মেয়ে চাকরি করতে চান না.. এবং মেয়ের উপর বাবা-মায়ের দায়িত্ব।

Family Life · Hanafi

Question No: 3406
Questioner: Habiba Sultana
Question Asked: 02 Aug 2026, 07:34 AM
Reviewed & Published: 02 Aug 2026, 09:27 AM
Views: 9
Tokens: 4,269
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللّٰـهِ وَبَرَكاتُهُ‎
উস্তাজ, আমি একজন মেয়ে।
আমার ভাই নাই, আমার বাবা না থাকলে বা উপার্জনে অক্ষম হয়ে গেলে আমার উপর পরিবারের ভরন পোষনের দায়িত্ব আসে কি..?

আমার উপর কি আমার বাবা মার দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে শরীয়াহ কোনো বাধ্যবাধকতা রাখছে?
বা আমাকে আমার পরিবারের প্রতি কতটুকু দেখাশোনার দায়দায়িত্ব দিছে?

বা যদি দায়িত্ব আসে তাহলে কি উপায়ে করতে বলে ইসলাম??

আর উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ঘর সংসারী হতে চাওয়া (বিশেষ করে ভাই নাই যেহেতু ) কি অপরাধ, আমানবিকতা ও দায়িত্বহীনতা???

Answer

وعلیکم السلام ورحمة الله وبرکاته

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। ইসলামের দৃষ্টিতে একজন নারীর উপর পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব কতটুকু এবং সে বিষয়ে শরীয়াহ কী নির্দেশ দিয়েছে, তা নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

১. নারীর উপর পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব

ইসলামের মৌলিক নীতি অনুযায়ী, পরিবারের ভরণপোষণের (খোরপোষ) মূল দায়িত্ব স্বামীর অথবা পুরুষ অভিভাবকের (যেমন: পিতা, ভাই, চাচা) উপর। একজন নারীর উপর তার পিতা-মাতা বা ভাই-বোনের ভরণপোষণের দায়িত্ব শরীয়তের বিধান অনুযায়ী আবশ্যক (ওয়াজিব) নয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত সে নিজে সচ্ছল না হয় এবং তার নিকটাত্মীয়রা অভাবগ্রস্ত না হয়।

  • কুরআনের নির্দেশনা: আল্লাহ তাআলা বলেন, "পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল, কারণ আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং কারণ তারা নিজেদের মাল থেকে খরচ করে।" (সূরা আন-নিসা: ৩৪)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, খরচ করার মূল দায়িত্ব পুরুষের।

  • হাদিসের নির্দেশনা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "প্রত্যেকটি দায়িত্বশীল ব্যক্তি তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।" (সহিহ বুখারি: ৮৯৩)। তবে এখানে "দায়িত্বশীল" বলতে মূলত সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যার উপর শরীয়ত দায়িত্ব অর্পণ করেছে, যেমন স্বামী তার স্ত্রীর, পিতা তার সন্তানের।

  • হানাফি ফিকহের মত: হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়াহ এবং রদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, নারীর উপর তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ ওয়াজিব নয়, যদি না সে নিজে সম্পদশালী হয় এবং তার পিতা-মাতা অত্যন্ত অভাবগ্রস্ত হয়। তবে সেক্ষেত্রেও এটি "ওয়াজিব" হওয়ার চেয়ে "নেকির কাজ" হিসেবে গণ্য হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৬০৪)

২. পিতা-মাতার দায়িত্ব নেওয়া

আপনার পিতা-মাতার সেবা করা এবং তাদের দেখাশোনা করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপনাকে চাকরি করে তাদের ভরণপোষণ করতেই হবে। শরীয়তের দৃষ্টিতে:

  • পিতার দায়িত্ব: আপনার পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় এবং তিনি উপার্জনে সক্ষম থাকা অবস্থায় আপনার উপর তার ভরণপোষণের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং আপনার পিতার উপর আপনার (সন্তানের) খরচের দায়িত্ব রয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি অবিবাহিত এবং নিজে উপার্জনক্ষম নন।

  • পিতার অক্ষমতা: যদি আপনার পিতা উপার্জনে অক্ষম হন এবং আপনার ভাই না থাকে, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার উপর পিতা-মাতার ভরণপোষণ ওয়াজিব (আবশ্যক) হবে না, তবে এটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। আপনি যদি সচ্ছল হন এবং চান, তাহলে তাদের সাহায্য করা আপনার জন্য অত্যন্ত পুণ্যের কাজ হবে। কিন্তু ইসলাম আপনাকে জোর করে চাকরি করতে বাধ্য করেনি।

৩. চাকরি করার উপায়

যদি আপনি নিজে থেকে পিতা-মাতার দায়িত্ব নিতে চান এবং চাকরি করার প্রয়োজন হয়, তাহলে ইসলাম আপনাকে অনুমতি দেয়, তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে:

  • পর্দার শর্ত: ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী নারীর জন্য চাকরি করা জায়েয, তবে তা অবশ্যই পর্দার (হিজাব) নিয়ম মেনে, বৈধ পেশায় এবং এমন পরিবেশে হতে হবে যেখানে পুরুষদের সাথে অবৈধ মেলামেশা না থাকে। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৩৫)

  • বৈধ পেশা: চাকরিটি অবশ্যই বৈধ হতে হবে। এমন কোনো কাজে যুক্ত হওয়া যাবে না যা ইসলামি বিধান লঙ্ঘন করে।

  • পরিবারের অনুমতি: পিতা-মাতার অনুমতি নিয়ে এবং তাদের সন্তুষ্টি রেখে চাকরি করা উত্তম।

৪. উচ্চশিক্ষিত হয়ে ঘর সংসারী হওয়া

আপনি উচ্চশিক্ষিত হয়ে ঘর সংসারী হতে চান, এটি কোনো অপরাধ বা দায়িত্বহীনতা নয়। বরং ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত। কারণ:

  • নারীর মূল দায়িত্ব: ইসলামি সমাজে নারীর প্রধান দায়িত্ব হলো ঘর সংসার পরিচালনা করা এবং সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা। এটি একটি মহান ইবাদত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নারী তার স্বামীর ঘরের দায়িত্বশীল এবং তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।" (সহিহ বুখারি: ৮৯৩)

  • উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব: উচ্চশিক্ষা অর্জন করা নারীর জন্য জায়েয এবং উত্তম, তবে তা যদি ঘর সংসারের প্রতি দায়িত্বশীলতা বজায় রেখে হয়। আপনি শিক্ষিত হয়ে ঘর সংসারী হলে তা আপনার সন্তানদের শিক্ষাদানে সহায়ক হবে এবং আপনি সমাজে আলোকিত মা হিসেবে পরিচিত হবেন।

  • দায়িত্বহীনতা নয়: ঘর সংসারী হওয়া কোনো দায়িত্বহীনতা নয়। বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্ব। আপনি যদি চাকরি না করে ঘর সংসার করেন, তাহলে আপনি ইসলামের নির্দেশিত পথেই আছেন।

৫. আপনার করণীয়

১. পিতা-মাতার সেবা করুন: আপনি চাকরি না করলেও পিতা-মাতার সেবা করা, তাদের খোঁজখবর নেওয়া এবং তাদের সময় দেওয়া আপনার নৈতিক দায়িত্ব। এটি আপনার জন্য সওয়াবের কাজ।

২. দোয়া করুন: পিতা-মাতার জন্য দোয়া করা এবং তাদের সুস্থতা কামনা করা আপনার কর্তব্য।

৩. স্বামীর সাথে আলোচনা: ভবিষ্যতে বিবাহের পর আপনার স্বামীকে পিতা-মাতার বিষয়ে জানিয়ে রাখুন এবং তাদের দেখাশোনার জন্য সময় দেওয়ার চেষ্টা করুন।

৪. চাকরির প্রয়োজন হলে: যদি সত্যিই আর্থিক সংকট থাকে এবং আপনি চাকরি করতে চান, তাহলে পর্দার নিয়ম মেনে বৈধ পেশায় কাজ করুন। তবে মনে রাখবেন, এটি আপনার উপর ওয়াজিব নয়, বরং এটি একটি ঐচ্ছিক কাজ।

উপসংহার

ইসলাম আপনার উপর পিতা-মাতার ভরণপোষণের জন্য চাকরি করার কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করেনি। আপনার পিতা জীবিত থাকলে তার উপরই আপনার খরচের দায়িত্ব। তবে পিতা অক্ষম হলে আপনি যদি সাহায্য করেন, তা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। উচ্চশিক্ষিত হয়ে ঘর সংসারী হওয়া কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি ইসলামি নারীর আদর্শ। আল্লাহ আপনাকে উত্তম বুঝ দান করুন এবং আপনার পরিবারকে হেফাজত করুন। আমিন।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.