একাধিক বউয়ের মধ্যে ইনসাফ কেমনে করতে হয় এবং তাদের হক সম্পর্কে ইলম অর্জন করতে চাই৷
Family Life · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব।
আমার নিয়ত আছে আল্লাহ আমাকে সামর্থ দিলে ইনশাআল্লাহ আমি মাসনা করবো।
এর পুর্বে আমি একাধিক বউয়ের মধ্যে ইনসাফ কেমনে করতে হয় এবং তাদের হক সম্পর্কে ইলম অর্জন করতে চাই৷
আমাকে যদি দয়া করে একটা কমপ্লিট রোড ম্যাপ বা গাইডলাইন দিতে তাহলে খুবই ভালো হতো।
যদি কোনো কিতাব (সেটা হতে পারে আরবি বা বাংলা) পড়ার পরামর্শ দেন তাও অনেক উপকার হবে ইনশাআল্লাহ।
الله خيرا كثيرا
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই,
আল্লাহ তা'আলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। একাধিক বিবাহের নিয়ত করা এবং তার পূর্বে ইনসাফ সম্পর্কে ইলম অর্জনের আগ্রহ দেখে আমরা খুবই আনন্দিত। এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন এবং আপনার নেক নিয়তকে কবুল করুন। আমিন।
আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমরা কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে একটি বিস্তারিত রোডম্যাপ প্রদান করছি:
১. ইনসাফের ভিত্তি: কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা
একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ইনসাফ করা প্রত্যেক স্বামীর উপর ওয়াজিব (অত্যাবশ্যক)। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً "তোমাদের নিকৃষ্ট না হলে নারীদের মধ্যে থেকে দুই, তিন বা চারজনকে বিবাহ করো। কিন্তু যদি ভয় করো যে, তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনকেই বিবাহ করো।" (সূরা আন-নিসা: ৩)
এই আয়াতের নির্দেশনা হলো, ইনসাফের ভয় থাকলে একাধিক বিবাহ করা উচিত নয়। তবে ইনসাফের ব্যাপারে নিশ্চিত হলে একাধিক বিবাহ জায়েয।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَشِقُّهُ مَائِلٌ "যে ব্যক্তির দুটি স্ত্রী আছে এবং সে তাদের মধ্যে একজনের দিকে ঝুঁকে গেল (অন্যায়ভাবে), তবে কিয়ামতের দিন সে এমন অবস্থায় আসবে যে, তার এক পাশ ঝুঁকে থাকবে।" (আবু দাউদ: ২১৩৩, তিরমিজি: ১১৪১, ইবনে মাজাহ: ১৯৬৯)
২. ইনসাফের পরিধি: কোন কোন বিষয়ে ইনসাফ করতে হবে?
হানাফি ফিকহের আলোকে ইনসাফের পরিধি নিম্নরূপ:
ক. যেসব বিষয়ে ইনসাফ করা ওয়াজিব (অত্যাবশ্যক):
- রাত্রি বণ্টন (Qasam): প্রত্যেক স্ত্রীর সাথে সমান রাত্রি যাপন করা। এটি স্বামীর উপর অত্যাবশ্যক। (রদ্দুল মুহতার: ৩/২০৩)
- ভরণপোষণ (Nafaqah): খাদ্য, বস্ত্র, থাকার স্থান এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসে সমতা রক্ষা করা। (ফাতাওয়া আলমগীরি: ১/৩৪৩)
- সঙ্গ ও সহবাসে সমতা: শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সমান অধিকার রয়েছে। তবে অসুস্থতা বা অপারগতার কারণে কাউকে বাদ দিলে গুনাহ হবে না, তবে পরে কাযা করতে হবে। (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৪০৫)
খ. যেসব বিষয়ে ইনসাফ করা ওয়াজিব নয়:
- ভালোবাসা ও মনের আকর্ষণ: অন্তরের ভালোবাসা মানুষের ইচ্ছাধীন নয়। এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই মনের ভালোবাসায় অসমতা থাকলে গুনাহ হবে না। তবে এর কারণে কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। (রদ্দুল মুহতার: ৩/২০৩)
- সহবাসের মান: শারীরিক সম্পর্কের মান বা তৃপ্তি সমান করা সম্ভব নয়, তাই সেটা ওয়াজিব নয়। তবে নিয়মিত সহবাসের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ দিতে হবে।
- অর্থ উপার্জন বা সম্পদ: স্ত্রীদেরকে সমান পরিমাণ অর্থ দেওয়া ওয়াজিব নয়, তবে ভরণপোষণের ক্ষেত্রে সমতা রাখতে হবে।
৩. ইনসাফের বিস্তারিত নিয়ম (হানাফি ফিকহের আলোকে)
ক. রাত্রি বণ্টনের নিয়ম:
- নতুন বিবাহ করলে নতুন স্ত্রীকে টানা ৭ রাত (যদি সে কুমারী হয়) বা ৩ রাত (যদি সে বিধবা/তালাকপ্রাপ্তা হয়) একচেটিয়া দেওয়া সুন্নত। এরপর থেকে সমান বণ্টন শুরু হবে। (ফাতাওয়া আলমগীরি: ১/৩৪৩)
- বণ্টনের সময় প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য আলাদা রাত নির্ধারণ করা এবং সেই অনুযায়ী পালা করা।
- সফরে গেলে স্ত্রীদের মধ্যে লটারি করা এবং যার পালা তাকে সাথে নেওয়া। (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৪০৬)
- অসুস্থ অবস্থায় স্ত্রীদের মধ্যে সমান বণ্টন করা ওয়াজিব নয়, তবে সুস্থ হলে কাযা করতে হবে।
খ. ভরণপোষণের নিয়ম:
- প্রত্যেক স্ত্রীকে তার সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী খাদ্য, বস্ত্র এবং থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
- একজন্যের জন্য যে মানের খাবার ও পোশাক কেনা হয়, অন্যজনের জন্যেও সেই মানের ব্যবস্থা করতে হবে।
- থাকার জন্য আলাদা ঘর বা ব্যবস্থা প্রত্যেককে দিতে হবে। (ফাতাওয়া আলমগীরি: ১/৩৪৩)
গ. ইনসাফ ভঙ্গের শাস্তি:
- ইচ্ছাকৃতভাবে ইনসাফ না করা কবিরা গুনাহ। কিয়ামতের দিন এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
- তবে স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় তার প্রাপ্য রাত বা অধিকার ছেড়ে দেয়, তাহলে স্বামী গুনাহগার হবে না। (রদ্দুল মুহতার: ৩/২০৩)
৪. ইনসাফের চ্যালেঞ্জ ও সতর্কতা
- মনের প্রবণতা: মনে রাখবেন, ইনসাফের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মনের প্রবণতা। আল্লাহ তা'আলা বলেন: "তোমরা স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে চাইলেও কখনোই পারবে না (মনের ভালোবাসায়)। তবে তোমরা সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়ো না (একজনের দিকে) যে, অন্যজনকে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে দাও।" (সূরা আন-নিসা: ১২৯)
- সামর্থ্য যাচাই: একাধিক বিবাহের আগে অবশ্যই আর্থিক, শারীরিক এবং মানসিক সামর্থ্য যাচাই করা জরুরি। ইনসাফ করতে না পারার ভয় থাকলে একাধিক বিবাহ না করাই উত্তম।
- পরিবারের সম্মতি: স্ত্রী এবং পরিবারের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উত্তম।
৫. প্রস্তাবিত কিতাব (বই) সমূহ
আপনার জ্ঞান অর্জনের জন্য নিম্নোক্ত কিতাবগুলো অত্যন্ত উপকারী:
বাংলা কিতাব:
- বেহেশতি জেওর (১ম-৩য় খণ্ড) – মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)। এতে বিবাহ, স্ত্রীর অধিকার, ইনসাফ ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
- মা'আরিফুল কুরআন – মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.)। সূরা আন-নিসার তাফসিরে ইনসাফের বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাবেন।
- আল-হিদায়া (বাংলা অনুবাদ) – হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য কিতাব। বিবাহ অধ্যায়ে স্ত্রীদের অধিকার ও ইনসাফের বিস্তারিত নিয়ম রয়েছে।
- ফাতাওয়া উসমানি (বাংলা অনুবাদ) – মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানি। এতে আধুনিক যুগের সমস্যা ও ইনসাফ সম্পর্কিত ফতোয়া পাবেন।
আরবি কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (আল-দুররুল মুখতার) – আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.)। এটি হানাফি ফিকহের সবচেয়ে প্রামাণ্য কিতাব। বিবাহ অধ্যায়ে ইনসাফের বিস্তারিত মাসআলা রয়েছে।
- ফাতাওয়া আলমগীরি (আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ) – এটি হানাফি ফিকহের বিখ্যাত কিতাব। এতে স্ত্রীদের অধিকার ও ইনসাফের নিয়মাবলী বিস্তারিত বর্ণিত আছে।
- শরহু মা'আনিল আসার – ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবী (রহ.)। এতে ইনসাফ সম্পর্কিত হাদিস ও আসারগুলোর ব্যাখ্যা রয়েছে।
৬. ইনসাফের জন্য ব্যবহারিক গাইডলাইন (রোডম্যাপ)
- নিয়ত সংশোধন করুন: একাধিক বিবাহের নিয়ত শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করুন, প্রবৃত্তির তৃপ্তির জন্য নয়।
- ইলম অর্জন করুন: উপরে উল্লেখিত কিতাবগুলো অধ্যবসায়ের সাথে পড়ুন।
- আর্থিক সামর্থ্য যাচাই করুন: প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য আলাদা বাসস্থান, খরচ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয়তা পূরণের সামর্থ্য আছে কিনা নিশ্চিত হোন।
- শারীরিক সামর্থ্য যাচাই করুন: প্রত্যেক স্ত্রীর সাথে সমান সময় কাটানো এবং তাদের শারীরিক চাহিদা পূরণের সক্ষমতা আছে কিনা যাচাই করুন।
- মানসিক প্রস্তুতি নিন: ইনসাফের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন। ধৈর্য ও সহনশীলতা অর্জন করুন।
- আলেমের পরামর্শ নিন: একাধিক বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোনো বিশ্বস্ত আলেমের সাথে পরামর্শ করুন।
- স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার করুন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীদের সাথে সর্বোত্তম আচরণ করে।" (তিরমিজি: ১১৬২)
- দোয়া করুন: আল্লাহর কাছে ইনসাফ করার তাওফিক চেয়ে দোয়া করুন। নিয়মিত ইস্তিগফার করুন।
উপসংহার
একাধিক বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এটি সহজ নয়, বরং অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। তবে সঠিক ইলম, আন্তরিক নিয়ত এবং আল্লাহর সাহায্যে ইনসাফ করা সম্ভব। আপনার এই ইলম অর্জনের আগ্রহ প্রশংসনীয়। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ইনসাফ করার তাওফিক দিন এবং আপনার পারিবারিক জীবনকে বরকতময় করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب (আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞান)