বিয়েতে ছবি দেয়া নাকি আব্বু-আম্মুর কথা শুনা বেশি ফরজ?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 3260
Questioner: Rabeya Mim
Question Asked: 30 Jul 2026, 05:42 PM
Reviewed & Published: 30 Jul 2026, 05:57 PM
Views: 19
Tokens: 6,781
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম! আমি কিছুটা পর্দা মেনে চলি!
কারো সামনে যেতে চাই না!
বিয়ের ক্ষেত্রে পরিবারের লোক ছবির জন্য চাপ দেয়,ঘটক বা একেক জনকে দেখানোর কথা বলে।আমি ছবি না দিয়ে ছেলেকে আসার কথা বললে, নানা কথা শুনায়, বলে কেউ/ঘটক মেয়ে না দেখলে বর্ননা কি করে দিবে, অন্যরাও বলে আমরা না দেখলে কি করে মেয়ের বর্ননা বলব ছেলে পক্ষকে গিয়ে।
এছাড়াও ছেলে দেখতে আসলে বাড়ির মুরুব্বি লোকসহ, ছেলেপক্ষের অনেকের সামনে যাওয়ার জন্য জোর করে।
এসবে নিষেধ করলে বকা, বদদোয়া,গালমন্দ অনেক কথা বলে।ওনারা গুনাহের দায় নিবেন এই কথা বলেও ছবি দিতে বলে।অনেক অভিশাপ, বদদোয়া শুনা লাগে।
মা-বাবার কথা শুনা ফরজ এসব বলে!বলা বাহুল্য, নিষেধ করলে ওনারা রাগারাগি করেন, কখন ও নিজেও ব্যবহার খারাপ করে ফেলি।

আমি জানতে চাচ্ছি, আমার কি করা উচিত এখন?
আর আমি কি গুনাহের স্বীকার হচ্ছি না?
আমার কি বাবা-মা এর কথা শুনা উচিত? নাকি ছবি না দেয়া /ছেলে পক্ষ এবং নিজের বাড়ির এত গায়রে মাহরামের সামনে না যাওয়ার জন্য দৃঢ় থাকা।

Answer

উত্তর: বিয়ে উপলক্ষ্যে মেয়ের ছবি দেওয়া ও অমাহরামের সামনে যাওয়া সম্পর্কে শর‘ঈ নির্দেশনা

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, আপনার পর্দা পালনের আগ্রহ ও তাতে অবিচল থাকার ইচ্ছা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আল্লাহ তাআলা আপনাকে এই দ্বীনের ওপর অটল রাখুন। আমীন।

আপনার প্রশ্নের উত্তর নিম্নরূপ:

১. বিয়ের প্রস্তাবে মেয়ের ছবি দেওয়া কি জায়েজ?

বিয়ের উদ্দেশ্যে পাত্র বা তার অভিভাবককে পাত্রীর ছবি দেখানো সাধারণত জায়েয নয়, কারণ এতে করে অমাহরামের সামনে পর্দা ভঙ্গ হয় এবং ফিতনার আশঙ্কা থাকে। হানাফি ফিকাহে বিয়ে করার ইচ্ছা থাকলে শুধু মেয়ের চেহারা ও হাতের পাতা (অর্থাৎ পর্দার ব্যতিক্রম অংশ) একবার দেখার অনুমতি আছে—সেটাও একান্ত প্রয়োজনে এবং তাকেও নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে বিয়ের প্রস্তাব серьёз হলে কেবল চেহারা দেখা জায়েয, তবে খলওত (নির্জনতা) বা ফিতনার আশঙ্কা থাকলে তা নিষেধ। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৩০; ফতওয়া শামী, ৪/২৩২; বাহিশতি জেওর, বিবাহ অধ্যায়)

ছবি দেওয়া আরও বেশি ফিতনার কারণ, কারণ ছবি সংরক্ষিত থেকে যায়, অনেকের কাছে পৌঁছে যেতে পারে এবং পর্দার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। তাই ছবি না দিয়ে ছেলে পক্ষকে বলতে পারেন যে, আপনি নিজে এসে দেখতে চাইলে শর্তসাপেক্ষে একবার চেহারা দেখতে পারবে। তবে পর্দা ঠিক রেখে, অমাহরামদের ভিড়ে নয়।

২. অমাহরামের সামনে যেতে বাধ্য করা

আপনার কথা অনুযায়ী ছেলে দেখতে এলে বাড়ির অনেক মুরুব্বি ও ছেলেপক্ষের লোক—যারা আপনার জন্য অমাহরাম—সবার সামনে যেতে জোর করা হয়। এটি সম্পূর্ণ নাজায়েয ও গুনাহের কাজ। নারীর জন্য অমাহরাম পুরুষের সামনে বের হওয়া বা যাওয়া ফরজ পর্দার পরিপন্থী। কুরআনে আল্লাহ বলেন:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا “আর মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া।” (সূরা নূর, ২৪:৩১)

এই আয়াতের ভিত্তিতে বিয়ে উপলক্ষ্যেও পর্দা পালন করা ফরজ। শুধু পাত্রকে (একজনকে) শর্তসাপেক্ষে দেখা জায়েয, কিন্তু অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন বা গায়রে মাহরামদের সামনে যাওয়া জায়েয নয়। (ফতওয়া উসমানী, ২/৫২৭; ফতওয়া আলমগীরী, ১/২৬৭)

৩. মা-বাবার কথা শোনা কি ফরজ? ছবি না দেওয়া বা পর্দা না করা কি গুনাহ?

মা-বাবার আনুগত্য করা ফরজ, তবে তা শুধু বৈধ কাজে। কোন বিষয় যদি নাজায়েয বা হারাম হয়ে যায়, তাহলে তাদের কথা শোনা জায়েয নেই বরং ফরজ হলো আল্লাহর আদেশ পালন করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ “সৃষ্টিকর্তার নাফরমানিতে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ১০৯৮; মুসতাদরাকে হাকিম, ২/২৯৩)

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَىٰ أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا “আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শরিক করার চেষ্টা করে, যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না।” (সূরা লুকমান, ৩১:১৫)

সুতরাং আপনার মা-বাবা যদি আপনাকে গায়রে মাহরামের সামনে যেতে বা ছবি দিতে বাধ্য করেন—যা নিঃসন্দেহে গুনাহ—তবে তাদের কথা শোনা আপনার জন্য জরুরি নয়। বরং আপনি যদি দৃঢ় থাকেন, তাহলে আপনি গুনাহ থেকে বেঁচে যাচ্ছেন, গুনাহের ভাগী হচ্ছেন না। বরং এর জন্য আপনাকে সওয়াব দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ। (ইমদাদুল ফাতওয়া, ৪/১৯০; আপকের মাসায়েল, ২/১৫০)

৪. আপনি কি গুনাহের স্বীকার হচ্ছেন?

না, আপনি গুনাহের স্বীকার হচ্ছেন না। বরং আপনি হারাম কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করছেন। পিতা-মাতার রাগ বা বদদোয়ার ভয়ে গুনাহ করা জায়েয নয়। তাদের বদদোয়া সম্পর্কে আপনি নির্ভয় থাকতে পারেন, কারণ আপনি সঠিক পথেই আছেন। তবে তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় নম্রতা ও ভদ্রতা বজায় রাখবেন।

৫. এখন আপনার করণীয় কী?

  • প্রথমত: দৃঢ়তার সাথে পর্দা বজায় রাখুন। ছবি দেবেন না, অমাহরামের সামনে যাবেন না। ছেলে পক্ষকে জানিয়ে দিন যে, তারা ইচ্ছা করলে আপনার পরিবারের একজন মাহরাম পুরুষ (যেমন বাবা, ভাই) এর মাধ্যমে আপনার চেহারা দেখতে পারে অথবা আপনি একান্ত প্রয়োজনে পাত্রকে একবার পর্দার নিয়ম মেনে (বাড়ির ভেতরে, অন্য কেউ না থাকলে) চেহারা ও হাত দেখাতে পারেন। কিন্তু সেটাও ফিতনা থেকে মুক্ত পরিবেশে।

  • দ্বিতীয়ত: মা-বাবাকে ভালোভাবে বোঝানোর চেষ্টা করুন। শর‘ঈ দলিল দিয়ে বুঝান যে, পর্দা আমাদের ধর্মের ফরজ বিধান। তারা যদি রাগ করেন বা গালি দেন, তবে আপনি ধৈর্য ধরুন। উত্তরে তাদেরও গালি দেবেন না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।

  • তৃতীয়ত: আপনি যদি ছেলে পক্ষকে দেখাতে চান, তাহলে তাদের একান্তে একবার চেহারা দেখার ব্যবস্থা করতে পরিবারকে রাজি করান। তবে ভিড়ের সামনে নয়। অনেক সাহাবী ও তাবে‘ঈ বিয়ের প্রস্তাবে একবার চেহারা দেখার অনুমতি দিয়েছেন। (শারহে মা‘আনিল আসার, ২/২৬৮)

  • চতুর্থত: আপনি একটি ভালো মাধ্যম বেছে নিতে পারেন, যেমন কোনো ইসলামিক বিবাহ সংক্রান্ত সংস্থা বা বিশ্বস্ত আলেমের মাধ্যমে, যেখানে পর্দার শর্ত ঠিক রেখে বিয়ে সম্পন্ন করা যায়।

  • পঞ্চমত: দোয়া করুন। আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। তিনি সহজ পথ দেখাবেন ইনশাআল্লাহ।

উপসংহার

আপনি বর্তমানে যে অবস্থানে আছেন—পর্দা রক্ষা করে, ছবি না দিয়ে, অমাহরামের সামনে না গিয়ে—তা সম্পূর্ণ সঠিক এবং ইসলামসম্মত। আপনি গুনাহের স্বীকার হচ্ছেন না। বরং আপনিই সঠিক পথে আছেন। মা-বাবার নাফরমানি করলে তাদের কথা না শোনা জায়েয, তবে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করতে হবে এবং তাদের রাগ ও বদদোয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।

আল্লাহ আপনাকে আরও দৃঢ়তা দিন এবং আপনার বিয়ে সহজ করে দিন। আমীন।

রেফারেন্স:

  • কুরআন: সূরা নূর (২৪:৩১), সূরা লুকমান (৩১:১৫)
  • হাদীস: "لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق"
  • রদ্দুল মুহতার (৩/২৩০, ৪/২৩২)
  • ফতওয়া শামী (৪/২৩২)
  • বাহিশতি জেওর (বিবাহ অধ্যায়)
  • ফতওয়া উসমানী (২/৫২৭)
  • ইমদাদুল ফাতওয়া (৪/১৯০)
  • শারহু মা‘আনিল আসার (২/২৬৮)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.