শরিয়াহ অনুযায়ী চাকুরির সম্মানি প্রদান ঠিক আছে কী?
Business and Job · Hanafi
Question
প্রাক- প্রাথমিকে ২৮ জন, ১ম শ্রেণীতে ৩১ জন, ২য় শ্রেণীতে ১৮ জন, ৩য় শ্রেণীতে ১৬ জন, ৪র্থ শ্রেণীতে ১০ জন, ৫ম শ্রেণীতে ৯ জন শিক্ষার্থী আছে। প্রতিটা শ্রেণীর জন্য একজন নির্দিষ্ট গাইড টিচার আছেন। গাইড টিচারের কাজ হচ্ছে তার শ্রেণীর সকল শিক্ষার্থী সম্পর্কে আপডেট থাকা, সকল গার্ডিয়ানদেরকে এবং স্কুল অথোরিটিকে অথ্য আদান প্রদান করা, পরিক্ষার সময় সহায়তা করা। এখন সেইম কাজগুলো প্রতিটি গাইড টিচারকেই করতে হয়। গাইড টিচারদেরকে বছরে ২বার একটা সম্মানি দেওয়া হয়। কোনো শ্রেণীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম কোনোটাতে অনেক বেশি। যেই শিক্ষক কম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর গাইড টিচার হবেন তার কাজ কম হবে আর যেই শ্রেণীর শিক্ষার্থী বেশি সেই শ্রেণীর শিক্ষকের কাজ বেশি হবে। এখানে কোনো কোনো শিক্ষক দুইটি শ্রেণীর গাইড টিচারের দায়িত্বও পালন করেন।তাহলে কি এই সম্মানিটা শ্রেণী হিসেবে দেয়া ঠিক নাকি শিক্ষার্থীর সংখ্যা হিসেবে দেয়া ঠিক। এক্ষেত্রে আমাদের শরিয়াহ বা ইসলাম কি বলে কোনটি উত্তম হবে?
Answer
শারয়ী দৃষ্টিতে গাইড টিচারের সম্মানি প্রদানের নিয়ম
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে বলে রাখি, ইসলামী শরিয়াহর দৃষ্টিতে ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মূলনীতি
ইসলামী শরিয়াহতে কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নির্ধারণের মূলনীতি হলো—কাজের পরিমাণ ও মান অনুযায়ী পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা। কাজ কম হলে পারিশ্রমিক কম, কাজ বেশি হলে পারিশ্রমিক বেশি হওয়া উচিত। এটি ন্যায়বিচারের মূলনীতি।
বিশ্লেষণ
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতিটি গাইড টিচারের মূল দায়িত্বগুলো হলো:
- নিজ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে আপডেট থাকা
- অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ রাখা
- স্কুল কর্তৃপক্ষকে তথ্য প্রদান করা
- পরীক্ষার সময় সহায়তা করা
এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ:
- যে শিক্ষকের শ্রেণীতে ৩১ জন শিক্ষার্থী, তার কাজের পরিমাণ স্পষ্টতই বেশি
- যে শিক্ষকের শ্রেণীতে ৯ জন শিক্ষার্থী, তার কাজ তুলনামূলকভাবে কম
ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (আল-হাকিমিয়্যাহ) এবং ফাতাওয়া আলমগীরি-তে উল্লেখ আছে যে, কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নির্ধারণের ক্ষেত্রে কাজের পরিমাণ ও কষ্টের তারতম্য বিবেচনা করা জরুরি।
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর নীতি হলো, কোনো কাজের বিনিময় নির্ধারণে ন্যায়সংগত মূল্য (উজরাতুল মিসল) বিবেচনা করা উচিত, যা কাজের প্রকৃতি, পরিমাণ এবং সময়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
উত্তম পদ্ধতি
আপনার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী সম্মানি নির্ধারণ করা অধিক ন্যায়সংগত ও শরিয়তসম্মত হবে। কারণ:
১. ন্যায়বিচার: যার কাজ বেশি, সে বেশি পাবে—এটাই ইনসাফের মূলনীতি। ২. কাজের পরিমাণ: শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি মানে কাজের পরিমাণ বেশি। ৩. প্রেরণা: এতে শিক্ষকরা আরও আন্তরিকভাবে কাজ করতে উৎসাহিত হবেন।
তবে, যদি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ চায় যে, শ্রেণীভিত্তিক সম্মানি দিতে হবে, তাহলে সেক্ষেত্রে দুইটি শ্রেণীর দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষককে অতিরিক্ত সম্মানি দেওয়া জরুরি, কারণ তিনি দ্বিগুণ কাজ করছেন।
প্রস্তাবনা
একটি ন্যায়সংগত পদ্ধতি হতে পারে:
- প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি নির্দিষ্ট হারে সম্মানি নির্ধারণ করা (যেমন: প্রতি শিক্ষার্থী ৫০-১০০ টাকা)
- এর সাথে একটি নির্দিষ্ট ভিত্তি বেতন যোগ করা
এতে করে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি হলে সম্মানি বেশি হবে, কম হলে কম হবে—এটাই ন্যায়বিচার।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেন আমানতসমূহ তার প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দিতে এবং যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা কর, তখন ন্যায়বিচার করার জন্য।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
সারকথা: শরিয়তের দৃষ্টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী সম্মানি নির্ধারণ করাই উত্তম এবং ন্যায়সংগত। তবে প্রতিষ্ঠানের সুবিধার্থে যদি শ্রেণীভিত্তিক সম্মানি দেওয়াই হয়, তাহলে দুইটি শ্রেণীর দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষককে অতিরিক্ত সম্মানি দেওয়া আবশ্যক।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।