জমি ক্রয়ের পরিপূর্ণ টাকা পরিশোধ না করে কি উক্ত জমিকে অন্যর নিকট বিক্রি করা যাবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার জমি ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবসা সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জানার প্রয়োজন ছিল। বিষয়টি শরঈ দৃষ্টিতে সহীহ কি না, তা নিশ্চিত হতে চাচ্ছি।
বিষয়টি নিম্নরূপ:
মনে করুন, আমি ৫০ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি জমি কেনার সিদ্ধান্ত নিলাম। জমিটি বায়না করার সময় আমি মূল মালিককে ১০ লক্ষ টাকা প্রদান করলাম এবং ক্রয় চুক্তি চূড়ান্ত করলাম।
এরপর আমি জমিটিকে ১০টি সমান শেয়ারে বা অংশে বিভক্ত করলাম এবং প্রতিটি শেয়ার ৬ লক্ষ টাকা দামে অন্যদের কাছে বিক্রির প্রস্তাব করলাম (যার ফলে মোট বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ৬০ লক্ষ টাকা)।
শেয়ার গ্রহীতাদের কাছ থেকে মোট ৬০ লক্ষ টাকা উত্তোলন করার পর, সেখান থেকে আরও ৪০ লক্ষ টাকা দিয়ে জমিটির মূল মালিকের বাকি পরিশোধ বুঝিয়ে দিলাম (অর্থাৎ মূল মালিক তার ৫০ লক্ষ টাকা বুঝে পেলেন)। এর ফলে উক্ত কেনাবেচায় আমার ১০ লক্ষ টাকা মুনাফা বা লাভ অবশিষ্ট রইল।
আমার প্রশ্নসমূহ
১. এই পদ্ধতিতে (পুরো মূল্য পরিশোধ করার আগেই বা নিজের নামে জমিটির পূর্ণ দখল ও মালিকানা আসার আগেই) জমিটি শেয়ারে ভাগ করে অন্যদের কাছে বিক্রি করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ ও হালাল হবে কি?
২. যদি এভাবে লেনদেন করা শরীয়তসম্মত না হয়, তবে এই ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াটিকে শরীয়তসম্মত বা হালাল উপায়ে সম্পন্ন করার সঠিক নিয়মটি কী হতে পারে?
ওস্তাদদের মূল্যবান সময় ও সুচিন্তিত শরঈ দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করছি।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিটি শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়। কারণ এতে দুটি মূলনীতি লঙ্ঘিত হয়েছে:
(১) ক্রীত জিনিসের পূর্ণ মালিকানা ও দখল লাভের আগে তা বিক্রি করা – হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, কোনো জিনিস ক্রয় করার পর তা নিজের দখলে (কবজা) নেওয়া বা পূর্ণ মালিকানা অর্জনের আগে তা বিক্রি করা জায়েজ নয়। যদিও জমির মতো অচল সম্পদের (আকারাত) ক্ষেত্রে কিছু হানাফী উলামা কবজার আগে বিক্রির অনুমতি দিয়েছেন, তবে সেটি তখনই যখন ক্রেতা পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করে জমির মালিক হয়ে গেছে। প্রশ্নে উল্লেখিত অবস্থায় আপনি শুধু ১০ লক্ষ টাকা বায়না হিসাবে দিয়েছেন, পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করেননি এবং জমির মালিকানা আপনার নামে স্থানান্তরিত হয়নি। সুতরাং আপনি জমির মালিক নন, তাই তা ভাগ করে অন্যদের কাছে বিক্রি করা বায়‘-ই ফুজুল (অন্যের জিনিস বিক্রি) হিসাবে গণ্য হবে, যা অবৈধ।
(২) মালিক না হয়ে বা মালিকের পক্ষ থেকে অনুমতি ছাড়া বিক্রি – শরীয়তের মূলনীতি হলো, “কেউ তার মালিকানায় আসেনি এমন জিনিস বিক্রি করতে পারে না।” (সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ১২৩২)
আপনার লেনদেনটি মূলত বায়‘-ই বায়না (অগ্রিম চুক্তি) ও পরবর্তীতে শেয়ার বিক্রি – কিন্তু যেহেতু জমিটি আপনার নামে বায়না করার সময়ও পূর্ণ মালিকানায় আসেনি, তাই শেয়ার বিক্রি বৈধ নয়।
সংশ্লিষ্ট হানাফী গ্রন্থের ফতোয়া:
- রদ্দুল মুহতার (৫/৪৩): “কবজা বা দখল লাভের পূর্বে বিক্রি করা নাজায়েজ, যদিও পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করা হয়ে থাকে।”
- ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (৩/২৩৪): “যে ব্যক্তি কোনো জিনিস ক্রয় করে, কিন্তু এখনও তা কবজা করেনি, সে তা বিক্রি করতে পারবে না।”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩০৭): “জমি ক্রয় করার পর দলিল সম্পাদন ও বিক্রেতার থেকে দখল নেওয়ার আগে কাটাছাঁট বা ভাগ করে বিক্রি করা নাজায়েজ।”
আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর:
প্রশ্নবর্ণিত পদ্ধতিতে জমি শেয়ারে ভাগ করে অন্যদের কাছে বিক্রি করা নাজায়েজ ও হারাম। এতে যে লাভ (১০ লক্ষ) হবে তাও হালাল নয়, কারণ তা অবৈধ পদ্ধতিতে অর্জিত।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর (শরীয়তসম্মত পদ্ধতি):
আপনার অভিপ্রায় (জমি ক্রয় করে তার পরবর্তী লাভ করা) শরীয়তসম্মতভাবে করতে চাইলে নিম্নলিখিত পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন:
পদ্ধতি ১ (সরাসরি ক্রয়-পূর্ব পূর্ণ মালিকানা):
প্রথমে আপনার নিকট সম্পূর্ণ ৫০ লক্ষ টাকার ব্যবস্থা করে জমিটি কিনুন। মূল মালিককে পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করুন এবং নিজ নামে দলিল সম্পাদন ও দখল নিন। এরপর জমিটি শেয়ারে ভাগ করে অন্যদের কাছে বিক্রি করুন। এতে আপনার বৈধভাবে ১০ লক্ষ টাকা মুনাফা হবে।
পদ্ধতি ২ (শিরকাত বা অংশীদারিত্ব):
আপনি জমিটির মূল মালিকের সাথে বা অন্য বিনিয়োগকারীদের সাথে একটি শিরকাত (পার্টনারশিপ) চুক্তি করতে পারেন। যেমন:
- আপনি ও কয়েকজন মিলে ৫০ লক্ষ টাকায় জমিটি কিনবেন।
- আপনার অংশ (যেমন ১০%) এবং অন্যদের অংশ নির্ধারণ করে দলিল ও দখল নেওয়া হবে।
- পরে জমিটির উন্নয়ন বা পুনর্বিক্রয় করে লাভ সবাই অংশ অনুযায়ী ভাগ করবেন। এতে আপনার লাভ বৈধ হবে।
পদ্ধতি ৩ (বায়‘-ই ওয়াফা বা বায়‘-ই ইসতিগলাল):
আপনি ‘বায়‘-ই ওয়াফা’ বা ‘বায়‘-ই ইসতিগলাল’ নামক পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন, তবে তা জটিল ও আলেমদের তত্ত্বাবধানে প্রয়োগ করা উচিত।
সঠিক নিয়ম:
আপনার জন্য সবচেয়ে সহজ ও বিশুদ্ধ পদ্ধতি হলো: প্রথমে পূর্ণ টাকা দিয়ে জমি নিজের নামে কিনুন, দখল নিন, তারপর বিক্রি করুন।
উপসংহার:
আপনার বর্ণিত পদ্ধতি বৈধ নয়। এটি বায়‘-ই ফুজুল (অন্যের মাল বিক্রি) ও কবজার আগে বিক্রি হওয়ার কারণে নাজায়েজ। এই লেনদেন থেকে তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে উপরোক্ত শরীয়তসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করুন।
আল্লাহু তা‘আলা অধিক জানেন।