কালোজাদু করে এমন স্বামীকে তালাক দেওয়া কি জায়েজ?

Family Life · Hanafi

Question No: 2978
Questioner: Tamanna Aktar204
Question Asked: 21 Jul 2026, 10:25 PM
Reviewed & Published: 21 Jul 2026, 10:33 PM
Views: 14
Tokens: 5,998
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম আমাকে আমার বাবা জোর করে খারাপ লোকের কাছে বিয়ে দিয়ে জীবন নষ্ট করে ফেলছে। বিয়ের পর আমার সাথে সবসময় খারাপ ব্যবহার করছে। বিয়ের পর জানতে পারলাম সে নামাজ পরতে জানে না কালোজাদু করে। তার সাথে তার আাড়িতে থাকলে পর্দা করা সম্ভব হয় না। তাকে আমি অনেক বুজিয়েছি সে অনড়। এসব কারনে তার ৭/৮ মাস আগ থেকে সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছি এখন তালাক দিতে চাইতছি টা কী ঠিক হচ্ছে।

Answer

উত্তর: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

প্রথমেই আপনার কষ্টের কথা জানতে পেরে আমরা অত্যন্ত দুঃখিত। বাবার জোরপূর্বক বিয়ে, খারাপ ব্যবহার, নামাজ না জানা এবং কালোজাদু করার মতো গুরুতর বিষয়ে আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে চান—এটি প্রশংসনীয়। হানাফি ফিকহের আলোকে আমরা আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।


সংক্ষিপ্ত উত্তর

হ্যাঁ, এমন অবস্থায় তালাক দেওয়া বা সম্পর্ক ছিন্ন করা ঠিক ও জায়েজ। আপনার স্বামী কালোজাদু করে, নামাজ জানে না (বা আদায় করে না) এবং আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করে—এসব কারণে বিবাহিত জীবন অব্যাহত রাখা আবশ্যক নয়। বরং ইসলাম এ ধরনের ক্ষেত্রে নারীকে তালাক বা খুলা (মহিলার পক্ষ থেকে বিচ্ছেদ) নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। আপনি ইতিমধ্যে ৭/৮ মাস আলাদা থেকেছেন, এখন আইনিভাবে তালাক বা খুলা সম্পন্ন করাই উত্তম।


বিস্তারিত ফিকহি বিশ্লেষণ

১. কালোজাদু (সিহর) করার বিধান
ইসলামে কালোজাদু (সিহর) ঘোর হারাম ও কবিরা গুনাহ। অনেক ক্ষেত্রে এতে শিরক ও জিনের পূজা জড়িত থাকে, যা একজন ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দিতে পারে (কাফির)।

  • হানাফি গ্রন্থ ‘রদ্দুল মুহতার’ (৪/২৪৩) এ বলা হয়েছে: “রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জাদু করে বা জাদু করায়, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ যদি জাদুর মাধ্যমে জিনের ইবাদত বা আসমান-জমিনে কারো ক্ষমতা বিশ্বাস করে, তবে তা শিরক।”
  • ‘ফাতাওয়া উসমানি’ (২/৪১৫) এ উল্লেখ আছে: “জাদুকারী যদি শিরকে লিপ্ত হয়, তবে সে কাফির বলে গণ্য হবে এবং তার স্ত্রী তার থেকে পৃথক হয়ে যাবে।”

সুতরাং আপনার স্বামী যদি কালোজাদুতে বিশ্বাসী এবং শিরকি কাজে লিপ্ত থাকে, তাহলে সে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হিসেবে গণ্য হতে পারে। মুরতাদ স্বামীর সাথে স্ত্রীর বিবাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় (জুদা হয়ে যায়)। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে কোনো আলেমের শরণাপন্ন হওয়া উত্তম।

২. নামাজ না জানা বা না পড়ার বিধান
নামাজ ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ। যে ব্যক্তি নামাজ আদায় করে না, সে ফাসিক (গুনাহগার)। যদি সে নামাজের ফরজিয়্যাত অস্বীকার করে, তাহলে সে কাফির। আর যদি অলসতার কারণে নামাজ ছেড়ে দেয়, তবুও তা কবিরা গুনাহ। এমন ব্যক্তির সাথে স্ত্রীর থাকা কঠিন এবং তার অধিকার রক্ষা করাও কঠিন।

৩. খারাপ ব্যবহার ও পারিবারিক নির্যাতন
আপনার সাথে সর্বদা খারাপ ব্যবহার এবং পর্দা রক্ষা অসম্ভব হওয়া—এগুলো ‘সুহবাত-বিল-মা‘রূফ’ (সদাচরণ)-এর পরিপন্থী। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালো ব্যবহারের আদেশ দিয়েছে (সূরা নিসা: ১৯)। এ ধরনের নির্যাতন স্ত্রীর জন্য তালাক বা বিচ্ছেদের বৈধ কারণ।

৪. জোরপূর্বক বিয়ে
আপনার বাবা আপনাকে জোর করে বিয়ে দিলে, সেই বিয়ে হানাফি মতে শুদ্ধ?

  • যদি বিয়ে দেওয়ার সময় আপনি প্রাপ্তবয়স্কা ও সুস্থমস্তিষ্কা হন, তাহলে পিতার জোর করে বিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নেই। হানাফি ফিকহে প্রাপ্তবয়স্কা মেয়ের বিয়েতে তার সম্মতি আবশ্যক। আপনি যদি বিয়ের পর থেকে সেটি মেনে নিয়ে থাকেন (যেমন কিছুদিন সংসার করেছেন), তাহলে বিয়ে বৈধ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।
  • কিন্তু যদি আপনি প্রথম থেকেই অসন্তুষ্ট হন এবং বিয়ের পরপরই আপত্তি জানান, তাহলে বিয়ে ফাসখ (বাতিল) করানো সম্ভব। ‘ফাতাওয়া ইমদাদুল আহকাম’ ও ‘বাহিশতি জেওর’-এ উল্লেখ আছে, জোরপূর্বক বিয়ে নাজায়েজ এবং তা ফাসখ করা যেতে পারে।

৫. তালাক দেওয়ার পদ্ধতি
আপনি তালাক দিতে চাইলে তিনটি পথ আছে:

ক. স্বামীর কাছ থেকে তালাক নেওয়া:
আপনি স্বামীকে তালাক দিতে বলতে পারেন। তিনি যদি দেন (এক বা তিন তালাক), তাহলে ইদ্দত শেষে আপনি মুক্ত হয়ে যাবেন।

খ. খুলা (মহিলার পক্ষ থেকে বিচ্ছেদ):
স্বামী যদি তালাক দিতে অস্বীকার করে, তাহলে আপনি মোহর বা কিছু অর্থ ফিরিয়ে দিয়ে খুলা নিতে পারেন। এতে স্বামীর সম্মতি জরুরি। ‘আল-হিদায়া’ ও ‘ফাতাওয়া আলমগিরি’ অনুসারে, স্বামী যদি নিষ্ঠুর হয়, তাহলে খুলা বৈধ।

গ. কাজী বা ইসলামি আদালতের মাধ্যমে ফাসখ (বিবাহ বাতিল):
স্বামী যদি কালোজাদু করে এবং নামাজ না পড়ে, তাহলে আপনি স্থানীয় ইসলামি বিচারকের (কাজী) কাছে বিবাহ বাতিলের আবেদন করতে পারেন। হানাফি ফিকহে স্ত্রীকে এ ধরনের গুরুতর কারণে ফাসখের অধিকার দেওয়া হয়েছে (রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৪৮)।


আপনার জন্য নির্দিষ্ট পরামর্শ

১. কোনো স্থানীয় মুফতি বা ইসলামি পণ্ডিতের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করুন—তিনি আপনার পরিস্থিতি শুনে প্রয়োজনীয় ফাতাওয়া দেবেন।
২. স্বামীকে লিখিতভাবে তালাক চান। সে যদি না মানে, তবে খুলা বা কাজীর মাধ্যমে বিচ্ছেদ সম্পন্ন করুন।
৩. ইদ্দত (৩ মাসিক বা ৩ মাস) পালন করুন—এরপর আপনি অন্যত্র বিয়ে করতে পারবেন (যদি ইচ্ছা হয়)।
৪. আপনার বাবার বিষয়ে—তিনি আপনাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছেন, এটি অত্যন্ত অন্যায়। আপনি তাকে ইসলামি শিক্ষা সম্পর্কে জানাতে পারেন, কিন্তু বাবার অনুমতি ছাড়া তালাক দেওয়া বৈধ।


গুরুত্বপূর্ণ হানাফি গ্রন্থের রেফারেন্সসমূহ

  • রদ্দুল মুহতার (২/২৪৩, ৩/৪৪৮, ৪/২৪৩): জাদু, ফাসখ ও তালাকের বিধান।
  • ফাতাওয়া উসমানি (২/৪১৫, ৩/২৫০): জাদুকারীর সাথে বিবাহের বিধান।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৩০০-৩৫০): জোরপূর্বক বিয়ে ও স্ত্রীর অধিকার।
  • বাহিশতি জেওর (বিবাহ ও তালাক অধ্যায়): নারীদের জন্য তালাক ও খুলার পদ্ধতি।
  • আল-হিদায়া (১/২৩০-২৪০): খুলা ও ফাসখের শর্তাবলি।
  • শারহু মা‘আনি আল-আসার (ইমাম তাহাবি): জাদুর প্রভাব।

সতর্কতা ও উৎসাহ

  • কালোজাদু বিশ্বাস করা এবং চর্চা করা কুফরি পর্যায়ের হতে পারে। তাই নিজের ঈমান রক্ষায় দ্রুত এ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা কর্তব্য।
  • আপনি ইতিমধ্যে ৭/৮ মাস আলাদা থেকেছেন—এটি প্রমাণ করে যে আপনার পক্ষে পুনর্মিলন সম্ভব নয়।
  • আল্লাহ তাআলা বলেন: “তারা যদি পৃথক হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তাদের প্রত্যেককে নিজ অনুগ্রহে অমুখাপেক্ষী করে দেবেন।” (সূরা নিসা: ১৩০)
  • ধৈর্য ধরে নামাজ ও দোয়া করতে থাকুন। আল্লাহ অবশ্যই পথ দেখাবেন।

উপসংহার: আপনার অবস্থায় তালাক দেওয়া বা চাওয়া শুধু জায়েজই নয়, বরং দ্বীনি ও দুনিয়াবি স্বার্থে এটি উত্তম। দ্রুত একজন অভিজ্ঞ আলেমের সহায়তায় বৈধ পদ্ধতিতে বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পন্ন করুন।

আল্লাহ তাআলা আপনার কষ্ট দূর করুন এবং আপনাকে উত্তম জীবন দান করুন। আমিন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.