গানবাজনা, বেপর্দা পরিবেশ পরিবেশনার বিয়েতে গর্ভাবস্থায় যাওয়া কি উচিত

Family Life · Hanafi

Question No: 3401
Questioner: IOM
Question Asked: 02 Aug 2026, 12:04 AM
Reviewed & Published: 02 Aug 2026, 12:53 AM
Views: 16
Tokens: 8,253
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
মুহতারাম বিবাহিত জীবনে কাছের আত্মীয়দের দুইটি দ্বীন পালন হয়নি এমন বিয়েতে গিয়েছিলাম। কোনটাতেই শরীয়ত বিরোধী কাজগুলোর বিরুদ্ধে কিছু পদক্ষেপ নেইনি, একটা কথাও বলিনি। মানে সেখানে কোন দাওয়াতি কাজ করিনি অথচ যাই আমাদের লেবাস দেখে অন্তত দাওয়াত পৌঁছে যাবে এই নিয়তে! গান বাজনা, বেপর্দা,ফ্রি মিক্সিং ছিল। এখন প্রেগন্যান্ট অবস্থায় এরকম দাওয়াতে শুধু খেয়ে চলে আসাটাও কি ঠিক হবে? গানবাজনা কি মায়ের এ অবস্থায় প্রভাব ফেলবে? আর নজরের হেফাজত, কানের হেফাজত করা হয়ে উঠে না বিশেষ করে অন্তরের অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে যায়। আর বান্দাদের প্রতি সুধারনার বদলে অতিরিক্ত বিরক্তি, ক্ষোভ ও কুধারনা তৈরি হয় যা সবচেয়ে ক্ষতি করে আমার নিজেরই। কোনভাবেই অন্তরকে বিদ্বেষ মুক্ত রাখা সম্ভব হয়না আস্তে আস্তে অবশ্য স্বাভাবিক হয়ে যাই। আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু এগুলো দীর্ঘমেয়াদি আমার দাম্পত্য জীবনেও প্রভাব ফেলছে।
আর স্বামী যদি রাগ করে বা আদেশ দেন যাওয়ার জন্য তাহলে এ অবস্থায় কি করব?

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। গর্ভাবস্থায় শরীয়তবিরোধী পরিবেশে দাওয়াতে যাওয়া, সন্তানের উপর প্রভাব এবং স্বামীর আদেশ পালন—এই তিনটি বিষয়ে আপনার উদ্বেগ সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত। আপনি যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই কঠিন। আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন। আমিন।

১. শরীয়তবিরোধী পরিবেশে দাওয়াতে যাওয়া ও খাওয়ার হুকুম

গান-বাজনা, বেপর্দা ও ফ্রি-মিক্সিং—এই তিনটিই ইসলামে স্পষ্ট হারাম। কুরআন ও হাদিসে এগুলোর ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

  • গান-বাজনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:
    "আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অবান্তর কথাবার্তা ক্রয় করে, যাতে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে।" (সূরা লুকমান: ৬)
    তাফসিরবিদরা বলেন, এখানে "লাহওয়াল হাদিস" অর্থ গান-বাজনা। (মা'আরিফুল কুরআন, ৮ম খণ্ড)

  • বেপর্দা প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
    "আর গায়রে মাহরামদের সামনে যেন তারা নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।" (সূরা আন-নূর: ৩১)

  • ফ্রি-মিক্সিং প্রসঙ্গে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
    "আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর আর কিছু রেখে যাইনি।" (সহিহ বুখারি: ৫০৯৬)

সুতরাং, যেখানে এসব হারাম কাজ চলছে, সেখানে উপস্থিত থাকা নিজেই সমস্যাযুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন এমন মজলিসে বসে না যেখানে গান-বাজনা চলে।" (আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি; হাকিম)

তবে আপনি যদি এমন দাওয়াতে যান (অগত্যা/বাধ্য হয়ে), তাহলে কিছু শর্ত মেনে চলা জরুরি:

  • শুধু খাওয়ার জন্য বসবেন, হারাম কাজে অংশ নেবেন না। খাবার হালাল হলে খাওয়া জায়েয আছে—তবে যাওয়ার চেয়ে না যাওয়াই উত্তম।
  • গান-বাজনা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করুন, দৃষ্টি নিচু রাখুন।
  • গর্ভাবস্থায় এই নিয়ম আরও কঠোর—কারণ আপনার শরীর ও মনে সন্তান লালিত হয়। তাই নিজের ও সন্তানের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে যদি সম্ভব হয়, সরাসরি খেয়ে চলে আসা।

ইমাম আযম আবু হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: গান শোনা ফাস্কর (গুনাহের কাজ), আর যে ব্যক্তি গান শুনতে আসে, তাকে দাওয়াত দেওয়া ঠিক নয়। (রদ্দুল মুহতার: ৬/৩৫৬)

২. গান-বাজনার গর্ভাবস্থায় সন্তানের উপর প্রভাব

জ্বী, গান-বাজনার প্রভাব গর্ভস্থ সন্তানের উপর পড়তে পারে। কারণ:

  • হাদিসে এসেছে: "গান-বাজনা হল জিনার (ব্যভিচারের) পথ।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯২২; তিরমিজি: ৩৭৮৭)
    ঘরে গান-বাজনা চললে শয়তানের প্রভাব বাড়ে, রহমত কমে যায়। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০২০)

  • গর্ভবতী মায়ের মানসিক অবস্থা, আধ্যাত্মিক পরিবেশ এবং চারপাশের আবহ সন্তানের উপর শারীরিক ও মানসিক প্রভাব ফেলে। হাদিসে মায়ের খাদ্য, পানীয় এবং অবস্থা সন্তানকে প্রভাবিত করার কথা এসেছে (সহিহ মুসলিম: ২৬৪৩)। তাই গান-বাজনার মতো হারাম ও গাফলতিপূর্ণ পরিবেশ সন্তানের আত্মিক অবস্থাকে প্রভাবিত করা অস্বাভাবিক নয়।

তবে আল্লাহর রহমতে ভয় না করে দোয়া করুন। সন্তান যদি আল্লাহর নেক বান্দা হয়, তবে সে হেফাজতেও থাকে। আপনি তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে এমন জায়গা থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয়ই আমার রব গুনাহ মাফকারী ও অত্যন্ত দয়ালু।" (সূরা ইউসুফ: ৯৮)

৩. স্বামী রাগ করে বা আদেশ করলে কী করবেন?

স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য ইসলামে ওয়াজিব, কিন্তু গুনাহের কাজে আনুগত্য জায়েয নয়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
"সৃষ্টিকর্তার নাফরমানিতে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (সহিহ বুখারি: ৬৮৩৯; সহিহ মুসলিম: ১৮৩৯)

অর্থাৎ, যদি আপনার স্বামী আপনাকে এমন দাওয়াতে যেতে বলেন যেখানে গান-বাজনা ও বেপর্দা চলবে, তাহলে সেটা পালন করা জায়েয হবে না। তবে আপনার করণীয় হলো:

  • অত্যন্ত নম্রভাবে ও ভালোবাসা দিয়ে বুঝিয়ে বলুন। কুরআনের নির্দেশ: "তোমাদের সাথে যাদের সম্পর্ক, তাদের সঙ্গে সদয় আচরণ করো।" (সূরা আন-নিসা: ৩৬)
  • তাকে বলুন, গর্ভাবস্থায় আপনার শরীর ও সন্তানের নিরাপত্তা এবং ইসলামি বিধান মানা আপনার জন্য জরুরি। এতে আপত্তি বা রাগ নয়, বরং দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত আরও মজবুত হবে ইনশাআল্লাহ।
  • স্বামী যদি জোর করে (প্রাণনাশের আশঙ্কা না থাকলে) তবুও না যাওয়ার চেষ্টা করুন। যাওয়া মানেই তিনটি বড় গুনাহের কাজে অংশ নেওয়া—অথচ আল্লাহর নির্দেশ: "তোমরা নিজেদের হাত দিয়ে নিজেদের ধ্বংসের দিকে ফেলে দিও না।" (সূরা বাকারা: ১৯৫)

ইমাম ইবনে আবিদিন (রাহিমাহুল্লাহ) লিখেছেন: স্ত্রীর জায়েয কাজে স্বামীর আনুগত্য করা লাগবে, আর হারাম কাজে স্বামীর আনুগত্য করা যাবে না। (রদ্দুল মুহতার: ৩/৫৬১)

৪. অন্তরের ক্ষোভ-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকার উপায়

আপনি যে বলছেন—অন্তরে বিরক্তি, ক্ষোভ তৈরি হয় এবং দাম্পত্য জীবনেও প্রভাব পড়ে—এটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। ইসলাম এ থেকে বাঁচার নির্দেশ দিয়েছে। এখানে কয়েকটি ব্যবহারিক আমল:

  • অজু করা: রাগ ও বিদ্বেষ দূর করতে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অজুর কথা বলেছেন। (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮৪)
  • দোয়া: "আল্লাহুম্মা আগফির লি জামবি, ওয়া আযহিব গাইজা ক্বালবি, ওয়া আজিরনি মিনাশ শাইতান" [অর্থ: হে আল্লাহ! আমার গুনাহ মাফ করুন, আমার অন্তরের ক্ষোভ দূর করুন, আর শয়তান থেকে আমাকে রক্ষা করুন] (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৫১, সহিহ)
  • ক্ষমা করে দেওয়া: যারা আপনাকে এ অবস্থায় ফেলেছে, তাদের জন্য দোয়া করুন। আল্লাহ বলেন: "যারা তাদের রবের জন্য ধৈর্য ধারণ করে... তারা মন্দের প্রতিশোধ ভালো দিয়ে দেয়।" (সূরা আর-রাদ: ২২)
  • স্বামীর সাথে খোলামেলা কথা: নিজের অনুভূতিগুলো তাকে জানান। ঘৃণা-বিদ্বেষ লালন না করে সম্পর্ককে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুন। কারণ বিদ্বেষ শুধু আপনারই ক্ষতি করবে, যেমনটা আপনি নিজেই বুঝেছেন।

৫. ব্যবহারিক সমাধান (গর্ভাবস্থায় করণীয়)

  • প্রথম পছন্দ: এমন দাওয়াতে যাবেন না। নিজের ও সন্তানের নিরাপত্তা এবং ইসলামি বিধানের দোহাই দিয়ে বিনয়ের সাথে অস্বীকৃতি জানান।

  • দ্বিতীয় পছন্দ: যদি অস্বীকার করা একদমই সম্ভব না হয় (যেমন স্বামী/শ্বশুর-শাশুড়ির চরম ক্ষোভ), তবে শরয়ী ওজরস্বরূপ অংশগ্রহণ করুন, কিন্তু হারাম কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখুন। খাওয়া দাওয়ার প্রয়োজনে সেখানে যান, গান-বাজনার জায়গা থেকে দূরে বসুন, দৃষ্টি নিচু রাখুন, ওজর শেষে দ্রুত ফিরে আসুন। গর্ভবতী নারীর জন্য নিজের শরীর ও সন্তানের সুরক্ষা একটি জরুরি প্রয়োজন (দারুরাত)।
    (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৪২-২৪৩, মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)

  • তওবা করুন: অতীতে গিয়েছিলেন বলে অন্তরে অপরাধবোধ আছে—এটা ভালো লক্ষণ। আল্লাহ তওবা কবুলকারী। "আর যারা তওবা করে ও সংশোধন করে, আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেন।" (সূরা আল-মায়িদা: ৩৯)

সংক্ষিপ্ত উত্তর

১. গর্ভাবস্থায় গান-বাজনা ও বেপর্দার দাওয়াতে যাওয়া ঠিক নয়। যদি যেতেই হয়, খেয়ে এসে চলে আসা—তবে এটি সর্বশেষ বিকল্প।
২. গান-বাজনার প্রভাব গর্ভস্থ সন্তানের উপর পড়তে পারে, তাই নিজেকে ও সন্তানকে হেফাজতে রাখা জরুরি।
৩. স্বামীর আদেশ গুনাহের কাজে মানা জায়েয নয়, তবে নম্রভাবে বোঝাতে হবে।
৪. অন্তরের ক্ষোভ দূর করতে দোয়া, অজু এবং ক্ষমার অভ্যাস করুন।

আল্লাহ তাআলা আপনার গর্ভস্থ সন্তানকে নেককার, সুস্থ-সবল করুন এবং আপনার দাম্পত্য জীবনে বরকত দিন। আমিন।

উত্তর প্রদানে:
(গবেষণা ও ফতোয়া বিভাগ)

দলিল-প্রমাণ সংক্ষেপে:

  • কুরআন: সূরা লুকমান ৬; সূরা আন-নূর ৩১; সূরা আল-ইসরা ৩২; সূরা আল-ফুরকান ৭২
  • হাদিস: সহিহ বুখারি ৫০৯৬; সহিহ মুসলিম ১৮৩৯; সুনানে আবু দাউদ ৪৯২২; সুনানে তিরমিজি ৩৭৮৭
  • ফিকহ: রদ্দুল মুহতার ৬/৩৫৬, ৩/৫৬১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৮/৩৫৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪/২৪২; মা'আরিফুল কুরআন ৮ম খণ্ড


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.