গয়না বন্ধক বিষয়ে
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষাপট বুঝতে পেরেছি। আগামী এক মাস পর আপনার সিজার সার্জারি হবে, কিন্তু অর্থ জোগাড় করতে পারছেন না। তাই স্বামী ও আপনি মিলে পরিকল্পনা করছেন যে, কিছু গয়না বন্ধক (প্যান) রেখে গয়নার দোকান থেকে টাকা নিয়ে সিজার করাবেন। কিন্তু সমস্যা হলো, গয়নাদোকান থেকে বন্ধক রেখে টাকা নিতে চাইলে প্রতি মাসে সুদসহ টাকা দিতে হয়। এমন অবস্থায় এই লেনদেন জায়েজ হবে না।
ইসলামের দৃষ্টিতে সুদের বিধান:
ইসলামে সুদ (রিবা) স্পষ্টভাবে হারাম। কুরআন ও হাদিসে সুদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
এছাড়া সুদী লেনদেনের সাথে জড়িত হওয়া, দেওয়া-নেওয়া, লেখা-সাক্ষী থাকা সবই পাপের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"সুদ খাওয়া, খাওয়ানো, লেখা ও তার সাক্ষী থাকা—সবাই লানত (অভিশাপ) প্রাপ্ত।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)
বন্ধক রেখে সুদে টাকা নেওয়া (গয়না প্যান):
আপনি যখন গয়না বন্ধক রেখে টাকা নিচ্ছেন এবং শর্ত হিসেবে সুদ দিতে রাজি হচ্ছেন, তখন এটি সুদী লেনদেন-এ পরিণত হবে। ইসলামে বন্ধক রাখা জায়েজ, কিন্তু বন্ধক রেখে টাকা নিলে তা ঋণ হিসেবেই গণ্য হবে। ঋণের বিনিময়ে কোনো প্রকার বাড়তি টাকা আদায় করা (সুদ) সম্পূর্ণ হারাম।
- ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, আপনি যদি গয়না বন্ধক রাখেন, তাহলে গয়না আপনার কাছে আমানত (বা জিম্মাদারি) হিসেবে থাকবে, কিন্তু দোকানদার যদি সুদ নেয়, তাহলে তা রিবা। আপনি যদি জরুরি অবস্থায়ও সুদ দেন, তবুও তা হারাম থেকে যাবে।
জরুরত (প্রয়োজন) ও সুদের ব্যতিক্রম:
আপনার অবস্থা খুবই সংকটজনক—এক মাস পর সিজার, আর আপনার হাতে পর্যাপ্ত টাকা নেই। ইসলামে জরুরতের সময় কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়, কিন্তু সুদ কোন জরুরতেই জায়েজ হয় না, যদি না জীবন-মরণের সঙ্কট হয় এবং অন্য কোনো হালাল উপায় না থাকে। আপনার বর্তমান অবস্থা (এক মাস পর সিজার) আগাম পরিকল্পিত, তাৎক্ষণিক প্রাণনাশক নয়, তাই আপনি অন্য হালাল উপায় অনুসন্ধান করতে পারেন।
ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) বলেন:
"রোগী বা অত্যাবশ্যক প্রয়োজনে সুদ নেওয়া জায়েজ নয়, বরং অন্য কোনো হালাল পথ খোঁজতে হবে।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/২৫০)
কী করবেন? (বিকল্প পরামর্শ):
১. আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের কাছে সাহায্য চাওয়া: ইসলামে ঋণ নেওয়া (কারজে হাসানা) অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। আপনি বা আপনার স্বামী আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী বা পরিচিতদের কাছে সুদমুক্ত ঋণ চাইতে পারেন। 2. কিস্তিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা: অনেক হাসপাতালে কিস্তিতে চিকিৎসা করানোর সুযোগ থাকে। সেখানে কথা বলে দেখা যেতে পারে। 3. দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা সহায়তা: কিছু ইসলামি চ্যারিটি বা সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা করে। তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। 4. স্বামীর কাজকর্ম: যদি সময় থাকে, তাহলে স্বামী কিছু বাড়তি কাজ করে অর্থ জোগাড় করতে পারেন। 5. সামাজিক মিডিয়ায় সাহায্য চাওয়া: সৎ উদ্দেশ্যে সাহায্য চাইলে অনেকে সাড়া দেন, তবে সতর্ক থাকবেন। 6. ইসলামি ব্যাংক বা সংস্থা: কোনো ইসলামি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি সুদমুক্ত ঋণ (মুরাবাহা, ইজারা ইত্যাদি) প্রদান করে, তাহলে তা গ্রহণ করতে পারেন।
রেফারেন্স (হানাফি কিতাব):
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৪/২৫০): "বন্ধক রেখে টাকা নেওয়া জায়েজ, তবে সুদ নেওয়া বা দেওয়া হারাম।"
- রদ্দুল মুহতার (৪/২৫০): "জরুরতের সময় সুদ নেওয়া জায়েজ হয় না, যদি অন্য কোনো হালাল পথ থাকে।"
- ফাতাওয়া উসমানি (৩/৫১২-৫১৩): "সুদী লেনদেন সকল অবস্থায় হারাম, প্রয়োজনে বিকল্প হালাল পথ সন্ধান করতে হবে।"
সংক্ষেপে উত্তর:
গয়না বন্ধক রেখে সুদে টাকা নেওয়া জায়েজ নয়। এটি সুদী লেনদেন, যা ইসলামে হারাম। সিজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও আপনি হালাল উপায়ে অর্থ জোগাড় করার চেষ্টা করুন। অন্য কোনো হালাল পথ না পেলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান, আর দোয়া করুন। আল্লাহ কখনো বান্দাকে অসহায় রাখেন না।
আল্লাহ তাআলা আপনার সিজার ও সন্তান প্রসব সহজ করুন। আমীন।