রুহের হায়
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আচ্ছা কর্মফল বলে কি কিছু আছে? রুহের হায় বলেও কি?
আর কাউকে মনে আঘাত দিয়ে গালি দেয়া কেমন গুনাহ?,
আর কারো কথায় কাযে চোখের পানি ঝড়লে তার হিসাব স্বয়ং আল্লাহ নেন আসলেই?
শরীয়তের আলোকে জানালে উপকৃত হই
ধন্যবাদ
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের প্রতিটি অংশের জবাব কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে দেওয়া হলো।
১. কর্মফল বলে কি কিছু আছে?
হ্যাঁ, ইসলামে কর্মফলের ধারণা সম্পূর্ণ সত্য ও প্রতিষ্ঠিত। আরবিতে একে বলা হয় جزاء (জাযা) বা প্রতিদান। প্রতিটি ভালো ও মন্দ কাজের ফল আল্লাহ তাআলা দেবেন। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ * وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ "অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলে তা সে দেখবে, এবং কেউ অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করলে তাও সে দেখবে।" (সূরা যিলযাল: ৭-৮)
মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ. তার তাফসির মা'আরিফুল কুরআনে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, কিয়ামতের দিন প্রতিটি ভালো-মন্দ কাজেরই পূর্ণ হিসাব হবে এবং সামান্যতম কাজও উপেক্ষিত হবে না। (মা'আরিফুল কুরআন, সূরা যিলযালের তাফসির)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
فَمَنْ يَعْمَلْ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ أَسَاءَ فَعَلَيْهَا "যে ভালো কাজ করে তা তার নিজের জন্য, আর যে মন্দ করে তা তার উপরই বর্তাবে।" (সূরা ফুসসিলাত: ৪৬)
সুতরাং ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, মানুষের প্রতিটি কর্মের একটি ফল আছে এবং আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন পূর্ণ ন্যায়বিচারের সাথে তার হিসাব নেবেন। দুনিয়াতেও আল্লাহ ভালো কাজের সুফল দেন এবং মন্দ কাজের কুফলও দেখান, তবে পূর্ণ প্রতিদান হবে আখিরাতে।
২. রুহের হায় বলেও কি কিছু আছে?
روح کی حیات বা রুহের হায়াত অর্থ আত্মার জীবন। ইসলামের পরিভাষায় এর অর্থ হলো, মৃত্যুর পর কবরে বা বারযাখে আত্মার জীবিত অবস্থায় থাকা। শরীয়তের পরিভাষায় একে বলা হয় বারযাখের জীবন। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ "আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত মনে করো না; বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত এবং রিজিকপ্রাপ্ত।" (সূরা আলে ইমরান: ১৬৯)
শহিদদের আত্মা জীবিত থাকার কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের আত্মাও কবরে জীবিত থাকে এবং সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। হাদিসে আছে, মৃত ব্যক্তিকে কবরে জিজ্ঞাসা করা হয়: "তোমার রব কে?" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৩৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮৭১)
হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য কিতাব ফাতাওয়া আলমগিরিতে বলা হয়েছে, কবরের আযাব-নেয়ামত সত্য এবং তা রুহ ও শরীর উভয়ের উপরই হয়ে থাকে। (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, কিতাবুল জানায়েজ)
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি রহ. বলেন, মৃত্যুর পর রুহের একটি বিশেষ জীবন আছে, যাকে বারযাখি জীবন বলে। এই জীবন সম্পর্কে আমাদের ঈমান রাখা ওয়াজিব। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, মৃত ব্যক্তির রুহ সম্পর্কিত মাসয়ালা)
সুতরাং রুহের হায় অর্থ আত্মার সেই জীবন, যা মৃত্যুর পর বারযাখে বিদ্যমান থাকে। এটি সত্য ও প্রতিষ্ঠিত আকিদা।
৩. কাউকে মনে আঘাত দিয়ে গালি দেওয়া কেমন গুনাহ?
কাউকে মনে আঘাত দিয়ে (অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে কষ্ট দিয়ে) গালি দেওয়া ইসলামে গুরুতর গুনাহ। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا "যারা ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদেরকে কষ্ট দেয় তাদের কৃতকর্ম ছাড়াই, তারা তো অপবাদ ও সুস্পষ্ট গুনাহের বোঝা বহন করল।" (সূরা আহযাব: ৫৮)
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন:
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ "মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসিকি এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরি।" (সহিহ বুখারি: ৪৮; সহিহ মুসলিম: ৬৪)
আরেক হাদিসে এসেছে:
إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الْكَبَائِرِ أَنْ يَلْعَنَ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ ... قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ يَلْعَنُ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ؟ قَالَ: يَسُبُّ الرَّجُلُ أَبَا الرَّجُلِ فَيَسُبُّ أَبَاهُ، وَيَسُبُّ أُمَّهُ فَيَسُبُّ أُمَّهُ "বড় গুনাহগুলোর মধ্যে একটি হলো, ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া। জিজ্ঞেস করা হলো: কীভাবে কেউ তার পিতা-মাতাকে গালি দেয়? তিনি বললেন: (একজন) অপর ব্যক্তির পিতাকে গালি দেয়, ফলে সেও তার পিতাকে গালি দেয়; আর তার মাকে গালি দেয়, ফলে সেও তার মাকে গালি দেয়।" (সহিহ বুখারি: ৫৯৭৩; সহিহ মুসলিম: ৯০)
গালি দেওয়ার শাস্তি সম্পর্কে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মতে, কাউকে গালি দেওয়া ফাসিকের কাজ এবং এর জন্য তওবা করা ও ক্ষমা চাওয়া আবশ্যক। রদ্দুল মুহতার-এ (ইবনে আবিদীন) বলা হয়েছে, কোনো মুসলিমকে গালি দেওয়া হারাম এবং এটি কাবিরা গুনাহ। যদি গালিতে অপবাদ বা ভুল কথা মিশে থাকে তাহলে তা আরও গুরুতর। (রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হুদুদ, বাবুল কাযাফ)
ফাতাওয়া উসমানি-তে (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম) বলা হয়েছে, অন্যকে কষ্ট দিয়ে গালি দিলে শুধু আল্লাহর কাছে তওবা করলেই হবে না, বরং যাকে গালি দেওয়া হয়েছে তার কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়াও জরুরি। যদি ক্ষমা না নেওয়া যায়, তবে তার জন্য দোয়া করতে থাকবে। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, মাসআলা: কাউকে গালি দেওয়ার প্রায়শ্চিত্ত)
৪. কারো কথায় কাজে চোখের পানি পড়লে তার হিসাব কি আল্লাহ নিজে নেন?
প্রশ্নটি যদি হয়: "কারো কথায় বা কোনো ঘটনায় চোখের পানি পড়লে আল্লাহ কি নিজে তার হিসাব নেন?" - এখানে জেনে রাখা উচিত, ভালো বা মন্দ নিয়তে মানুষ যা করে, আল্লাহ তার প্রতিটি কাজের হিসাব নেবেন। তবে চোখের পানি বা কান্নার ব্যাপারে আলাদা কোনো নির্দিষ্ট বিধান এই কথায় নেই যে "কারো কথায় কাঁদলে আল্লাহ নিজে হিসাব নেন।" বরং কান্নার হিসাব নির্ভর করে নিয়ত ও কারণের উপর।
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন:
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى "সমস্ত কাজের ফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেকে তাই পাবে যা সে নিয়ত করবে।" (সহিহ বুখারি: ১; সহিহ মুসলিম: ১৯০৭)
- যদি আল্লাহর ভয়ে, পরকালের চিন্তায়, বা অন্য মুসলিমের দুঃখে কান্না আসে, তবে তা সওয়াবের কাজ। হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে কাঁদে, সে জাহান্নামে যাবে না। (সুনানে তিরমিজি: ১৬৩৩, হাদিসটি হাসান)
- যদি দুনিয়ার কোনো ক্ষতির কারণে কান্না হয়, তবে তা ব্যথা ও কষ্টের বহিঃপ্রকাশ মাত্র, এর জন্য কোনো গুনাহ নেই, তবে সওয়াবও বিশেষ কিছু নেই।
- যদি কান্না দেখে অন্যকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বা প্রতারণার জন্য হয়, তবে তা গুনাহ।
মুফতি তাকি উসমানি তার ফতোয়ায় বলেন, মানুষের প্রতিটি ভালো-মন্দ কাজ আল্লাহ তাআলা নিজেই দেখেন এবং তার হিসাবও তিনি নিজেই নেবেন। কোনো কাজ ছোট হোক বা বড়, আল্লাহর জ্ঞান থেকে বাদ যায় না। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, ঈমান ও আকিদা সংক্রান্ত)
সুতরাং কারো কথায় চোখের পানি পড়া যদি আল্লাহর ভয়ে বা কোনো ভালো অনুভূতি থেকে হয়, আল্লাহ খুশি হন এবং তার প্রতিদান দেন। আর যদি তা প্রদর্শনের জন্য বা অপব্যবহারের জন্য হয়, তাহলে আল্লাহ তা জানেন এবং সেজন্যে জবাবদিহি হবে। প্রতিটি কাজই আল্লাহর কাছে হিসাবের মুখোমুখি হবে, আর আল্লাহ ন্যায়বিচারক, তিনি কারো প্রতি জুলুম করেন না।
উপসংহার
১. কর্মফল সত্য, প্রতিটি ভালো-মন্দ কাজের প্রতিদান আখিরাতে পূর্ণভাবে দেবেন আল্লাহ।
২. রুহের হায় বা মৃত্যুর পর আত্মার জীবন (বারযাখ) সত্য, এটি ইসলামের মৌলিক আকিদা।
৩. গালি দেওয়া ও কাউকে মনে আঘাত দেওয়া কবিরা গুনাহ। তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা আবশ্যক।
৪. চোখের পানি তার নিয়ত অনুযায়ী হিসাব হবে, আর সকল কাজের হিসাব আল্লাহ নিজেই নেবেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং নেক আমলের তাওফিক দিন। আমিন।