার করা যাবে না।
২. স্বচ্ছতা: প্রতিষ্ঠানকে নতুন শিক্ষকের সাথে চুক্তি করার সময় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে, এটি পূর্বের বইয়ের নতুন সংস্করণ এবং এতে পূর্বের লেখকের অবদানও রয়েছে।
৩. ন্যায্য মূল্য: সম্মানি নির্ধারণে ন্যায্যতা বজায় রাখতে হবে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, "কোনো কাজের বিনিময়ে ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করা wajib (আবশ্যক)।"
৪. কপিরাইট ও বৌদ্ধিক সম্পত্তির অধিকার
ইসলামী দৃষ্টিকোণে, কপিরাইট বা বৌদ্ধিক সম্পত্তির অধিকার একটি বৈধ অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"মুসলিমগণ তাদের শর্তসমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৯৪)
যদি পূর্বের লেখকের সাথে কোনো চুক্তি থাকে যে, বইটি তার অনুমতি ছাড়া পরিবর্তন বা পুনর্মুদ্রণ করা যাবে না, তাহলে সেই চুক্তি মান্য করা আবশ্যক। তবে যদি এমন কোনো চুক্তি না থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠান নতুন করে বই লেখাতে পারবে।
৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
১. নতুন শিক্ষক কর্তৃক বই পুনর্লিখন বৈধ এবং তিনি তার কাজের বিনিময়ে সম্মানি পাওয়ার অধিকারী।
২. সম্মানি নির্ধারণের নিয়ম: প্রতিষ্ঠানের পূর্বের নিয়ম (পৃষ্ঠা সংখ্যা অনুযায়ী) অনুসরণ করা যেতে পারে, অথবা কাজের পরিমাণ ও মান বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্য সম্মানি নির্ধারণ করা উচিত।
৩. পূর্বের লেখকের অধিকার: পূর্বের লেখকের অবদান স্বীকার করা এবং তার সম্মানি যথাযথভাবে পরিশোধ করা জরুরি। নতুন সংস্করণে পূর্বের লেখকের নাম উল্লেখ করা বা তার অনুমতি নেওয়া উত্তম।
৪. চুক্তির গুরুত্ব: প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের মধ্যে স্পষ্ট চুক্তি থাকা আবশ্যক, যাতে পরবর্তীতে কোনো বিরোধ না হয়।
والله أعلم بالصواب
উত্তর প্রদানে: (দেওবন্দি হানাফী মাযহাবের আলোকে)