হেদায়েতপ্রাপ্ত হোয়ার পর নিজের মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট কোনো বিধর্মীকে দিলে কি গুণাহ হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে হেদায়েত দান করেছেন। আপনি গান-বাজনার যন্ত্র (হারমোনিয়াম ও গিটার) পূর্বে নিজের কাছে রেখেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর সেগুলো কোনো মুসলিমকে না দিয়ে একজন হিন্দু acquaintance-কে উপহার দিয়ে দিয়েছেন। এখন আপনার মনে উদ্বেগ হচ্ছে যে, আপনার দেয়ার কারণে তিনি যদি সেগুলো ব্যবহার করে গুনাহ করেন, তাহলে আপনি কি সেটার ভাগীদার হবেন? আর এগুলো ফেরত আনারও উপায় নেই—এ অবস্থায় করণীয় কী?
উত্তর সংক্ষেপে:
জ্বী, আপনি একটি গুরুতর ভুল করেছেন। ইসলামী শরিয়তে বাদ্যযন্ত্র (মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট) তৈরি, বিক্রি, ক্রয়, উপহার দেয়া—সবই হারাম, কারণ এগুলো গুনাহের কাজে ব্যবহৃত হয়। আর কাউকে (মুসলিম হোক বা অমুসলিম) কোনো হারাম জিনিস দেয়া বা বিক্রি করা গুনাহের সহযোগিতা করার শামিল। তাই আপনার এ কাজটি হারাম ছিল। অমুসলিমদের বেলায়ও এই বিধান—তাদেরকে বাদ্যযন্ত্র দেয়া জায়েয নয়, কারণ তারাও সেগুলো ব্যবহার করে হারাম কাজে লিপ্ত হবে, আর আপনি তার কারণ হয়েছেন। নিচে বিস্তারিত ও করণীয় উল্লেখ করা হলো।
১. বাদ্যযন্ত্রের শরয়ী বিধান
হানাফি মাজহাবের সুস্পষ্ট মতানুযায়ী, গায়রুল্লাহর জন্য বাজানো ও বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হারাম। হারাম কাজের মাধ্যম (যেমন বাদ্যযন্ত্র তৈরি, ক্রয়-বিক্রয়, উপহার)ও হারাম। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সহ অন্যান্য ইমামদের মতে, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা করা জায়েয নয় এবং সেগুলো উপহার দেয়াও জায়েয নয়।
-
রদ্দুল মুহতার (২/৫৩-৫৪) তে এসেছে:
"বাদ্যযন্ত্র ও গানবাজনার সরঞ্জাম (যেমন তবলা, বীণা, হারমোনিয়াম ইত্যাদি) বিক্রি করা, কিনা, বা উপহার দেয়া—সবই হারাম। কেননা এগুলো নিষিদ্ধ বিনোদনের জন্য ব্যবহৃত হয়।" -
ফতোয়া হিন্দিয়া (৫/৩৫১):
"বাদ্যযন্ত্র বিক্রি করা জায়েয নয়, চাই তা মুসলিমকে হোক বা যিম্মি (অমুসলিম নাগরিক) কে হোক, কারণ এগুলো হারাম কাজে ব্যবহার হয়।" -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৩৭):
"গান-বাজনার যন্ত্র মুসলিম অমুসলিম সবাইকে দেয়া নাজায়েয।"
সুতরাং, আপনার কাজটি নাজায়েয এবং গুনাহের কাজ।
২. আপনি কি তার গুনাহের ভাগীদার হবেন?
হ্যাঁ, আপনি তার গুনাহের অংশীদার হবেন—যদিও তা পরোক্ষভাবে। কুরআনে এসেছে:
"এবং তোমরা নেকী ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সাহায্য কোরো না।" (সূরা মায়েদা: ২)
আপনি তাকে বাদ্যযন্ত্র দিয়ে তার গুনাহের মাধ্যম সরবরাহ করেছেন। তাই সে যখন তা বাজিয়ে গুনাহ করবে, আপনি তার গুনাহের অনুরূপ গুনাহের ভাগীদার হবেন (যদিও তার গুনাহ কমবে না)। হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের পথ দেখায়, তার জন্য সে কাজকারীর সমান সওয়াব রয়েছে। আর যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজের পথ দেখায়, তার জন্য সে কাজকারীর সমান গুনাহ রয়েছে।" (সহিহ মুসলিম: ২৩৫১)
আপনি এখানে মন্দ কাজের পথ প্রদর্শক হয়েছেন। তাই তার গুনাহের ভাগ আপনার ওপরও বর্তাবে।
৩. এখন করণীয় কী?
আপনি জানিয়েছেন যে, ফেরত আনতে পারবেন না—কারণ সে সম্ভবত ফেরত দেবে না বা আপনি আর যোগাযোগে নেই। তবুও নিম্নোক্ত কাজগুলো করুন:
(ক) আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তিগফার করুন
- এই গুনাহের জন্য আন্তরিকভাবে তওবা করুন। আল্লাহ তওবা কবুল করেন (সূরা আয-যুমার: ৫৩)।
- নিয়ত করুন যে, ভবিষ্যতে কখনো কোনো হারাম বস্তু কাউকে দেবেন না, এমনকি অমুসলিমকেও নয়।
(খ) যতদূর সম্ভব ফেরত আনার চেষ্টা করুন
- আপনি যদি সেটা ফেরত আনতে সক্ষম হন (যেমন তাকে অনুরোধ করা, অর্থের বিনিময়ে কিনে নেয়া ইত্যাদি), তাহলে তা করুন। কিন্তু আপনি বলেছেন "ফেরত আনতে পারবেন না"—তবে নিশ্চিত করুন:
- আপনি কি একেবারেই পারবেন না? যদি সামান্য সম্ভাবনা থাকে, তাহলে চেষ্টা করুন।
- যদি না পারেন, তাহলে নিয়ত করে দিন যে, সুযোগ পেলেই এগুলোর নিষ্পত্তি করবেন।
(গ) সদকা ও নেক আমল বৃদ্ধি করুন
- নিজের গুনাহ মাফের জন্য অধিক সদকা করুন, নফল নামাজ পড়ুন, কোরআন তিলাওয়াত করুন। আশা করা যায়, আল্লাহ তওবা ও নেক আমলের বিনিময়ে গুনাহ মাফ করবেন।
(ঘ) অমুসলিমকে বাদ্যযন্ত্র দেয়া যে হারাম—এ ব্যাপারে সচেতন থাকুন
- অনেক সময় ধারণা হয়, "অমুসলিম তো আমাদের শরিয়তের অধীন নয়, তাই তাকে দেয়াতে দোষ নেই"—এটা ভুল। হারাম কাজে সহযোগিতা সব ধরনের মানুষের জন্যই নিষিদ্ধ, বিশেষ করে যখন আমরা জানি যে, সে ওই বস্তু দিয়ে হারাম কাজ করবে।
৪. ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা
- ইসলাম গ্রহণের পর পুরনো হারাম জিনিস (যেমন বাদ্যযন্ত্র, ছবি, মূর্তি, জুয়ার সরঞ্জাম ইত্যাদি) কোনোভাবেই রাখা জায়েয নয়। এগুলো নষ্ট করে ফেলা বা হারাম নয় এমন কাজে ব্যবহার করা (যেমন গিটারকে জ্বালানী হিসেবে পুড়িয়ে ফেলা) জরুরি।
- অন্যের কাছে উপহার দেয়াও জায়েয হবে না, যদি তা হারাম কাজে ব্যবহার হয়। বরং তা নষ্ট করে ফেলাই সর্বোত্তম।
- পুনরায় নিশ্চিত করুন: বাদ্যযন্ত্র বিক্রি বা দান করা—মুসলিম বা অমুসলিম কাউকে—হারাম। (ফতোয়ায়ে উসমানী, ২/৪৪৫)
উপসংহার: আপনার কাজটি ভুল হয়েছে এবং আপনি তার গুনাহের ভাগীদার হয়েছেন। তবে আল্লাহর রহমত অপরিসীম—আপনি যদি আন্তরিক তওবা করেন এবং ভবিষ্যতে সাবধান হন, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ মাফ করবেন। যেহেতু ফেরত আনা সম্ভব নয়, তাই তওবা ও নেক আমলই আপনার করণীয়।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তওবা কবুল করে হেদায়েতের ওপর অবিচল রাখুন। (আমিন)