গায়রে মাহরামের সাথে কথা বলা জায়েজ হবে কি না?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 3058
Questioner: Fatema Khatun
Question Asked: 24 Jul 2026, 12:23 AM
Reviewed & Published: 24 Jul 2026, 02:05 AM
Views: 3
Tokens: 3,957
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিবাহের পূর্বে পাত্রের আখলাক এবং চিন্তাভাবনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য তার সাথে মেসেজে বা কলে কথা বলা জায়েজ হবে কি না? শরই সাক্ষাতের সময় প্রশ্ন করা হলেও যদি আরও কোনো প্রশ্ন থেকে যায় সেক্ষেত্রেও জায়েজ হবে কি না?

Answer

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين

বিবাহের পূর্বে পাত্র-পাত্রীর পরস্পরের সাথে কথা বলা বা যোগাযোগ করা জায়েয কিনা—এ বিষয়ে ইসলামী শরী‘আহর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মূলনীতি হলো, অমাহরাম নারী-পুরুষের মধ্যে কথা বলা সাধারণত নিষিদ্ধ যদি তা কোনো প্রকারের ফিতনার আশঙ্কা থাকে বা শরী‘আতের সীমা লঙ্ঘন করে। তবে বিবাহের প্রস্তাব (খাসবাত) চলাকালে পাত্র-পাত্রীর একে অপরকে দেখা বা প্রয়োজনীয় বিষয়ে কথা বলা জায়েয, তবে তা নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে।

১. পাত্র-পাত্রীর মধ্যে কথোপকথনের ক্ষেত্রে ইসলামী বিধান

বিবাহের আগে পাত্র-পাত্রীর একে অপরের সম্পর্কে জানাটা জরুরি, কিন্তু তা অবশ্যই শরী‘আহর সীমার মধ্যে হতে হবে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ
“আর যখন তোমরা তাদের (নারীদের) কাছে কিছু চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।” (সূরা আহযাব: ৫৩)

এই আয়াতের মাধ্যমে সাধারণভাবে অমাহরাম নারীর সাথে কথা বলার সময় পর্দা ও সীমা বজায় রাখার নির্দেশ রয়েছে। হাদীসেও এসেছে:

لا يخلون رجل بامرأة إلا مع ذي محرم
“কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে নির্জনে না মিলিত হয়, যদি না তার সাথে কোনো মাহরাম থাকে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫২৩৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৩৪১)

এই হাদীস থেকে স্পষ্ট যে, নির্জনতা (খালওয়াত) নিষিদ্ধ। তবে প্রয়োজনে পর্দা রেখে, দ্বীনদার ব্যক্তির উপস্থিতিতে কথা বলা জায়েয।

হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, বিবাহের প্রস্তাবের সময় পাত্রীর চেহারা ও হাতের পাতা দেখা জায়েয, এবং প্রয়োজনে কথাও বলা যেতে পারে। তবে তা শুধুমাত্র দ্বীন ও চরিত্র সম্পর্কে জানার জন্য সীমাবদ্ধ থাকতে হবে, এবং কোনো প্রকারের আকর্ষণ বা ফিতনার আশঙ্কা থাকলে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে বলেন:

يجوز للخاطب أن ينظر إلى مخطوبته من غير نظر إلى عورة، وأن يتكلم معها بقدر الحاجة مما يتعلق بالخطبة
“পাত্রের জন্য তার পাত্রীর দিকে (সতর ব্যতীত) দেখা জায়েয, এবং প্রয়োজনের পরিমাণ বিবাহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তার সাথে কথা বলা জায়েয।” (রদ্দুল মুহতার, ৪/২৪৪)

এছাড়া ফতোয়ায়ে উসমানী ও ইমদাদুল ফাতাওয়াতেও একই রকম নির্দেশনা রয়েছে।

২. মেসেজ বা ফোনে কথোপকথন

শরী‘আতে মূলনীতি হলো, যেখানে ফিতনার আশঙ্কা থাকে, সেখানে সকল প্রকার যোগাযোগই নিষিদ্ধ। মেসেজ বা ফোন কলও এর ব্যতিক্রম নয়। যদি মেসেজ বা ফোনে পর্দার সীমা রক্ষিত না হয়, বা কথাবার্তা অনর্থক হয়, বা প্রলোভনের সৃষ্টি হয়, তবে তা জায়েয নয়। কিন্তু নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ করলে ফোন বা মেসেজে প্রয়োজনীয় আলোচনা করা জায়েয বলে ইমামগণ অনুমতি দিয়েছেন:

  • যে কোনো প্রকারের আসক্তি বা প্রেম-প্রণয়ের সৃষ্টি না হয়।
  • কথা শুধুমাত্র বিবাহ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
  • কোনো পক্ষই উত্তেজক বা আকর্ষণীয় ভাষা ব্যবহার করবে না।
  • কলে কথা বললে একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত দীর্ঘ সময় ও অহেতুক আড্ডা না হয়।
  • পাত্রী যদি মেয়ে হয়, তাহলে তার জন্য পরপুরুষের সাথে আকর্ষণীয় কণ্ঠে কথা বলা নিষিদ্ধ। কুরআনে ইরশাদ:

فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ
“তোমরা নরম ও কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, যেন ঐ ব্যক্তি যার অন্তরে রোগ আছে, সে প্রলুব্ধ হয়।” (সূরা আহযাব: ৩২)

সুতরাং, প্রয়োজনীয় আলোচনার জন্য স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ ভাষায় কথা বলা জায়েয, তবে শর্তসাপেক্ষে। ইমাম শাফি‘ঈ (রহ.)-এর মতে এরূপ যোগাযোগ মাকরূহ, কিন্তু হানাফী মতে জরুরতের কারণে জায়েয।

৩. শর‘ঈ সাক্ষাতের পরও যদি প্রশ্ন থেকে যায়

বিবাহের উদ্দেশ্যে শরী‘আতসম্মত সাক্ষাতের (যেখানে মাহরামের উপস্থিতি ও পর্দা বজায় থাকে) সময় প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা জায়েয। এরপরও যদি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে সেগুলোও একই শর্তে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে, তবে তা শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় এবং শরী‘আহর সীমার মধ্যে হতে হবে। অহেতুক প্রশ্ন বা কথাবার্তা জায়েয নয়।

হানাফী ফকীহগণের নির্দেশনা

আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর ‘বেহেশতী জেওর’-এ বলেন:

“বিবাহের আগে পাত্র-পাত্রীর দেখা-সাক্ষাৎ জায়েয আছে, কিন্তু তা দ্বীন ও চরিত্র জানার জন্য হতে হবে। আর কোথাও একা দেখা-সাক্ষাৎ মোটেই জায়েয নয়।” (বেহেশতী জেওর, ২য় ভাগ)

মুফতি তাকী উসমানী (দা. বা.)-এর ফতোয়াতেও অনুরূপ বিধান এসেছে। তিনি লেখেন:

“বিবাহের আগে পাত্র-পাত্রীর মধ্যে যোগাযোগ কেবলমাত্র জরুরি প্রয়োজনে এবং তিনিঁর মাহরামের উপস্থিতিতে জায়েয। ফোন বা মেসেজে কথাবার্তা শুধু সীমিত পরিমাণে, প্রয়োজনীয় বিষয়েই হতে পারে।” (আওরাকুন মুনতাখাবা, ফতোয়া নং: ৪৮৮)

সারসংক্ষেপ:

  • বিবাহের আগে পাত্র-পাত্রীর চরিত্র, দ্বীন ও চিন্তাভাবনা সম্পর্কে জানা জরুরি।
  • শরী‘আত এ জন্য দেখা-সাক্ষাৎ ও কথোপকথনের অনুমতি দিয়েছে, তবে তা অবশ্যই পর্দার সীমা, মাহরামের উপস্থিতি ও অপ্রয়োজনীয় ফিতনা থেকে মুক্ত হতে হবে।
  • মেসেজ বা ফোনে কথা বলার সময়ও একই শর্ত প্রযোজ্য। অহেতুক বা অনর্থক আলোচনা, কোমল কণ্ঠে কথা ইত্যাদি নিষিদ্ধ।
  • শর‘ঈ সাক্ষাতের পর যদি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে তা জিজ্ঞাসা করা জায়েয, তবে শর্তের মধ্যে থেকে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে শরী‘আতের সীমার মধ্যে জীবন পরিচালনার তাওফীক দিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.