হস্তমৈথুন কখন জায়েজ হয়?, মাহরামের প্রতি আকর্ষণ হলে বা উত্তেজনা দমনে হস্তমৈথুন করার কি রুখসত হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নের উত্তর: বিশেষ পরিস্থিতিতে হস্তমৈথুনের বিধান
প্রাথমিক কথা
প্রশ্নকারী ভাই, আপনার অবস্থা ও সংগ্রাম আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি ইসলামি জীবনযাপনে যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন, কিন্তু শাহ্ওয়াত (যৌন উত্তেজনা) দমনে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং মাহরাম মহিলাদের প্রতিও আকর্ষণ অনুভব করছেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর পরীক্ষা। তবে হস্তমৈথুনকে সরাসরি জায়েজ করার আগে কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি বুঝে নেওয়া জরুরি।
হস্তমৈথুনের মৌলিক বিধান (হানাফি মতে)
হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, হস্তমৈথুন (ইস্তিমনা) সাধারণত হারাম ও নিষিদ্ধ। কারণ কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
“আর যারা তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, তবে নিজ স্ত্রী বা মালিকানাধীন দাসী ছাড়া – এতে তারা নিন্দিত নয়। কিন্তু যে কেউ এদের ছাড়া অন্য কিছু কামনা করে, তারাই সীমালংঘনকারী।” (সূরা আল-মুমিনুন: ৫-৭)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও অধিকাংশ হানাফি ফকীহের মতে, হস্তমৈথুন এ আয়াতের আওতায় ‘সীমালংঘন’ হিসেবে গণ্য। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ (যেমন ইমাম আবু ইউসুফ রহ.) প্রয়োজন (যিনা থেকে বাঁচার জন্য) জায়েজ বলেছেন। কিন্তু ফতোয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত হারামই মূল সিদ্ধান্ত।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার ৬/৩৭২, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩৫৫, ফাতাওয়া উসমানি ২/৪০৫)
আপনার বর্তমান পরিস্থিতি ও হস্তমৈথুন
আপনি বলছেন:
- নজরের খেয়ানত হচ্ছে
- মাহরাম মহিলাদের প্রতিও শাহ্ওয়াত জাগছে
- নামাজ-যিকিরের পরও এই সমস্যা ফিরে আসছে
- পড়াশোনা ও কাজে মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে
এক্ষেত্রে হস্তমৈথুন জায়েজ হবে কি না তা নির্ভর করে ‘প্রয়োজন (দারুরাহ) ও চরম অবস্থা’-এর ওপর। হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ নীতি হলো:
“যদি কোনো ব্যক্তি নিজের যৌনক্ষুধা দমন করতে না পেরে যিনা বা মাহরামের সাথে সম্পর্কের মতো মহাপাপে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করে, তবে সে হস্তমৈথুন করতে পারে – তবে শুধুমাত্র সে পরিমাণে যা উত্তেজনা প্রশমিত করে।” (ফাতাওয়া আলমগিরি ৫/৩৫৫, ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪/২৮৮)
আপনার ক্ষেত্রে:
- মাহরামদের প্রতি আকর্ষণ – এটি অত্যন্ত গুরুতর পাপ। যদি আপনি মনে করেন যে এই আকর্ষণের কারণে যেকোনো মুহূর্তে আপনি বড় পাপে জড়িয়ে পড়তে পারেন (যেমন মাহরামের সাথে অবৈধ সম্পর্ক বা যিনা), তাহলে হস্তমৈথুন শেষ সমাধান হিসেবে জায়েজ হতে পারে।
- কিন্তু যদি আপনি শুধুমাত্র উত্তেজনা দমনের জন্য এটি করতে চান, আর বড় পাপে জড়ানোর আশঙ্কা না থাকে, তাহলে হস্তমৈথুন করা হারাম।
(দ্রষ্টব্য: শাহ্ওয়াতের চিন্তা আসা গুনাহ নয়, যতক্ষণ তা ইচ্ছাকৃতভাবে লালন না করা হয়। ইচ্ছাকৃত খারাপ চিন্তাকে গুনাহ বলা হয়েছে।)
বিকল্প ও প্রতিকার (প্রথম অগ্রাধিকার)
হস্তমৈথুনের পরিবর্তে ইসলাম যেসব উপায় দিয়েছে, তা আপনার জন্য বেশি কল্যাণকর:
১. রোযা রাখা:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যার বিবাহের সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোযা রাখে। কারণ রোযা তার জন্য যৌন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রক।” (বুখারি, মুসলিম)
২. নজর ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ:
- রাস্তায়, ঘরে, মোবাইলে – দৃষ্টি নিচু রাখতে হবে। মাহরাম হলেও দৃষ্টি লালসাপূর্ণ হলে তা হারাম।
- উত্তেজনা বাড়ায় এমন ছবি, ভিডিও, কল্পনা থেকে দূরে থাকা।
৩. বিবাহের চেষ্টা:
যদি বিবাহ সম্ভব হয়, তবে তা উত্তম সমাধান। বর্তমানে বিবাহ না হলেও পরিকল্পনা ও দুআ করতে থাকুন।
৪. দৈহিক পরিশ্রম ও মনোযোগ পরিবর্তন:
ব্যায়াম, হাঁটা, কোনো কাজে ব্যস্ত থাকা উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করে।
৫. তাওবা ও ইসতিগফার:
প্রতিবার দুর্বলতা দেখা দিলে তাওবা করুন। আল্লাহ ক্ষমাশীল।
চূড়ান্ত ফতোয়া
-
আপনার বর্তমান অবস্থায় (মাহরামের প্রতি আকর্ষণ ও যিনার আশঙ্কা) হস্তমৈথুন শেষ উপায় হিসেবে জায়েজ – তবে শর্ত হলো:
১. অন্য সব বৈধ উপায় ব্যর্থ হওয়ার পর।
২. শুধু উত্তেজনা প্রশমনের জন্য, অভ্যাসে পরিণত না করে।
৩. ক্ষমা প্রার্থনা করে পরে তাওবা করা। -
তবে আগে উল্লিখিত বিকল্পগুলো (রোযা, নজর হেফাজত, বিবাহের প্রচেষ্টা) কঠোরভাবে পালন করা আবশ্যক। কোনো অবস্থাতেই হস্তমৈথুনকে স্বাভাবিক বা উৎসাহিত করা হয় না।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসূত্র
- রদ্দুল মুহতার: ৬/৩৭২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৮৮
- ফাতাওয়া উসমানি: ২/৪০৫
- ফাতাওয়া আলমগিরি: ৫/৩৫৫
- বেহেশতি জেওর: পৃষ্ঠা ৮৮ (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- মাআরিফুল কুরআন: সূরা মুমিনুনের তাফসীর (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
সতর্কতা ও পরামর্শ
- যেহেতু আপনি মাহরামদের প্রতিও আকর্ষণ অনুভব করছেন, এটি বড় ধরনের মানসিক ও ঈমানি সমস্যা। একজন আলেম বা ইসলামি মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিন।
- শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচতে সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি ও সকাল-সন্ধ্যার যিকির নিয়মিত পড়ুন।
- আপনার সমস্যা বারবার ফিরে আসায় হতাশ হবেন না। আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।
মনে রাখবেন: হস্তমৈথুন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং একটি অস্থায়ী ‘ওষুধ’ মাত্র। সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলার।