মা-বোনের প্ররোচনায় তালাক দিলে কি তালাক হবে? এবং স্বামীর কি গোনাহ হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। ইসলামি শরিয়তে তালাকের বিধান হলো, তালাক একটি বৈধ কিন্তু অত্যন্ত অপছন্দনীয় (মাকরুহ) কাজ। তবে তালাকের বৈধতা বা সংঘটিত হওয়া নির্ভর করে স্বামীর ইচ্ছা ও উচ্চারিত শব্দের ওপর, অন্য কারো প্ররোচনার ওপর নয়।
আপনার প্রশ্ন দুটি অংশে বিভক্ত। নিচে প্রতিটি অংশের বিস্তারিত জবাব দেওয়া হলো:
১. মা-বোনের প্ররোচনায় তালাক দিলে শরিয়তের বিচার কী?
যদি কোনো স্বামী তার মা-বোনের প্ররোচনা বা চাপে (অন্যায়ভাবে) স্ত্রীকে তালাক দেয়, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি একটি মারাত্মক অন্যায় ও গুনাহের কাজ। কারণ:
- পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: "তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের উপর অধিকার রাখে এবং তোমাদেরও তাদের উপর অধিকার রয়েছে।" (সূরা বাকারা: ২২৮)
- হাদিসে এসেছে: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, "আল্লাহর নিকট বৈধ কাজগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা ঘৃণিত কাজ হলো তালাক।" (আবু দাউদ: ২১৭৮; ইবনে মাজাহ: ২০১৮)
তবে শরিয়তের বিধান হলো: তালাক যদি স্বামী নিজে ইচ্ছা করে, জ্ঞানবতী অবস্থায় এবং স্পষ্ট শব্দে উচ্চারণ করে, তাহলে তা সংঘটিত হয়ে যাবে। মা-বোনের প্ররোচনা বা চাপ তালাককে অকার্যকর করবে না। অর্থাৎ, তালাক পড়ে গেলে তা কার্যকর হয়ে যাবে, তবে স্বামী গুনাহগার হবে। কারণ সে অন্যায়ভাবে স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে এবং স্ত্রীর হক নষ্ট করেছে।
হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব "রদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ আছে:
"তালাকের ক্ষেত্রে স্বামীর ইচ্ছা (নিয়্যত) শর্ত নয়, বরং উচ্চারিত শব্দই মূল বিষয়। যদি স্বামী জ্ঞানবতী অবস্থায় স্পষ্ট শব্দে তালাক উচ্চারণ করে, তবে তা সংঘটিত হয়ে যায়, যদিও সে রাগান্বিত বা বাধ্য হয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৮৭)
তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম: যদি স্বামীকে এমনভাবে হুমকি দেওয়া হয় যে, প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে, তাহলে জবরদস্তিমূলক তালাক (তালাকে মুক্রাহ) সংঘটিত হবে না। কিন্তু সাধারণ প্ররোচনা বা চাপে দেওয়া তালাক সংঘটিত হয়ে যায়।
২. স্ত্রীকে সরাসরি না বলে এডভোকেটের মাধ্যমে মৌখিক তালাকের কাগজ লেখা হলে তালাক সংঘটিত হবে কি?
আপনার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, স্বামী স্ত্রীকে সরাসরি তালাক বলেনি, তবে লোকমুখে শুনেছেন যে, স্বামী মৌখিক তালাকের কাগজ এডভোকেটের হাতে লিখে দিয়েছে, যা স্ত্রী দেখেনি।
শরিয়তের বিধান হলো:
১. তালাকের কাগজ লেখা বা এডভোকেটকে দেওয়া: যদি স্বামী নিজে ইচ্ছা করে, জ্ঞানবতী অবস্থায় কোনো এডভোকেট বা উকিলকে লিখে দেয় যে, "আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিলাম" অথবা "আমার স্ত্রীর তালাকের কাগজ তৈরি করো", তাহলে এই লেখা বা নির্দেশের মাধ্যমে তালাক সংঘটিত হয়ে যাবে। কারণ, ইসলামি ফিকহে লিখিত তালাক (তালাকে তহরিরি) বৈধ এবং তা মৌখিক তালাকের মতোই কার্যকর।
- হানাফি ফিকহে উল্লেখ আছে: "যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার জন্য লিখিতভাবে ঘোষণা করে, তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে, যদি তার নিয়ত তালাক দেওয়ার থাকে।" (ফাতাওয়া আলমগীরি, ১/৩৭৩)
২. স্ত্রী না দেখলে বা না জানলে: স্ত্রী কাগজটি দেখেছে কি না, তা তালাক সংঘটিত হওয়ার শর্ত নয়। তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য শুধু স্বামীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট ঘোষণা বা ইচ্ছা প্রকাশই যথেষ্ট। স্ত্রীর জানা বা না জানা তালাকের বৈধতাকে প্রভাবিত করে না।
৩. লোকমুখে শোনা: আপনি শুধু লোকমুখে শুনেছেন, কিন্তু নিশ্চিত নন যে স্বামী সত্যিই তালাক দিয়েছে কি না। এই অবস্থায় তালাক সংঘটিত হয়েছে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। কারণ, তালাক একটি গুরুতর বিষয়। যতক্ষণ না আপনি নিশ্চিত হচ্ছেন যে, স্বামী নিজে ইচ্ছা করে তালাক দিয়েছে বা তালাকের কাগজে তার নিজ হাতে স্বাক্ষর/ঘোষণা আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তালাক সংঘটিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
- ফিকহের নীতি হলো: "ইয়াকীন সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না" (اليقين لا يزول بالشك)। অর্থাৎ, যতক্ষণ নিশ্চিত না হওয়া যায়, ততক্ষণ মূল অবস্থা (বিবাহ বহাল থাকা) বজায় থাকবে।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া:
- প্রথম অংশ: মা-বোনের প্ররোচনায় তালাক দিলে তা গুনাহের কাজ, তবে তালাক সংঘটিত হয়ে যাবে যদি স্বামী জ্ঞানবতী অবস্থায় স্পষ্টভাবে তালাক দেয়।
- দ্বিতীয় অংশ: স্বামী যদি এডভোকেটকে লিখিতভাবে তালাক দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে থাকে, তাহলে তালাক সংঘটিত হয়ে গেছে। কিন্তু যেহেতু আপনি শুধু লোকমুখে শুনেছেন এবং নিশ্চিত নন, তাই তালাক সংঘটিত হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। আপনাকে অবশ্যই স্বামীর কাছ থেকে সরাসরি জেনে নিতে হবে অথবা তালাকের কাগজটি দেখে নিশ্চিত হতে হবে।
আপনার করণীয়: বিষয়টি গুরুতর। আপনি স্বামীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে জিজ্ঞেস করুন, তিনি সত্যিই তালাক দিয়েছেন কি না। যদি তিনি নিশ্চিতভাবে বলেন যে, তিনি তালাক দিয়েছেন, তাহলে তালাক সংঘটিত হয়েছে। আর যদি তিনি অস্বীকার করেন, তাহলে লোকমুখের কথা ভিত্তি করে তালাক সংঘটিত বলে গণ্য হবে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনি জ্ঞান দান করুন এবং পরিবারগুলোকে শান্তিতে রাখুন। (আমিন)