মাদ্রাসার দরজার সামনে থেকে নিজের হারানো জুতার মতো জুতা পাওয়া গেলে সেগুলো কাউকে না জানিয়ে নেওয়া কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার ছোট ভাই মাদরাসায় পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে কিছু দিন আগে মাদরাসায় তার জুতা হারিয়ে যায় ও খালি পায়ে বাসায় আসে আসে এবং নতুন জুতা কিনে আনে। আজকে ও মাদ্রাসার দরজার সামনে থেকে ওর হারানো জুতা গুলোর মতো সেইম জুতা পায়, জুতা গুলো কেউ খুলে ভিতরে ঢুকে, আমার ভাই কাউকে না বলে জুতা গুলো নিয়ে আসে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে জুতা গুলো নিয়ে আসা কি তার ঠিক হয়েছে?
Answer
উত্তর: জুতা গুলো নিয়ে আসা ঠিক হয়নি
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
একজন ছোট শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় তার জুতা হারিয়ে ফেলে। পরে কিছুদিন পর মাদ্রাসার দরজার সামনে ঠিক একই রকম জুতা পড়ে থাকতে দেখে। সে ধরে নেয় যে এগুলো তারই হারা জুতা, অথচ সে ইতিমধ্যে নতুন জুতা কিনে ফেলেছে। সে কাউকে না জানিয়ে জুতা জোড়া বাড়ি নিয়ে আসে। প্রশ্ন হলো—এভাবে জুতা নেওয়া কি তার জন্য জায়েজ হয়েছে?
হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর
উত্তর: না, তার জন্য এভাবে জুতা নেওয়া ঠিক হয়নি। বরং এটি গায়র (পরের) মালের প্রতি অন্যায় দখল বলে গণ্য হবে।
হ্যাঁ যদি সে শতভাগ নিশ্চিত হয় যে উক্ত জুতা তারই, সেক্ষেত্রে তার জন্য সেটি নিয়ে আসা বৈধ আছে।
নিচে যুক্তি ও দলিল পেশ করা হলো—
১. লুক্বতা (পড়ে থাকা বস্তু) উত্তোলনের শর্ত
ইসলামী শরিয়তে পথে বা স্থানে পড়ে থাকা কোনো বস্তু (লুক্বতা) কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য কিছু শর্ত ও পদ্ধতি নির্ধারিত আছে। হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব রদ্দুল মুহতার (৪র্থ খণ্ড, কিতাবুল লুক্বতা) এবং ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ-তে এসেছে—
“পড়ে থাকা বস্তু যদি এমন স্থানে পাওয়া যায় যা সুরক্ষিত নয় (যেমন রাস্তা), তবে তা কুড়িয়ে নেওয়া জায়েজ কিন্তু ঘোষণা করা ওয়াজিব। আর যদি এমন স্থান হয় যেখানে নিরাপত্তা আছে (যেমন মাদ্রাসার ভিতর), তবে সাধারণত তা কুড়িয়ে নেওয়া উচিত নয়, বরং সেখানকার কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত।”
(রদ্দুল মুহতার, ৪/১৮১; ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ, ২/২৪৪)
এখানে জুতা মাদ্রাসার দরজার সামনে পড়ে ছিল—এটি একটি নিরাপদ স্থানের অংশ। তাই প্রথমেই মাদ্রাসার শিক্ষক বা পরিচালককে জানানো উচিত ছিল।
২. নিজের বলে ধরে নেওয়ার অগ্রহণযোগ্যতা
ছোট ভাইটি জোড়াটিকে "নিজের হারা জুতার মতো" দেখে নিয়ে এসেছেন, কিন্তু তিনি নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করতে পারেননি যে এগুলো তারই। হানাফি ফিকহবিদগণ বলেন—
“যদি কোনো ব্যক্তি আকার-আকৃতি দেখে নিজের হারানো বস্তু বলে ধারণা করে, তবুও তাকে ঘোষণা করতে হবে এবং পূর্ব থেকে তার বস্তুর বিশেষ চিহ্ন বলতে সক্ষম হলে তবেই নিতে পারে।”
(ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৮৩; বাদায়িউস সানায়ি’, ৬/১৯৮)
এক্ষেত্রে ছোট ভাইয়ের নতুন জুতা কেনার পর পুরোনো জুতার প্রতি তার অধিকার বিলুপ্ত হয়নি, তবে তিনি নিশ্চিত নন। তাই কেবল সাদৃশ্যের ভিত্তিতে নেওয়া জায়েজ নয়।
৩. মাসআলার মূল বিধান
আপনার ভাই যদি নিশ্চিত হতেন যে জুতা জোড়া তারই (যেমন তার মতো একই দাগ, ছিদ্র, মাপ ইত্যাদি), তাহলে তিনি তা ফেরত নিতে পারতেন। কিন্তু এখানে তিনি নিশ্চিত নন, বরং শুধু "মতো" দেখেছেন। উলামায়ে কেরামের কাছ থেকে জানা যায়—
“কেউ নিজের হারানো জুতা অন্য কারো জুতার স্তূপে দেখলে সেটি নিয়ে নেওয়া জায়েজ নয়, বরং অন্যায় দখল হবে।”
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩২; কিতাবুল লুক্বতা, ইবনে আবেদীন)
তাই তাকে জুতা জোড়া মাদ্রাসায় ফেরত দেওয়া উচিত এবং বিষয়টি শিক্ষককে জানিয়ে দেওয়া উচিত।
সিদ্ধান্ত
- জুতা জোড়া নেওয়া তার জন্য জায়েজ হয়নি।
- তাকে এখনই মাদ্রাসায় ফিরিয়ে দিতে হবে এবং শিক্ষককে জানিয়ে সঠিক মালিক খুঁজে বের করার ব্যবস্থা করতে হবে।
- যদি প্রকৃত মালিক পাওয়া না যায়, তাহলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সাথে পরামর্শ করে সদকা করে দেওয়া উত্তম।
হ্যাঁ যদি সে শতভাগ নিশ্চিত হয় যে উক্ত জুতা তারই, সেক্ষেত্রে তার জন্য সেটি নিয়ে আসা বৈধ আছে।
হাদীসের দলিল:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَأْخُذَ شَيْئًا مِنَ اللَّقَطَةِ إِلَّا بَعْدَ التَّعْرِيفِ
“কোনো মুসলিমের জন্য পড়ে থাকা বস্তু নেওয়া হালাল নয়, যতক্ষণ না সে ঘোষণা দেয় (ও মালিকের সন্ধান করে)।”
(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ১৭০১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৭২২)