৫-৬ ভরি স্বর্ণালঙ্কারের সাথে টাকা রয়েছে, যা সারা বৎসরই থাকে, যাকাত কি ফরয হবে?
Zakat and Charity · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত মহিলার উপর যাকাত ফরজ হবে। কেননা তার নিকট যাকাতযোগ্য সম্পদ (স্বর্ণালঙ্কার ও ব্যবসার পণ্য) সম্মিলিতভাবে নিসাব পরিমাণের অধিক। নিম্নে বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও দলিলসহ উত্তর প্রদান করা হলো।
১. যাকাত ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ:
- মালিকানা (সম্পদের মালিক হওয়া)
- নিসাব (নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদ থাকা)
- হাওলানে হাওল (এক বছর সম্পদের ওপর পূর্ণ হওয়া)
২. প্রশ্নে বর্ণিত সম্পদের বিশ্লেষণ:
- স্বর্ণালঙ্কার: ৫-৬ ভরি (১ ভরি = ১১.৬৬ গ্রাম) = ৫৮.৩০ গ্রাম থেকে ৬৯.৯৬ গ্রাম। হানাফি মতে স্বর্ণের নিসাব ৮৭.৪৮ গ্রাম (সাড়ে সাত ভরি)। কিন্তু ৫-৬ ভরি স্বর্ণ নিসাবের কম হলেও ব্যবসার পণ্যের সাথে যুক্ত করে নিসাব পূর্ণ হয়।
- ব্যবসার মাল: প্রতি মাসে ২-৩ লাখ টাকার পণ্য মজুদ। ব্যবসা তাঁর নামে ট্রেড লাইসেন্সকৃত। তিনি নিজে না করলেও মালিকানা তাঁরই (রদ্দুল মুহতার, ২/২৬৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৭)।
- নগদ টাকা: ৪-৫ হাজার টাকা থাকলেও তা নিসাবের চেয়ে অনেক কম।
৩. নিসাব পূর্ণ হওয়ার বিধান:
হানাফি মতে, যাকাতযোগ্য সম্পদ (স্বর্ণ, রূপা, নগদ টাকা, ব্যবসার পণ্য) সবগুলো একত্রে গণনা করে মোট মূল্য যদি রূপার নিসাব (প্রায় ৬১.২ গ্রাম রূপা বা বর্তমান বাজারমূল্য) অতিক্রম করে, তাহলে যাকাত ফরজ হয়।
(ফাতাওয়া আলমগিরী, ১/১৮২; আল-হিদায়া, ১/১০২)
গণনা:
- ৫-৬ ভরি স্বর্ণের বর্তমান বাজারমূল্য (ধরি, প্রতি ভরি ১,৫০,০০০ টাকা) = ৭,৫০,০০০ - ৯,০০,০০০ টাকা।
- ব্যবসার পণ্যের মূল্য (গড়ে ২.৫ লাখ টাকা) = ২,৫০,০০০ টাকা।
- মোট মূল্য = ১০ লক্ষ টাকার বেশি, যা রূপার নিসাবের (বর্তমানে প্রায় ১,০০,০০০ টাকা) চেয়ে বহুগুণ বেশি।
- অতএব, নিসাব পূর্ণ হওয়ায় যাকাত ফরজ।
৪. যাকাত প্রদানের পদ্ধতি:
মহিলার নিকট নগদ অর্থ না থাকলেও তিনি নিম্নোক্ত উপায়ে যাকাত আদায় করবেন:
- স্বর্ণ বিক্রি করে যাকাতের অর্থ প্রদান।
- অথবা ব্যবসার পণ্য থেকে নগদ অর্থ বের করে (সন্তানের সাহায্যে) যাকাত আদায়।
- ব্যবসা না করলেও তাঁর প্রতিনিধি রূপে সন্তানদের দিয়ে ব্যবসার মাল পরিচালিত হচ্ছে, তাই তিনি চাইলে সন্তানদের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করে যাকাত দিতে পারবেন।
(রদ্দুল মুহতার, ২/৩০৯; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৬)
৫. দলিল:
-
কুরআন:
﴿خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم﴾ (সূরা তাওবা: ১০৩)
“তাদের ধন-সম্পদ থেকে সাদকা (যাকাত) গ্রহণ করুন, যা তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে।” -
হাদিস:
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
«لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ أَوَاقٍ مِنَ الْوَرِقِ صَدَقَةٌ» (সহিহ বুখারি: ১৪৪৭)
“পাঁচ উকিয়া (২০০ দিরহামের কম) রূপার ওপর যাকাত নেই।”
(তবে ব্যবসার পণ্যের সাথে মিলে নিসাব পূর্ণ হলে তা গণ্য হবে।) -
হানাফি ফিকহের কিতাব:
“যার নিকট স্বর্ণ, রূপা ও ব্যবসার পণ্য থাকে, সে সবগুলো একত্রে মূল্যায়ন করে নিসাব পূর্ণ হলে যাকাত দেবে।”
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৫১; কিতাবুল আসল, ২/৩৮)
৬. গুরুত্বপূর্ণ নোট:
- মহিলার ব্যবসায়িক পণ্যের বাজারমূল্য প্রতি বছর যাকাত প্রদানের সময় নির্ধারণ করতে হবে। (শরহু মাআনিল আসার, ২/১২৩)
- যাকাতের হার হবে সম্পদের মোট মূল্যের ২.৫% (সাড়ে বায়তরিশ ভাগ)।
- স্বর্ণ যদি ব্যবহার্যে লাগে তবুও যাকাত ফরজ (যাকাত ফরজ হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার্য স্বর্ণও গণ্য হয়)।
(বাহিশতি জেওর, ৪র্থ খণ্ড; ফাতাওয়া রহীমিয়া, ৮/১৪১)
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
- হ্যাঁ, তার উপর যাকাত ফরজ।
- যাকাতের পরিমাণ: মোট সম্পদের (স্বর্ণের বাজারমূল্য + ব্যবসার পণ্যের মূল্য) × ২.৫%।
- নগদ না থাকায় স্বর্ণ বা পণ্য বিক্রি করে যাকাত দিতে হবে।
সতর্কতা: যাকাত ফরজ হওয়া সত্ত্বেও আদায় না করলে কবিরা গুনাহ হবে। তাই দ্রুত যাকাত আদায় করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।