অর্ধনিদ্রা অবস্থায় অনিচ্ছাকৃতভাবে ‘তালাক’ বললে কি তালাক পতিত হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রশ্নোক্ত অবস্থায় তালাক পতিত হয়নি। কারণ তালাকের জন্য বিবেক-বুদ্ধি ও ইচ্ছার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যা অর্ধনিদ্রাচ্ছন্ন বা নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় থাকে না।
হানাফি ফিকহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
তালাক শুধুমাত্র তখনই কার্যকর হয় যখন ব্যক্তি পুরোপুরি জাগ্রত, সচেতন ও নিজের উচ্চারণের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখে। নিম্নলিখিত অবস্থাগুলোতে তালাক পতিত হয় না:
১. নিদ্রা ও অর্ধনিদ্রা অবস্থা –
ইমাম কাসানী (রহ.) বাদায়ি‘উস সানায়ি‘তে বলেন:
"النائم والمغمى عليه لا يقع طلاقهما لأنهما من زائل العقل"
(নিদ্রিত ও অজ্ঞান ব্যক্তির তালাক পতিত হয় না, কারণ তাদের জ্ঞান লোপ পায়।)
(বাদায়ি‘উস সানায়ি‘, কিতাবুত তালাক, ৩/১৩৮)
ইবনু আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে বলেন:
"لو تكلم في نومه لم يقع طلاقه"
(যদি কেউ ঘুমের মধ্যে কথা বলে, তার তালাক পতিত হয় না।)
(রদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক, ৩/২৩১)
২. অনিচ্ছাকৃত বা জবরদস্তিমূলক উচ্চারণ –
যদি কেউ নিজের ইচ্ছা ছাড়া বা জোরপূর্বক তালাক বলে ফেলে, তবে তা কার্যকর হয় না। আর অর্ধনিদ্রা অবস্থায় উচ্চারণও অনিচ্ছাকৃত ও অনিয়ন্ত্রিত গণ্য হবে।
ফতোয়ায়ে হিন্দিয়ায় উল্লেখ আছে:
"وإن كان نائماً أو مغمى عليه لا يقع طلاقه"
(নিদ্রিত বা অজ্ঞান ব্যক্তির তালাক পতিত হয় না।)
(ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, কিতাবুত তালাক, ১/৩৮২)
৩. শব্দহীন উচ্চারণ –
প্রশ্নে বলা হয়েছে ব্যক্তি ‘শব্দহীনভাবে’ তালাক বলেছে। অর্থাৎ ঠোঁট ও জিহবা নাড়ালেও কোনো শব্দ বের হয়নি। হানাফি ফিকহে তালাকের জন্য স্পষ্ট উচ্চারিত শব্দ আবশ্যক (মৌখিক বা লিখিত, কিন্তু নিছক ঠোঁট নাড়ানো বা মনে মনে বলা যথেষ্ট নয়)।
ইমাম সারাখসী (রহ.) আল-মাবসূতে বলেন:
"الطلاق لا يقع بالنية ما لم يتلفظ به"
(তালাক শুধু নিয়তে পতিত হয় না, যতক্ষণ না তা উচ্চারিত হয়।)
(আল-মাবসূত, ৬/১৪)
তাই কণ্ঠস্বর ছাড়া কেবল ঠোঁট-জিহবার নড়াচড়ায় তালাক হয় না।
সারসংক্ষেপ:
- ব্যক্তি অর্ধনিদ্রাচ্ছন্ন ছিল → জ্ঞান ও ইচ্ছা দুর্বল → তালাক পতিত হয় না।
- উচ্চারণ নিয়ন্ত্রণহীন ও অনিচ্ছাকৃত ছিল → তালাক পতিত হয় না।
- শব্দহীনভাবে ঠোঁট নাড়ানো → তালাকের জন্য যথেষ্ট নয়।
অতএব, এই অবস্থায় তিনবার ‘তালাক’ শব্দ শব্দহীনভাবে বলার মাধ্যমে কোনো প্রকার তালাক পতিত হয়নি। বিবাহ বহাল আছে।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (৩/২৩১)
- ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (১/৩৮২)
- বাদায়ি‘উস সানায়ি‘ (৩/১৩৮)
- আল-মাবসূত (৬/১৪)
- ফতোয়ায়ে উসমানী (২/৪৮০)
সতর্কতা:
ভবিষ্যতে এমন অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সতর্ক থাকবেন। ঘুম বা অর্ধচেতন অবস্থায় যদি আপনা-আপনি কিছু মুখ থেকে বের হয়েও যায়, তাতে ফিকহি বিধান অনুযায়ী তা গণ্য হবে না, তবে অভ্যাসবশত সচেতনভাবে তালাক দেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি।