নারী শিক্ষা
Miscellaneous Fiqh · Shafei
Question
Answer
উত্তর: বাংলাদেশের একটি মহিলা কলেজে ইংরেজি বিভাগে অনার্স করা এবং প্রয়োজনীয় ছবি তোলার বিধান (শাফেঈ মাযহাব অনুযায়ী)
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
প্রশ্নকারিণী জানতে চেয়েছেন— তিনি যদি বাংলাদেশের একটি মহিলা কলেজে ইংরেজি বিভাগে অনার্স পড়তে চান, যেখানে কিছু পুরুষ শিক্ষক আছেন এবং বিভিন্ন কাগজপত্রের জন্য মুখ খোলা রেখে ছবি দিতে বাধ্য হন, তাহলে শরী‘আতের দৃষ্টিতে তা জায়িয হবে কিনা।
উত্তর:
শাফেঈ মাযহাবের মূলনীতি ও প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহের (আল-উম্ম, আল-মাজমূ‘, মিনহাজ আত-তালিবীন, মুগনী আল-মুহতাজ, নিহায়াত আল-মুহতাজ, ফাতহ আল-মু‘ঈন, তুহফাত আল-মুহতাজ) আলোকে নিম্নোক্ত শর্তসমূহ সাপেক্ষে উক্ত বিষয়টি জায়িয ও বৈধ হবে:
১. পুরুষ শিক্ষকের উপস্থিতি ও শিক্ষাদান
-
শাফেঈ মাযহাবে অমহরম পুরুষের সামনে মহিলার জন্য পুরো শরীর ঢেকে রাখা ওয়াজিব (ফরয) — শুধু চেহারা ও দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত ইখতিলাফী। তবে ফিতনার যুগে অধিকাংশ শাফেঈ উলামা (যেমন ইমাম নববী, ইবনে হাজার হায়তামী, রামলী) এ মত পোষণ করেন যে, চেহারা ঢেকে রাখা ওয়াজিব যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে। (আল-মাজমূ‘ ৪/২৮০; মুগনী আল-মুহতাজ ৩/১৩১)
-
পুরুষ শিক্ষকের কাছে শিক্ষা গ্রহণ জায়েয, যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হয়:
- খলওয়াত (একান্তে সাক্ষাৎ) না হয় — অর্থাৎ ক্লাসে অন্যান্য ছাত্রী বা তৃতীয় ব্যক্তি উপস্থিত থাকবে।
- শিক্ষিকা বা ছাত্রী পুরুষের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বা স্পর্শ পরিহার করবেন।
- দৃষ্টি নিচু রাখা এবং প্রয়োজনীয় আলোচনা সীমিত রাখা।
- পর্দা ও শালীনতার সব নিয়ম মেনে চলা (মাথা, ঘাড়, বুক, পিঠ, পা ইত্যাদি সম্পূর্ণ আবৃত)।
-
শাফেঈ মাযহাবের কিতাবসমূহে এসেছে যে, প্রয়োজনের তালীম (শিক্ষাদান) ও তাল্লুম (শিক্ষাগ্রহণ) জায়েয যদি ফিতনা নিরাপদ থাকে। (নিহায়াত আল-মুহতাজ ৩/২২২; তুহফাত আল-মুহতাজ ৯/৪১১)
-
মহিলা কলেজ হবার কারণে পুরুষ শিক্ষকের সাথে সরাসরি মিশতে হবে না — ক্লাসরুমে পর্দার ব্যবস্থা থাকলে বা দূর থেকে শিক্ষাদান করলে তা উত্তম। যদি এছাড়া উপায় না থাকে, তবে ইচ্ছাকৃত ফিতনা সৃষ্টি না হলে জায়েয।
২. প্রয়োজনীয় ছবি তোলা (মুখ খোলা রেখে)
- শাফেঈ মাযহাবে প্রাণীর ছবি আঁকা বা তোলা সাধারণত নিষিদ্ধ (হারাম), তবে প্রয়োজনের তাগিদে জায়েয — যেমন পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষার্থী আইডি, ভিসা ইত্যাদি সরকারি বাধ্যতামূলক নথির জন্য ছবি তোলা। (আল-মাজমূ‘ ২/২২৫; মুগনী আল-মুহতাজ ৯/২৪৫)
- ছবি তোলার সময় চেহারা খোলা বাধ্যতামূলক হলে তা জরুরত (দারূরা) হিসাবে গণ্য হবে। শাফেঈ মাযহাবে জরুরতের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ বিষয় সাময়িকভাবে হালাল হয়ে যায়। (নিহায়াত আল-মুহতাজ ৮/৪২৮)
- তবে শর্ত হলো:
- এই ছবি শুধু প্রয়োজনীয় কাজেই ব্যবহার করতে হবে — অযথা প্রকাশ বা প্রদর্শন নয়।
- ছবি তোলার সময় পুরুষ ফটোগ্রাফার থাকলে পর্দা মেনে চলতে হবে — অর্থাৎ শুধু চেহারা ছাড়া অন্য অঙ্গ না দেখা।
- মহিলা ফটোগ্রাফার থাকা উত্তম, কিন্তু না থাকলেও ছবি তোলা জায়েয যদি বাধ্য হন।
৩. লেখাপড়ার প্রয়োজনীয়তা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়
- ইসলাম শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে, বিশেষত দ্বীন ও দুনিয়ার প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন। ইংরেজি বিভাগ একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ উপার্জন ও সমাজসেবার জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে।
- তবে শিক্ষা গ্রহণের সময় কোনো নারী যেন গুনাহের কাজে লিপ্ত না হন — যেমন অহেতুক মেকআপ করা, অশ্লীল পোশাক পরা, বা বেগানা পুরুষের সাথে নির্লজ্জ আচরণ করা।
- সম্ভব হলে মহিলা শিক্ষক ও নারী পরিবেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা উত্তম। কিন্তু যদি অল্পসংখ্যক পুরুষ শিক্ষকের উপস্থিতি ছাড়া কোনো বিকল্প না থাকে, এবং পর্দার শর্তগুলো পূর্ণ হয়, তাহলে তা জায়েয।
৪. একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক বার্তা
- ফিতনার আশঙ্কা থাকলে (যেমন নিজের অন্তরে অনৈতিক আকর্ষণ বা পুরুষ শিক্ষকের আচরণে সমস্যা) তখন সেই পরিবেশ এড়িয়ে যাওয়া ওয়াজিব। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমরা আল্লাহর নিষিদ্ধ সীমার কাছেও যেও না।” (বুখারী ৫২, মুসলিম ২২৯৭)
- ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন: “যদি ফিতনার ভয় থাকে, তবে অমহরম নারীর চেহারার দিকে তাকানো হারাম, এমনকি পর্দার ভিতরেও।” (শরহে মুসলিম ৪/২২২)
সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত:
-
পারবেন — যদি নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূর্ণ করেন:
- সম্পূর্ণ শর‘ঈ পর্দা মেনে চলবেন (চেহারা সহ — অধিকাংশ শাফেঈ উলামার মতে ফিতনার যুগে চেহারা ঢেকে রাখা ওয়াজিব)।
- পুরুষ শিক্ষকের সাথে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা, নির্জনতা, বা নরম কথা বলা থেকে বিরত থাকবেন।
- ছবি তোলা শুধু জরুরী কাগজের জন্য সীমাবদ্ধ রাখবেন, এবং ছবি তুলতে বাধ্য হলে শুধু চেহারা খুলবেন, বাকি পর্দা বজায় রাখবেন।
- নিজের ঈমান ও আত্মসংযম অটুট রাখার চেষ্টা করবেন এবং নিয়মিত তাওবা ইস্তিগফার করবেন।
-
আর উত্তম হলো: মহিলা শিক্ষক ও নারী পরিবেশে শিক্ষাগ্রহণ করা। যদি সম্ভব হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে স্থানান্তর করা ভালো। তবে বাধ্য হয়ে পুরুষ শিক্ষক গ্রহণ করলে উপরোক্ত শর্ত মেনে চলতে হবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ এবং তিনিই তাওফীক দাতা।
সূত্র:
- ইমাম শাফেঈ, আল-উম্ম (১/২২৫, ৩/১৩০)
- ইমাম নববী, আল-মাজমূ‘ (৪/২৮০, ২/২২৫)
- ইমাম রাফি‘ঈ, ফাতহ আল-আযীয (শরহে ওয়াজীয)
- ইবনে হাজার হায়তামী, তুহফাত আল-মুহতাজ (৯/৪১১, ৯/২৪৫)
- শামসুদ্দীন রামলী, নিহায়াত আল-মুহতাজ (৩/২২২, ৮/৪২৮)
- শায়খ আব্দুল হামিদ শিরওয়ানী, হাওশী আলা তুহফা
- ইমাম জাকারিয়্যা আনসারী, আসনাল মাতালিব (১/৫০, ৪/৪২)