গান বাজনা সংক্রান্ত হাদিসের অপব্যখ্যার জবাব কি হতে পারে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
এক ভাই প্রশ্ন করেছেন এখানে সাহাবীকে শুনতে বললেন কিন্তু নিজে শুনলেন না। তাহলে যদি হারাম হতো নবীজী নিজে শুনলেন না ঠিক আছে কিন্তু সাহাবীকে কেন শুনতে বললেন? উনার জন্য কি জায়েজ ? এসব বলে সেই ভাই গান বাজনাকে জায়েজ বলতে চাচ্ছেন। এর জবাব কি হবে ?
Answer
উত্তর: হাদীসটি গান-বাজনা জায়েজ প্রমাণ করে না, বরং এর বিপরীত প্রমাণ করে
প্রশ্নে উল্লেখিত হাদীসটি (মুসনাদে আহমদ ৪৫৩৫, সুনানে আবু দাউদ ৪৯২৪) সম্পর্কে আপনার ভাইয়ের যে যুক্তি—"সাহাবী নিজে শুনলেন না কিন্তু নাফে'কে শুনতে বললেন, তাই গান-বাজনা জায়েজ"—এটি সম্পূর্ণ ভুল ও বিভ্রান্তিকর। নিম্নে এর বিশদ ব্যাখ্যা ও জবাব দেওয়া হলো:
১. হাদীসের প্রকৃত শিক্ষা কী?
এই হাদীসে ইবনে উমর (রা.) বাঁশির আওয়াজ শুনে কানে আঙ্গুল দেন এবং নাফে' (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করেন আওয়াজ শেষ হয়েছে কিনা। এর শিক্ষা হলো:
- গান-বাজনা শোনা থেকে বিরত থাকা—নবীজী (সা.) এবং সাহাবী উভয়েই বাঁশির আওয়াজকে অপছন্দ করেছেন এবং তা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন।
- নাফে' (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করার উদ্দেশ্য ছিল—আওয়াজ বন্ধ হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া, যাতে কান থেকে আঙ্গুল সরানো যায়। এটি কোনোভাবেই গান শোনার অনুমতি দেয় না।
২. সাহাবী কেন নাফে'কে শুনতে বললেন?
ইবনে উমর (রা.) নাফে'কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—"এখনো কি আওয়াজ শুনছ?" এর কারণ:
- তিনি নিজে কানে আঙ্গুল দিয়ে ছিলেন, তাই আওয়াজ বন্ধ হয়েছে কিনা জানতে চেয়েছিলেন।
- এটি ছিল প্রতিক্রিয়ামূলক প্রশ্ন, গান শোনার উৎসাহ নয়। বরং তিনি চেয়েছিলেন আওয়াজ বন্ধ হোক, যাতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেন।
৩. গান-বাজনা হারাম হওয়ার প্রমাণ
কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহে গান-বাজনা স্পষ্টভাবে হারাম:
-
কুরআন: "আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞতাবশতঃ ক্রয় করে বেহুদা কথাবার্তা, যাতে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে..." (সূরা লুকমান ৩১:৬) — তাফসীরে ইমাম ইবনে আব্বাস (রা.) ও অন্যান্য মুফাসসিরগণ 'বেহুদা কথাবার্তা' দ্বারা গান-বাজনাকে বুঝিয়েছেন। (মাআরিফুল কুরআন, তাফসীরে উসমানী)
-
সহীহ হাদীস: "আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল বলে গণ্য করবে।" (সহীহ বুখারী ৫৫৯০)
-
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেছেন: গান-বাজনা হারাম এবং তা শোনা গুনাহ। (রদ্দুল মুহতার ৬/৩৪৯)
৪. আপনার ভাইয়ের যুক্তির জবাব
ভাই যা বলছেন: "সাহাবী শুনলেন না, কিন্তু নাফে'কে শুনতে বললেন—তাই গান জায়েজ।" উত্তর: এটি একটি বিভ্রান্তিকর যুক্তি। প্রকৃতপক্ষে:
- ইবনে উমর (রা.) নিজে শুনেননি কারণ তিনি কানে আঙ্গুল দিয়েছিলেন।
- তিনি নাফে'কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন আওয়াজ বন্ধ হয়েছে কিনা—এটি গান শোনার অনুমতি নয়, বরং তা থেকে বাঁচার উপায়।
- গান-বাজনা হারাম হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ও অসংখ্য সহীহ হাদীস রয়েছে। একটি ঘটনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে হারামকে হালাল করা যায় না।
৫. হানাফী ফিকহের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার: "বাদ্যযন্ত্র ও গান শোনা হারাম।" (৬/৩৪৯)
- ফাতাওয়া উসমানী: "গান-বাজনা, বিশেষত বাঁশি ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের সাথে গান শোনা নাজায়েজ ও কবিরা গুনাহ।" (২/৪৪)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: "সব প্রকার বাদ্যযন্ত্র হারাম।" (৪/২৩৫)
৬. উপসংহার
প্রশ্নে উল্লেখিত হাদীসটি গান-বাজনা জায়েজ প্রমাণের জন্য একেবেত্রেই ব্যবহারযোগ্য নয়। বরং এটি প্রমাণ করে যে নবীজী (সা.) ও সাহাবীগণ বাঁশির আওয়াজ (বাদ্যযন্ত্র) থেকে নিজেদের দূরে রাখতেন। আপনার ভাইয়ের উচিত—কুরআন-হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা জানতে আলেমদের কাছে আসা এবং ভ্রান্ত যুক্তি পরিহার করা।