তদবির কি? এটা বিষয়ে ইসলামে কি বলা হয়েছে? পীর কারা?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
পীর কারা? কারো অনেকদিন থেকেই বিয়ে হচ্ছে না বা অনেক দিনের অসুস্থতা আছে এমতাবস্থায় অনেকে পীরের কাছে যায় দোয়া নিয়ে আসে। অনেকে তদবির নেয়। এটা কি ঠিক?
যখন বলা হয় নিজে আল্লাহর কাছে দোয়া করো, কি লাগবে আল্লাহ কে বলো, তখন উত্তর আসে হ্যাঁ দোয়া তো করতে হবে এর পাশাপাশি পীর যারা তারা তো অনেক ইবাদাত আমল করে তাদের থেকেও দোয়া নিয়ে আসলাম।
সঠিক টা জানতে চাচ্ছি।
Answer
তদবির ও পীর সম্পর্কে ইসলামি নির্দেশনা
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি তদবির, পীর এবং তাদের কাছ থেকে দোয়া নেওয়ার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। নিচে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. তদবির (تدبیر) কী?
আরবি ভাষায় 'তদবির' শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো: চিন্তা-ভাবনা করা, পরিকল্পনা করা, কোনো কাজের ব্যবস্থা করা বা প্রতিকার করা। ইসলামি পরিভাষায়, সাধারণত কোনো সমস্যা বা বিপদ থেকে মুক্তি পেতে কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত বৈধ উপায়ে (যেমন: দোয়া, সদকা, তাবিজ-দোয়া ইত্যাদি) আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়াকে তদবির বলা হয়।
২. ইসলামে তদবির সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?
ইসলামে তদবিরের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর উপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) সহকারে বৈধ উপায় অবলম্বন করা। কুরআন ও হাদিসে রোগমুক্তি, বিপদ থেকে রক্ষা এবং বৈধ প্রয়োজন পূরণের জন্য দোয়া ও কুরআনিক আয়াত দ্বারা তদবির করার অনুমতি রয়েছে।
- কুরআন থেকে দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা (আরোগ্য) ও রহমত।" (সূরা বনী-ইসরাইল: ৮২)
- হাদিস থেকে দলিল: হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অসুস্থ ব্যক্তিদের উপর দোয়া ও মন্ত্র পড়ে দিতেন। (সহিহ বুখারী, হাদিস: ৫৭৪২)
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: তদবির বা তাবিজ-দোয়া অবশ্যই হতে হবে কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত বৈধ দোয়া বা আয়াত দ্বারা। কোনো প্রকার শিরক, কুফরি বা অজ্ঞতাপূর্ণ কালাম দ্বারা তদবির করা সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েয। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৫০)
৩. পীর কারা?
ইসলামি পরিভাষায় 'পীর' বা 'মুর্শিদ' হলেন সেই ব্যক্তি যিনি নিজের জ্ঞান, আমল ও তাকওয়ার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করেন। তিনি একজন আধ্যাত্মিক শিক্ষক। প্রকৃত পীর হতে হয় আল্লাহওয়ালা, আলেম এবং সুন্নাহর অনুসারী।
৪. পীরের কাছে দোয়া নেওয়া বা তদবির করা কি ঠিক?
আপনার প্রশ্নের মূল অংশ হলো, পীরের কাছে দোয়া নেওয়া বা তদবির করা ঠিক কি না। এর উত্তর হলো:
ক. বৈধ ও উত্তম: কোনো আল্লাহওয়ালা, আলেম বা পীর যদি কুরআন-হাদিসের দোয়া দ্বারা আপনার জন্য দোয়া করেন বা তদবির করেন, তবে তা বৈধ এবং উপকারী হতে পারে। কারণ, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও সাহাবীদের জন্য দোয়া করতেন এবং সাহাবীরা একে অপরের জন্য দোয়া চাইতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৩১)
খ. শর্ত: তবে এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে: ১. দোয়া বা তদবির হতে হবে কুরআন-সুন্নাহ সম্মত। ২. পীর বা আলেমকে হতে হবে প্রকৃত সুন্নাহ অনুসারী, বিদআতী নয়। ৩. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: মনে রাখতে হবে, দোয়া বা তদবির কোনো স্বাধীন শক্তি নয়। প্রকৃতপক্ষে উপকার-অপকার করার মালিক একমাত্র আল্লাহ। পীর বা আলেম শুধু মাধ্যম। তাদেরকে আল্লাহর সাথে শরিক মনে করা বা তাদেরকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করা শিরক হবে।
৫. "নিজে দোয়া করলাম, পীরের কাছেও দোয়া নিলাম" — এটা কি ঠিক?
আপনি প্রশ্নে উল্লেখ করেছেন, অনেকে বলেন, "নিজে দোয়া করবো, তার সাথে পীরের কাছেও দোয়া নিয়ে আসবো।" এটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং প্রশংসনীয়। কারণ, ইসলামে নিজে দোয়া করার পাশাপাশি অন্য নেককার ব্যক্তির কাছ থেকে দোয়া চাওয়া নিষিদ্ধ নয়। বরং হাদিসে এসেছে, উমর (রা.) যখন তায়াম্মুমের আয়াত ভুলে গিয়েছিলেন, তখন তিনি অন্য এক সাহাবীর কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলেন। (সহিহ বুখারী, হাদিস: ৩৩৫)
তবে সতর্কতা: এই কাজটি যেন এমন না হয় যে, নিজের দোয়াকে হালকা মনে করে শুধু পীরের দোয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া হয়। মনে রাখতে হবে, দোয়া একটি ইবাদত। আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেছেন, "তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।" (সূরা গাফির: ৬০) তাই নিজের দোয়াকে গুরুত্ব দেওয়া এবং আল্লাহর কাছে সরাসরি চাওয়াই সর্বোত্তম। পীরের দোয়া হবে একটি অতিরিক্ত মাধ্যম মাত্র।
৬. পীরের কাছে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা
বর্তমান সমাজে অনেক ভন্ড পীর বা প্রতারক রয়েছে যারা মানুষকে বিভ্রান্ত করে, তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে এবং এমন তদবির দেয় যা কুরআন-সুন্নাহ সম্মত নয়। তাই পীরের কাছে যাওয়ার আগে অবশ্যই যাচাই করে নিন:
- তিনি কি প্রকৃত আলেম এবং সুন্নাহর অনুসারী?
- তার দেওয়া তদবির কি কুরআন-হাদিসের দোয়া দ্বারা?
- তিনি কি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকেন, নাকি নিজের দিকে?
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং পরবর্তী হানাফি ফকিহগণ (যেমন: ইবনে আবিদীন শামী) সর্বদা কুরআন-সুন্নাহ সম্মত দোয়া ও তদবিরের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং বিদআতী ও কুসংস্কারমূলক তদবির থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৬৩)
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
১. তদবির কুরআন-সুন্নাহ সম্মত দোয়া দ্বারা করা বৈধ। ২. পীরের কাছে দোয়া নেওয়া জায়েয, তবে শর্ত হলো পীর হতে হবে প্রকৃত সুন্নাহ অনুসারী এবং তদবির হতে হবে বৈধ। ৩. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: নিজে আল্লাহর কাছে দোয়া করাই সর্বোত্তম ইবাদত। পীরের দোয়াকে আল্লাহর সাথে শরিক মনে করা বা তার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা শিরক। পীরের দোয়া হবে শুধু একটি মাধ্যম, আর প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং আমাদের সকল বৈধ প্রয়োজন পূরণ করুন। আমিন।