খাঁচায় টিয়া পাখি লালন পালন প্রসঙ্গে

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 3106
Questioner: MD AL IMRAN
Question Asked: 25 Jul 2026, 03:49 PM
Reviewed & Published: 25 Jul 2026, 03:54 PM
Views: 11
Tokens: 5,593
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আস্সালামুয়ালাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব।

আমি পাখি লালন পালনে খুবই আগ্রহী একজন মানুষ।

তো আমি কি বাজার থেকে একটি টিয়া পাখি কিনে এনে খাঁচায় লালন পালন করতে পারি?

যদি আমি তাকে কোনো প্রকার খাবার বা চিকিৎসা বিষয়ক কষ্ট না দেই। তাহলে হানাফি ফিকহ এর দৃষ্টিতে জায়েজ হবে?

উল্লেখ থাকে যে, আমি বিক্রেতাকে প্রশ্ন করলাম এই টিয়া পাখির জন্ম কোথায় হইছে? সে বললো এটা গাছে পাখির বাসাতেই জন্ম হইছে। পরে তারা গাছ থেকে নামিয়ে খাঁচায় করে বিক্রি করতেছে।

কবুতর, টিয়া ও শালিক পাখির বিধান কি?

দয়া করে যদি জানাতেন।

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। পাখি লালন-পালনের প্রতি আপনার আগ্রহ স্বাভাবিক এবং অনেক সাহাবী ও পীর-মাশায়েখও পাখি পালন করতেন। তবে ইসলামী বিধান অনুযায়ী পাখি বা অন্য কোনো প্রাণীকে খাঁচায় আটকে রাখার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত ও সতর্কতা রয়েছে। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।


১. সাধারণ নীতি: খাঁচায় পাখি রাখা কি জায়েজ?

হানাফি ফিকহে কোনো প্রাণীকে খাঁচায় আটকে রাখা জায়েজ, যদি নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ হয়:

  • পাখির খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
  • খাঁচাটি যথেষ্ট বড় হতে হবে, যাতে পাখি স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করতে পারে এবং তার পাখা না ভাঙে।
  • পাখিকে কোনো ধরনের নির্যাতন বা অপ্রয়োজনীয় কষ্ট দেওয়া যাবে না।

👉 রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) ৫/২৩২-এ এসেছে:

"পাখি বা অন্য কোনো প্রাণীকে খাঁচায় আটকে রাখা জায়েজ, যদি তার খাদ্য-পানীয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ের ব্যবস্থা করা হয়। তবে যদি কষ্ট দেয়া হয় বা তার অধিকার লঙ্ঘন করা হয়, তবে তা হারাম।"

👉 ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৪৫৮)-এ বলা হয়েছে:

"পাখি পালন করা এবং তাদেরকে ঘরে বা খাঁচায় রাখা বৈধ, তবে খাদ্য ও পানীয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।"


২. আপনার প্রসঙ্গে টিয়া পাখি (গাছের বাসা থেকে আনা)

আপনি জানিয়েছেন যে টিয়া পাখিটি গাছের বাসা থেকে ধরে খাঁচায় বিক্রি করা হচ্ছে। এখানে দুটি দিক বিবেচ্য:

ক. পাখিটি বুনো (wild) ছিল – এটি কি জায়েজ?

বন্য পাখি ধরে খাঁচায় রাখা জায়েজ, যদি:

  • এটি শুধু খেলার জন্য বা অহেতুক কষ্ট দেওয়ার জন্য না হয়।
  • পাখিটি এমন প্রজাতির হয় যা সাধারণত মানুষ পোষে (যেমন: টিয়া, শালিক, কবুতর ইত্যাদি)।
  • পাখিটির কোনো প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্নকরণে অতিরিক্ত কষ্ট না হয়।

👉 ফাতাওয়া উসমানী (২/২৫৪)-এ মুফতি তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম লিখেছেন:

"বন্য পাখি ধরে পোষা জায়েজ, তবে শর্ত হলো তার খাদ্য, পানি ও বসবাসের উপযুক্ত ব্যবস্থা করা। আর যদি পাখিটি খুব ছোট হয় এবং বাসায় ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে ফিরিয়ে দেওয়া উত্তম।"

তবে বিশেষ সতর্কতা: অনেক আধুনিক দেশে বন্য পাখি ধরে রাখা আইনত নিষিদ্ধ। তাই দেশীয় আইন মান্য করাও জরুরি।

খ. পাখিটির জন্ম কোথায় – এতে কি পার্থক্য হয়?

জন্মস্থান মূলত কোনো কিছু হারাম বা হালাল করে না। তবে ইসলামে বন্য পাখি ধরে পোষার অনুমতি আছে, যদি পাখিটির কোনো অন্যায়ভাবে ক্ষতি না হয়। তাই আপনার পাখিটির জন্ম গাছের বাসায় হলেও, একে খাঁচায় রাখা জায়েজ, যতক্ষণ আপনি তার অধিকার আদায় করেন।


৩. কবুতর, টিয়া ও শালিক পাখির বিধান

ক. কবুতর (Pigeon)

কবুতর পালন করা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে এটি জায়েজ। সাহাবীগণও কবুতর পুষতেন। তবে কবুতর লালন-পালনের ক্ষেত্রে কিছু সীমারেখা আছে:

  • কবুতরকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া যাবে না।
  • কবুতরের ডিম বা বাচ্চা নেওয়ার সময় যেন মা কবুতর কষ্ট না পায়।
  • কবুতর লড়াই বা প্রতিযোগিতার জন্য পোষা জায়েজ, তবে যদি জুয়া বা বাজি ধরা জড়িত থাকে, তবে তা হারাম।

👉 ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৭৮)-এ মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেছেন:

"কবুতর পোষা জায়েজ, তবে তা জুয়া বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ কাজে ব্যবহার করা যাবে না।"

খ. টিয়া (Parrot)

টিয়া পাখি পালন জায়েজ। টিয়া কথা বলতে পারে বলে অনেকেই পোষে। কোনো দলিলে টিয়াকে খাঁচায় রাখা নিষেধ করা হয়নি। তবে শর্ত একটাই: যত্ন নিতে হবে এবং কষ্ট দেওয়া যাবে না।

👉 বেহেশতী জেওর (২/২৫)-এ আছেঃ

"পোষা পাখি, যেমন টিয়া, শালিক, কবুতর ইত্যাদি রাখা জায়েজ, তবে তাদের খাদ্য-পানীয় ও পরিচর্যা করতে হবে।"

গ. শালিক (Mynah)

শালিক পাখিও জায়েজ। এটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পাখি এবং পোষা যায়। তবে শালিক সাধারণত উড়ন্ত এবং স্বাধীন পাখি, তাই খাঁচায় রাখলে বড় খাঁচা ও পর্যাপ্ত জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে।


৪. বিশেষ দিকনির্দেশনা: অধিকার রক্ষার গুরুত্ব

আপনি যদি পাখিটিকে কোনো খাবার বা চিকিৎসা বিষয়ক কষ্ট না দেন, তাহলে এটি জায়েজ হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে:

  • প্রতিদিন তাজা পানি ও সঠিক খাবার সরবরাহ।
  • খাঁচা নিয়মিত পরিষ্কার।
  • পাখির স্বাস্থ্য নজরদারি এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসা।
  • পাখিকে নিয়ে অহেতুক বিরক্ত না করা।

হাদিসে এসেছে:

عن ابن عمر رضي الله عنهما أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: "دخلت امرأة النار في هرة حبستها، لا هي أطعمتها ولا هي تركتها تأكل من خشاش الأرض" (متفق عليه)
অর্থ: "এক মহিলাকে বিড়াল আটকে রাখার কারণে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়। সে তাকে খাওয়াত না, ছেড়েও দিত না যে সে মাটিতে কীটপতঙ্গ খেয়ে বাঁচবে।" (বুখারি ও মুসলিম)

এ হাদিস থেকে বুঝা যায়, কোনো প্রাণীকে আটকে রেখে তার খাদ্যের ব্যবস্থা না করলে তা কবিরা গুনাহ। বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী যত্ন নেওয়া ফরজ।


৫. উপসংহার

আপনার টিয়া পাখি খাঁচায় লালন-পালন করা হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে জায়েজ (পারমিটেড), যদি আপনি নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ করেন:

  • পাখিকে খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করেন।
  • খাঁচাটি যথেষ্ট বড় হয় এবং পাখির স্বাভাবিক চলাচলে বাধা না আসে।
  • পাখিকে কোনো প্রকার অত্যাচার বা কষ্ট না দেন।
  • দেশীয় আইনে যদি বন্য পাখি ধরে পোষা নিষিদ্ধ হয়, তবে তা মানবেন।

✖ তবে যদি পাখিটি খুব ছোট থাকে এবং মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে তা অধিক সওয়াবের কাজ হবে। আর পাখির খাঁচায় রাখাটা যদি আপনার জন্য বোঝা হয়ে যায় বা পাখির স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়, তবে তাকে মুক্ত করে দেওয়া উত্তম।

কবুতর, টিয়া ও শালিক পাখির বিধান: সবই জায়েজ, তবে যত্ন ও দায়িত্বশীলতা আবশ্যক।

*আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়ালু ও সচেতন হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.