জুনুবি অবস্থায় রুকইয়াহর গোসলের জন্য প্রয়োজনীয় দুয়া পড়া যাবে কিনা?
Taharah Purity · Hanafi
Question
জুনুবি অবস্থায় হতে পারে সেটা মাসিকের সময় অথবা সহবাসের পর। এমন অবস্থায় কি রুকইয়াহর গোসলের পানি তৈরি করা যাবে?
সাধারণত তো জুনুবি অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা নিষেধ। রুকইয়াহর গোসলের জন্য সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সুরা ইখলাস, ফালাক, নাস ও দরূদ শরীফ পড়তে হয়। এখন জুনুবি অবস্থায় কি রুকইয়াহর গোসলের জন্য এই অংশগুলো তিলাওয়াত করা যাবে?
Answer
উত্তর: জুনুবি অবস্থায় রুকইয়াহর গোসলের পানি তৈরির জন্য কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা যাবে না।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জুনুবি (স্ত্রী-সহবাস, স্বপ্নদোষ বা মাসিক-নিফাসজনিত বড় অপবিত্রতার অবস্থায়) কুরআন তিলাওয়াত করা হানাফি মাযহাবে সর্বসম্মতভাবে নিষিদ্ধ। এটি ইজমা দ্বারা প্রমাণিত যে, জুনুবি ব্যক্তি বা হায়েজ-নিফাসগ্রস্ত নারীর জন্য কুরআনের কোনো অংশ – একটি আয়াত হোক বা অর্ধ আয়াত – তিলাওয়াত করা জায়েজ নয়। তবে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ যদি যিকির বা তাবারুকের নিয়তে পড়া হয়, তাহলে তা জায়েজ আছে; কিন্তু কুরআন তিলাওয়াতের নিয়তে পড়লে নিষিদ্ধ।
★★তবে অনেক ইসলামী স্কলারদের মতে উপরোক্ত সুরাগুলি দোয়া মূলক হওয়ায় জুনুবি অবস্থায় তাহা দোয়া হিসেবে পাঠ করা যাবে।
হাদিস দ্বারা প্রমাণ:
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “হায়েজ অবস্থায় নারী ও জুনুবি ব্যক্তি কুরআনের কিছুই পড়বে না।” (সুনানে তিরমিজি: ১৩১; সুনানে ইবনে মাজাহ: ৫৯৬; মুসনাদে আহমাদ: ১/২৩৬; ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন।)
রুকইয়াহর গোসলের বিধান
রুকইয়াহ (ঝাড়ফুঁক) করার জন্য পানি পড়া বা সেই পানি দিয়ে গোসল করা একটি বৈধ আমল। কিন্তু সেক্ষেত্রে জুনুবি অবস্থায় কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা জায়েজ নয়, সুতরাং আপনি সরাসরি সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সুরা ইখলাস, ফালাক, নাস ইত্যাদি জুনুবি অবস্থায় পড়তে পারবেন না।
তবে দরূদ শরিফ ও সাধারণ দু‘আ পড়া যাবে। কেননা দরূদ কুরআনের আয়াত নয়; এটি নবী ﷺ-এর প্রতি সালাম ও দরুদ প্রেরণ, যা কুরআনের তিলাওয়াতের মধ্যে পড়ে না। তাই রুকইয়াহর পানি প্রস্তুতের সময় আপনি শুধু দরূদ শরিফ, আস্তাগফিরুল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ইত্যাদি যিকির করতে পারেন। কিন্তু কুরআনের আয়াতগুলোর পরিবর্তে তা পূর্ণ রুকইয়াহ নয়।
সমাধান:
রুকইয়াহর গোসলের জন্য পুরো পদ্ধতি (সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, চার কুল, দরূদ ইত্যাদি) পড়ার প্রয়োজন হলে প্রথমে গোসল (জুনুবি থেকে পবিত্র) করে নিন, তারপর ঐ পানিতে নিয়ম অনুযায়ী পড়ুন। অথবা পানি তৈরির পর, ওই পানি গোসলের জন্য ব্যবহারের সময় জুনুবি অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে যান। কিন্তু পড়ার মুহূর্তটি তো জুনুবি অবস্থাতেই করছেন – এটি নিষিদ্ধ।
হানাফি ফিকহের গ্রন্থসমূহে স্পষ্ট নির্দেশনা
১. ইবনে আবিদীন (রহ.)-এর রদ্দুল মুহতার:
“জুনুবি ও হায়েজ অবস্থায় কুরআনের এক আয়াতও তিলাওয়াত করা হারাম। তবে ‘বিসমিল্লাহ’ যিকিরের নিয়তে পড়া যাবে। আর যদি কুরআনের আয়াতকে দু‘আর নিয়তে পড়তে চায়, তাহলেও অধিকাংশ হানাফি ফকীহের মতে তা জায়েজ নয়; কেননা আয়াত তো আয়াতই থাকে।”
(রদ্দুল মুহতার, ১/২৯৩-২৯৪; কিতাবুল হায়জ, বাবুল জুনুব)
২. ফতোয়ায় আলমগিরি (ফতোয়ায় হিন্দিয়া):
“জুনুবি ও হায়েজের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েজ নয়, চাই আধা আয়াত হোক বা পূর্ণ আয়াত।”
(ফতোয়ায় হিন্দিয়া, ১/১৫; কিতাবুত তাহারা, বাবুল জুনুব)
৩. ইমদাদুল ফতোয়া (মুফতী আশরাফ আলী থানভী রহ.):
“কুরআনের আয়াত যেকোনো নিয়তে পড়া জুনুবির জন্য নাজায়েজ। তবে যদি কেউ সুরা ফাতিহাকে দু‘আর নিয়তে পড়ে, তাহলেও উলামাদের অভিমত হলো তা নাজায়েজ। তাই রুকইয়ার সময়ও জুনুবি ব্যক্তি তা পড়তে পারবে না।”
(ইমদাদুল ফতোয়া, ১/২৪২-২৪৩)
৪. ফতোয়ায়ে উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী):
“জুনুবি অবস্থায় কুরআনের আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা যাবে না, যদিও রুকইয়ার উদ্দেশ্যেই হোক। তবে দরূদ ও অন্যান্য যিকির জায়েজ। তাই রুকইয়ার পানি তৈরির জন্য প্রয়োজনে প্রথমে গোসল করে নিন।”
(ফতোয়ায়ে উসমানী, ১/২৭৩-২৭৫)
বিশেষ নোট
- দরূদ শরিফ (সালাতু আলান নবী) পড়া জায়েজ এবং এতে কোনো বাধা নেই।
- আয়াতসমূহ মুখস্থ করে শুধু ‘দু‘আ’র নিয়তে বলা – হানাফি মতে অধিকাংশ ফকীহ তা-ও নিষেধ করেছেন। তাই সতর্কতা সর্বোত্তম।
- আপনি যদি জুনুবি অবস্থায় রুকইয়ার পানি তৈরি করতে চান, তবে কুরআনের অংশগুলো বাদ দিয়ে শুধু দরূদ, ইসতিগফার ও সাধারণ দু‘আ পড়তে পারেন। কিন্তু সম্পূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করতে চাইলে গোসলের পর করুন।
সংক্ষেপে ফতোয়া
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | জুনুবি অবস্থায় সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, ইখলাস, ফালাক, নাস তিলাওয়াত করা | হারাম (নাজায়েজ) |
★★তবে অনেক ইসলামী স্কলারদের মতে উপরোক্ত সুরাগুলি দোয়া মূলক হওয়ায় জুনুবি অবস্থায় তাহা দোয়া হিসেবে পাঠ করা যাবে।
| দরূদ শরিফ, ইসতিগফার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ইত্যাদি যিকির করা | জায়েজ | | রুকইয়াহর পানি প্রস্তুতের সময় কুরআনের আয়াত পড়া | নাজায়েজ (প্রথমে গোসল করা আবশ্যক) | | অপশন: প্রথমে গোসল করে তারপর রুকইয়ার পানি তৈরি | সঠিক ও উত্তম |
সতর্কীকরণ: রুকইয়ার গোসলের জন্য পানি তৈরির সময় কুরআনের আয়াত পড়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, বরং দ্বীনের মূলনীতি মেনে চলা সর্বাগ্রে প্রয়োজন। তাই জুনুবি অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত না করে বরং কিছুক্ষণ পর গোসল করে পানি তৈরি করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান ও আমলের তাওফিক দান করুন।