সুদী ব্যাংকে ডাটা কালেকশনের কাজ কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমাদের দেশে ইসলামিক ব্যবস্থা সম্পন্ন ব্যাংক নেই তো তার কারণে আমাদের প্রয়োজনের জন্য আমাদের দেশে যে সমস্ত ব্যাংক আছে সেই ব্যাংকেই একাউন্ট খুলতে হয়। যেহেতু আমাদের দেশে এই সমস্ত কোন ইসলামিক ব্যবস্থা সম্পন্ন ব্যাংক নেই তাই আমরা দেশের নিয়ম অনুযায়ী যে সমস্ত ব্যাংকগুলো আছে সেই ব্যাংকে একাউন্ট খুলতে পারি কিন্তু আমাদের কোন সুদ নেওয়া চলবে না। আমি যতটুকু জানি যে সুদ নেয় যে সুদ দেয় এবং যে সুদের সাক্ষী থাকে তারা সবাই সমপরিমাণ গুনাহ কারি। তো সেই হিসাব মতোই বলা হয় যে ব্যাংকের যে কোন পরিমাণ কাজ চলবে না সেটা যদি ঝাড়ু দেয়ার কাজ হয়ে থাকে সেটাও চলবে না। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে যে আমাদের যেহেতু বাধ্য হয়ে ব্যাংক একাউন্ট খুলতে হচ্ছে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার জন্য তো এই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে একটা মানুষের সমস্ত রকম ডেটার প্রয়োজন হয়। এই সমস্ত ডাটা কালেক্ট করার কাজ যদি আমি বাড়িতে থেকে করে থাকি তাহলে সেই কাজ কি করা জায়েজ হবে।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো: আপনি বাধ্য হয়ে একটি প্রচলিত (সুদী) ব্যাংকে একাউন্ট খুলেছেন এবং এখন সেই ব্যাংকের জন্য বাড়ি থেকে ডাটা কালেকশনের কাজ করছেন। এই কাজটি কি জায়েজ?
উত্তর: না, এই কাজ জায়েজ নয়। সুদী ব্যাংকের যেকোনো কাজ—তা ডাটা এন্ট্রি, ডকুমেন্টেশন, কাস্টমার তথ্য সংগ্রহ, অফিস সহায়ক, বা অন্য যে কাজই হোক—তা সরাসরি সুদী কারবারকে সহায়তা করার শামিল। আর সুদকে সহায়তা করাও সুদের মতোই হারাম ও গুনাহের কাজ।
দলিল ও হানাফি কিতাবের উদ্ধৃতি
১. পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَأَحَلَّ اللّٰهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا" “আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয় হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)
২. হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"لَعَنَ اللّٰهُ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ" “আল্লাহ তাআলা লানত করেছেন সুদখোরকে, সুদদাতাকে, সুদের লেখককে এবং সুদের দুই সাক্ষীকে। আর তিনি বলেছেন: তারা সবাই সমান (অপরাধী)।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৫৯৮)
এখানে ‘লেখক’ ও ‘সাক্ষী’ বলতে কেবলমাত্র লিখিত চুক্তি বা সাক্ষ্য দেয়াকেই বোঝায় না; বরং সুদী কারবারের সঙ্গে যুক্ত যেকোনো সহায়ক কাজও এর অন্তর্ভুক্ত। (শরহু মায়ানিল আসার, ইমাম তাহাবী; রদ্দুল মুহতার, ৫/১৭১)
৩. ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে বলেন:
"يَحْرُمُ عَلَى الْمُسْلِمِ أَنْ يَعْمَلَ فِي بَنْكٍ رِبَوِيٍّ بِأَيِّ صِفَةٍ كَانَتْ، لِأَنَّهُ يُعِينُ عَلَى الرِّبَا" “মুসলিমের জন্য কোন সুদী ব্যাংকে যে কোনো পদে কাজ করা হারাম, কারণ তা সুদে সহায়তা করা।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫)
৪. ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী) তে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
“কোন সুদী ব্যাংকে বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করা—তা কেরানী, হিসাবরক্ষক, ডাটা অপারেটর, বা অন্য যে পদই হোক—সবই হারাম, কারণ প্রতিষ্ঠানটির মূল কারবার সুদের উপর ভিত্তি করে এবং এর সবকিছুই সুদকে সাহায্য করে।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৪৫)
৫. ফাতাওয়া আলমগীরী (হিন্দিয়া) তে এসেছে:
“যে ব্যক্তি সুদী লেনদেনের কাগজপত্র লেখে বা সেগুলি সংগ্রহ করে, বা কোনোভাবে সুদী কারবারে সাহায্য করে, সে-ও লানতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৩/২২০)
আপনার কাজের প্রসঙ্গে
আপনি যে ‘ডাটা কালেক্ট’ করেন—অর্থাৎ ব্যাংকের গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেন—তা সরাসরি ব্যাংকের ব্যবসায়িক কাজের অংশ। এ তথ্য ব্যাংক ব্যবহার করে গ্রাহকদের সুদী লেনদেন বা সেবা প্রদান করে। ফলে আপনি সুদী কারবারের ‘মাধ্যমে’ বা ‘সহায়ক’ হিসাবে কাজ করছেন। হাদীসের আলোকে তা জায়েজ নয়।
বাধ্য হওয়া (দারুরাহ) এর বিধান
প্রশ্নে আপনি বলেছেন, ব্যাংক একাউন্ট খুলতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু আপনার কাজটি জীবিকা নির্বাহের জন্য বাধ্যতামূলক কি না, তা স্পষ্ট নয়। শুধু ‘সুবিধা’ বা ‘প্রয়োজন’-এর জন্য কাজ করা দারুরাহ নয়। দারুরাহ (জরুরি অবস্থা) এমন অবস্থাকে বলে যেখানে কোনো হালাল উপায় না থাকায় জীবন রক্ষা বা চরম বিপদ এড়াতে হারাম গ্রহণ করতে হয়। আপনার ক্ষেত্রে ডাটা কালেকশনের কাজ কি একমাত্র উপায়? যদি অন্য হালাল কাজের সুযোগ থাকে, তবে এ কাজ করা বৈধ হবে না। আর যদি সত্যিই কোনো হালাল রিযকের বিকল্প না থাকে, তবে শুধু প্রয়োজন পরিমাণ কর্তৃক কাজ করা যেতে পারে, তবে সর্বদা হালাল উপায় খোঁজা আবশ্যক।
সতর্কতা
যেহেতু আপনার দেশে কোনো ইসলামী ব্যাংক নেই, তাই ব্যাংক একাউন্ট খোলা বাধ্যতামূলক হতে পারে (চাকরি, টাকা জমা, সরকারি লেনদেন ইত্যাদির জন্য)। কিন্তু সেই ব্যাংকে কাজ করা ভিন্ন বিষয়। একাউন্ট খোলা ও ব্যবহারের সময় সুদ স্পর্শ না করে কেবল প্রয়োজনীয় লেনদেন করলে তা নিয়ে বিশেষ আলোচনা আছে। কিন্তু কাজ করে ব্যাংকের মুনাফায় সহায়তা করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
নির্দেশনা
- আপনি এই ডাটা কালেকশনের কাজ ছেড়ে দিন।
- হালাল উপায়ে আয় করার চেষ্টা করুন। যেমন: অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং, হালাল ট্রেডিং, ছোট ব্যবসা, বা অন্য কোনো আইনি ও শরিয়তসম্মত কাজ।
- যদি বর্তমানে অন্য কাজ পাওয়া কঠিন হয়, তবে ধীরে ধীরে হালাল কাজের সন্ধান করুন এবং ততদিন তওবা ও ইসতিগফার করুন।
উপসংহার
সুদের সাথে যুক্ত ব্যাংকের ডাটা কালেকশনের কাজ করা জায়েজ নয়। এটি সুদী কারবারকে সাহায্য করার শামিল, যা কুরআন-হাদীসে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তাই উক্ত কাজ ত্যাগ করা আবশ্যক।
والله أعلم بالصواب