ডিভোর্স ছাড়া স্ত্রীর বাবার বাড়ি থাকার বিধান

Family Life · Hanafi

Question No: 2923
Questioner: Humaira akter
Question Asked: 20 Jul 2026, 04:02 PM
Reviewed & Published: 20 Jul 2026, 04:07 PM
Views: 77
Tokens: 48,907
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম

দীর্ঘ চার বছরের সংসার জীবনে এফোর্ট দিতে দিতে ভেঙে গিয়েছি। আমার হাজব্যন্ড কথায় কথায় আমাকে বডি শ্যামিং করে। আমার প্রাইভেট পার্ট নিয়ে কথা শোনায়। আমার ঠোট নাকি কালো,আমার ব্রেস্ট ছোট। অনেকদিন বলেছি প্লিজ বডি নিয়ে কিছু বলিয়েন না এগুলো তো আমি নিজে বানাইনি। আল্লাহ বানিয়েছেন, কিন্তু তাও উনি বলে ফেলে।না করার পর সেদিন বলে ফেলে, আমি এত্ত কষ্ট পাইছি আমি সারাদিন ভাত খাইনি, শুধু কেদে গিয়েছি, কেদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছি। কিন্তু সে দেখেনি।

ভাত খাইনা বলে, সে বলে ভাত না খেলে এ বাসায় থাকা যাবেনা। আর এত্ত ন্যাকামি আমার পছন্দ না। আমি কাজে যাচ্ছি, এসে যেন দেখি তুই চলে গেছিস। আমি এগুলো সহ্য করেও যাইনি। ভেবেছি রাগের মাথায় হয়তো বলতেছে একটু পর ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পরদিন সে বাসায় এসে বলে কিরে তরে না বাবার বাসায় চলে যেতে বলেছি, এখনো যাসনি, তর লজ্জা শরম নাই থাকলে চলে যেতি। তারপর আমি আর সহ্য করতে পারিনি। আমি ব্যাগ পত্র গুছিয়ে চলে আসছি।

সে একটাবারও আমাকে আটকালো না। আরও বলে ভাবিসনা তকে আমি ফোন দিব। বাসায় গিয়ে বলে দিবি তর সাথে আমি আর সংসার করবো না। এত্ত ন্যাকামি আমার পছন্দ না।

তার কথায় কষ্ট পেয়ে কেন সারাদিন কাদলাম। ভাতও খাইনি। এগুলো তার কাছে ন্যাকামি।কিন্তু সে আমার শরীর নিয়ে বাজে মন্তব্য করে এগুলো তার কাছে কিছুইনা।

এর আগেও একবার বাসায় চলে আসছি রাগ করে। দেড় মাস সে একটা ফোনও দেয়নি। তারপর আমি ফোন দেওয়ায় বলে তর সাথে সংসার করবো না। তারপর নিজ থেকে আম্মাকে নিয়ে বাসায় যাই, তারপর দেখি তার ফোনে মেয়েদের এড করে ভরে ফেলেছে ফেইসবুকে। ছোটবেলার এক বান্ধবিকে সেধে সেধে মেসেজ দিয়েছে। তাকে সালামিও দিবে। কিন্তু বিশ্বাস করেন ঈদে একবারও আমি স্ত্রীকে সালামি দেয়না নিজ থেকে।আমি অনেক চেয়ে নেই। এগুলো আমার মনকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।

সে কথায় কথায় বলে আমাকে বিয়ে করে তার জীবন শেষ হয়ে গেছে। তার সিংগ্যাল লাইফই ভালো। ৪ বছরের সংসারে যতবার বাবার বাসায় এসেছি,১৫/২০ দিন হয়ে যেত সে আমাকে নেওয়ার কথা বলতোনা,তখন আমি রাগ করতাম কেন সে আমাকে নেওয়ার কথা বলেনা।

সে কাজ শেষে বাসায় যতক্ষন থাকে ততক্ষনই ফোনে গেমস খেলে কাটায়।কত বলি আমাকে একটু সময় দিন। কিন্তু সে কখনোই সময় দেয়না। আমি তাকে এগুলোর ব্যাপারে অনেক বুঝিয়েছি। কিন্তু সে বুঝেনা। এমন না সে কিছুই জানেনা। সে প্র‍্যাক্টিসিং দেখেই বিয়ে করি। কিন্তু এখন ৫ ওয়াক্ত নামাজ,আর দাড়ি ছাড়া তার মাঝে আর কিছুই পাইনা।

আমি বাবার বাসায় আসলে তার সাথে ঝগড়া বেশি হয় কারন সে আমাকে নিতে আসেনা। তারপর সে ২ মাস হয়ে গেলেও আমাকে ফোন দেয়না।আমি নিজ থেকে যতদিন না দেই।

তার সাথে খুব ছোট্ট একটা রুমে থাকি আমি।তাদের বাসার সব থেকে ছোট রুম।যেখানে খাট বিছিয়ে আর একটা ছোট ওয়ারড্রব ছাড়া আর কিছুই আটেনা।তার স্বাস্থ্য অনেক কম, একদম রোগা,তার প্রি ম্যাচিউর ইজাকুলেশন আছে। তাও আমি এত স্যাক্রিফাইস করে সংসার করে গিয়েছি। কখনো এগুলো নিয়ে কথা শুনাই না। কিন্তু সে আমাকে এত্ত বডি শ্যামিং করে।

এখন আমি বাবার বাসায় আসছি ১৯/২০ দিন। সে একটা ফোনও দেয়নি। সে নিজেই চলে আসতে বলেছে। আমি চাইনা সম্পর্ক টা ভেঙে যাক। সে বলেছে ডিভোর্স পাঠালে সাইন করে দিবে। আমি চাইনা তাই দো,আ করতেছি আল্লাহ যেন তার মনকে পরিবর্তন করে দেন।

সে যেন নিজের ভুল বুঝতে পারে। এখন ডিভোর্স ছাড়া যে আছি আমার কি গুনাহ হবে?
আমি অনেক বেশি ডিপ্রেসড, প্লিজ কিছু নসীহাহ করবেন সব সময় মৃত্যু ঘোরে মাথায়। একজন মেয়েকে মানুষ এতটা ঘৃনা কিভাবে করে?
এখনো লিখতেছি আর পানি পরতেছে চোখ দিয়ে। পুরুষ মানুষ এত পাষাণ হয়?
একটা পোষা প্রানীও কারো সাথে দুইদিন থাকলে তার প্রতি মায়া কাজ করে। যার জন্য এত স্যাক্রিফাইস করেছি তার কাছে আমি কিছুই না।

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমেই আপনার কষ্ট ও মানসিক যন্ত্রণার জন্য আমরা অত্যন্ত দুঃখিত। আপনি যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহ তাআলা আপনার терпение ও ধৈর্য বৃদ্ধি করুন এবং আপনার সমস্যার সমাধান করুন। আমিন।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন, যেখানে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতি দয়া, সহানুভূতি ও সম্মান প্রদর্শন করতে বাধ্য। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً
(سورة الروم: 21)
“আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।”

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, বিবাহের উদ্দেশ্য হলো শান্তি ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা। আপনার স্বামীর আচরণ—যেমন আপনার শরীর নিয়ে কটুক্তি করা, আপনার প্রতি অবহেলা, দীর্ঘদিন ফোন না করা, অন্য নারীদের সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ করা, এবং আপনাকে তালাকের হুমকি দেওয়া—এগুলো সম্পূর্ণরূপে ইসলামী শিক্ষার বিরোধী। নিম্নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উল্লেখ করছি:

১. আপনার স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য:

  • শরীর নিয়ে কটুক্তি করা হারাম: আপনার শরীর নিয়ে (ব্রেস্ট, ঠোঁট ইত্যাদি) কটুক্তি করা বা ‘বডি শ্যামিং’ করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

    “মুসলিম সে ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।” (বুখারী, হাদীস: ১০)
    আপনার স্বামীর এই ভাষা কেবল অশালীন নয়, বরং তা গুনাহের কাজ।

  • স্ত্রীর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা ফরজ: স্বামীকে তার স্ত্রীর প্রতি সদাচারী হতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

    “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।” (তিরমিযী, হাদীস: ৩৮৯৫)
    আপনার স্বামী যদি আপনাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে, তবে সে নিজেই উত্তম ব্যক্তিত্ব থেকে বঞ্চিত।

  • স্ত্রীকে সময় দেওয়া: ফোনে গেম খেলে সময় কাটানো এবং স্ত্রীর প্রতি উদাসীন থাকা ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী। স্বামীর দায়িত্ব হলো পরিবারের প্রতি যত্নশীল হওয়া।

২. আপনার অবস্থান ও করণীয়:

আপনি বর্তমানে বাবার বাড়িতে রয়েছেন। এটি বৈধ, বিশেষ করে যখন আপনার স্বামী আপনাকে নিতে আসছে না এবং ফোন করছে না। ইসলামে স্ত্রীর জন্য নিজের পিতার বাড়িতে থাকা জায়েয, যদি স্বামী তার অধিকার (ভরণপোষণ ও সঙ্গদান) পূরণে ব্যর্থ হয়।

  • তালাক না দেওয়া পর্যন্ত আপনার গুনাহ হবে না: যতক্ষণ পর্যন্ত স্বামী আপনাকে তালাক না দেয়, ততক্ষণ আপনি বিবাহিতই রয়েছেন। তবে আপনি যদি নিজে থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ (খোলা) চান, তবুও জায়েয, বিশেষ করে যখন আপনার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন হচ্ছে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, স্ত্রীর জন্য খোলা নেওয়া জায়েয যদি স্বামীর আচরণ অসহনীয় হয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৫৬)

  • ডিভোর্সের হুমকি ও সাইন করার প্রস্তাব: আপনার স্বামী যদি ডিভোর্স দিতে চায়, তবে সে তা দিতে পারে। কিন্তু আপনি যদি না চান, তবে আপনি জোর করে ডিভোর্স নিতে বাধ্য নন। তবে আপনার মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এতটা বেড়ে যায় যে সহ্য করা অসম্ভব, তাহলে তালাক বা খোলাই উত্তম পথ।

৩. ইসলামী পরামর্শ:

(ক) স্বামীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করুন: আপনি যদি সম্পর্ক রক্ষা করতে চান, তবে একজন বিজ্ঞ আলেম বা পরিবারের সদস্যের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করুন। ইসলামে বিবাহ বিচ্ছেদ সর্বশেষ সমাধান। আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ
(سورة البقرة: 231)
“সুতরাং হয় সদ্ব্যবহারে রেখে দাও, অথবা উত্তম পদ্ধতিতে ছেড়ে দাও।”

(খ) আপনার দায়িত্ব: নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন। আপনি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে আপনার স্বামী আপনাকে অবহেলা করে, শরীর নিয়ে কটুক্তি করে, এবং আপনাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করে, তাহলে আপনি ইসলামী আদালতে ‘খোলা’ চাইতে পারেন। খোলার মাধ্যমে আপনি বিবাহ বিচ্ছেদ পেতে পারেন এবং এতে আপনার কোনো গুনাহ হবে না।

(গ) ধৈর্য ও দোয়া: আপনি যেমন দোয়া করছেন, আল্লাহর কাছে স্বামীর হেদায়েত কামনা করুন। তবে নিজের সুস্থতা ও মানসিক শান্তি বজায় রাখতে হবে। হতাশা বা আত্মহত্যার চিন্তা সম্পূর্ণ হারাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

“তোমাদের কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে।” (বুখারী, হাদীস: 5671)
আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা রাখুন।

৪. ডিভোর্স ছাড়া বাবার বাড়িতে থাকার বিধান:

ডিভোর্স না হওয়া পর্যন্ত আপনি বিবাহিতই। বর্তমানে বাবার বাড়িতে থাকা জায়েয, তবে স্বামীর ভরণপোষণের দায়িত্ব বহাল থাকবে। যদি স্বামী আপনাকে নিতে আসে ও সদ্ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে ফিরে যাওয়া উত্তম। কিন্তু যদি আপনার নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে আপনি স্থায়ীভাবে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন।

৫. আপনার স্বামীর আচরণের ব্যাখ্যা:

একজন পুরুষ যদি আল্লাহভীরু হয়, তবে সে কখনো স্ত্রীকে শরীর নিয়ে অপমান করবে না। আপনার স্বামীর নামাজ পড়া ও দাড়ি রাখা সত্ত্বেও এমন আচরণ তার আমলের মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতার প্রমাণ। প্রকৃত ইসলামী চরিত্র হলো নম্রতা, দয়া ও স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতি। আপনি নিজেকে দোষারোপ করবেন না—আপনি কোনো ভুল করেননি। তার দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন হওয়া দরকার।

শেষ কথা:

আপনার জন্য আমাদের পরামর্শ হলো:

  1. নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন। আত্মহত্যার চিন্তা সম্পূর্ণ বর্জন করুন।
  2. আপনার স্বামীর সাথে সরাসরি আলোচনার চেষ্টা করুন, কিন্তু যদি তিনি না শোনেন, তাহলে পরিবারের প্রবীণ বা আলেমের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করুন।
  3. যদি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অসম্ভব মনে হয়, তাহলে খোলা বা তালাক নেওয়াতে দ্বিধা করবেন না। এটি গুনাহ নয়।
  4. আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকুন: “رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ”
    (سورة الفرقان: 74)
    “হে আমাদের রব, আমাদের স্ত্রীদের ও সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের চোখ শীতল করুন।”

আল্লাহ আপনার ধৈর্যকে কবুল করুন এবং আপনার জন্য সহজ পথ নির্ধারণ করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.