অসুস্থ বৃদ্ধের ঘরে সিসি ক্যামেরা প্রসংগে

Family Life · Hanafi

Question No: 2954
Questioner: Najat Newaz
Question Asked: 21 Jul 2026, 11:44 AM
Reviewed & Published: 21 Jul 2026, 11:56 AM
Views: 19
Tokens: 6,315
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিদেশে যারা শেয়ার হাউজে থাকে,, তেমনি
একটি নতুন বাড়িতে একজন প্রায় ৮০ বছর বয়সী খুব অসুস্থ বৃদ্ধ মানুষ আছেন, যিনি হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন... এবং সাথে তার স্ত্রীও থাকেন, তিনিও খুব বৃদ্ধ এবং অসুস্থ। তো এই ধরণের বৃদ্ধ মানুষের সামনে আমাদের পর্দার (আওরাহ) বিধান কী? তাদের বাড়িতে কিন্তু আমার শেয়ারে থাকছি,, এখন তাঁর সামনে কি মুখ ঢাকা বাধ্যতামূলক?
এবং বৃদ্ধের ছেলেরা অন্য দেশে থাকেন, এবখন সেই বৃদ্ধের ঘরে তার ছেলে এবং নাতিরা বৃদ্ধ লোকটির নিরাপত্তার বা সুবিধা অসুবিধা দেখার জন্য সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছে,,, সেই ক্ষেত্রে মুখ না ঢাকলে কি গুনাহ হবে?

Answer

প্রশ্ন: অসুস্থ বৃদ্ধের ঘরে সিসি ক্যামেরা ও পর্দার বিধান

উত্তর

ভূমিকা

আপনার প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত: ১. অত্যন্ত বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তির সামনে পর্দার বিধান ২. সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে দূরবর্তী অমাহরাম ব্যক্তিদের দেখা

আমরা হানাফী মতে কুরআন, হাদীস ও প্রামাণ্য কিতাবের আলোকে উত্তর প্রদান করছি।


প্রথম অংশ: অতি বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তির সামনে পর্দা

মূলনীতি

ইসলামী শরীয়তে পর্দার বিধান অমাহরাম নারী-পুরুষের মধ্যে প্রযোজ্য। তবে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে।

কুরআনের নির্দেশনা: সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১-এ আল্লাহ তাআলা বলেন:

"وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا..."

অর্থ: "এবং মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে এবং তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া।"

বৃদ্ধ ব্যক্তির বিধান

হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী)-এ বলা হয়েছে:

"أَمَّا الْعَجُوزُ الْكَبِيرُ الَّذِي لَا يَشْتَهِي وَلَا يُشْتَهَى فَلَا بَأْسَ بِالنَّظَرِ إلَيْهِ" (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)

অর্থ: "যে বৃদ্ধ ব্যক্তি কামনা করে না এবং কামনার যোগ্যও নয়, তার দিকে তাকানোতে সমস্যা নেই।"

ইমাম আবু হানীফা (রহ)-এর মত: অতি বৃদ্ধ ও দুর্বল ব্যক্তি যার মধ্যে কামনার কোনো সম্ভাবনা নেই, তার সামনে নারীর জন্য মুখ ও হাত পায়ের পাতা পর্যন্ত খোলা রাখা জায়েয আছে, তবে তা নিরাপত্তার শর্তে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৯)

ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানবী): অতি বৃদ্ধ বা অন্ধ ব্যক্তির সামনে পর্দা শিথিল করা যেতে পারে, যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৬২)

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ) বলেন: "যে বৃদ্ধ ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে যৌনক্ষমতাহীন এবং যার প্রতি কারও কামনা জাগে না, তার সামনে নারীর জন্য চেহারা ও হাত পায়ের পাতা পর্যন্ত খোলা রাখা জায়েয। তবে উত্তম হলো পর্দা করা।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৬/৪০৪)

আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান

যেহেতু উক্ত বৃদ্ধ ব্যক্তি:

  • ৮০ বছর বয়সী
  • হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী
  • অত্যন্ত অসুস্থ

সুতরাং তার সামনে মুখ ঢাকা বাধ্যতামূলক নয়, যদি নিম্ন শর্তগুলো পূরণ হয়:

  1. তার মধ্যে কামনার কোনো সম্ভাবনা নেই
  2. তার স্ত্রী উপস্থিত থাকায় নির্জনতার আশঙ্কা নেই
  3. আপনি নিজেও নিরাপদ বোধ করেন

তবে মুখ ঢেকে রাখা অধিক উত্তম ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।


দ্বিতীয় অংশ: সিসি ক্যামেরা ও দূরবর্তী অমাহরামদের দেখা

সিসি ক্যামেরার বিধান

সিসি ক্যামেরা দ্বারা চিত্র ধারণ করা এবং তা দূরবর্তী স্থান থেকে দেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহী মাসআলা।

মুফতী তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:

সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে কোনো অমাহরাম নারীকে দেখা, তা সরাসরি দেখার মতোই। যদি ক্যামেরার অপর প্রান্তে অমাহরাম পুরুষ দেখে, তবে তা জায়েয হবে না। বরং মহিলার জন্য দায়িত্ব হলো, যেখানে ক্যামেরা আছে সেখানে পর্দা করা। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৩৫)

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

বৃদ্ধের ছেলে ও নাতিরা (যারা তার অমাহরাম) দূরদেশ থেকে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে আপনার দৃশ্য দেখবে।

হানাফী ফিকহের নিয়ম:

  1. অমাহরাম পুরুষের জন্য অমাহরাম নারীর দিকে তাকানো - ইচ্ছাকৃতভাবে এবং শাহওয়াতের সাথে তাকানো হারাম। (কিতাবুল আছল, ইমাম মুহাম্মদ)

  2. মহিলার জন্য দায়িত্ব - নিজেকে পর্দা করা, যাতে অমাহরামের দৃষ্টি থেকে বাঁচা যায়।

  3. ইমাম আবু ইউসুফ (রহ) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ)-এর মত - ছবি বা ভিডিওর মাধ্যমে দেখা সরাসরি দেখার মতোই ফিতনার কারণ হতে পারে।

রদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছে:

"النَّظَرُ إلَى الْأَجْنَبِيَّةِ حَرَامٌ سَوَاءٌ كَانَ بِشَهْوَةٍ أَوْ بِغَيْرِ شَهْوَةٍ" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭০)

অর্থ: "অমাহরাম নারীর দিকে তাকানো হারাম, চাই শাহওয়াতের সাথে হোক বা শাহওয়াত ছাড়া।"

এই অবস্থায় আপনার করণীয়

যেহেতু ক্যামেরা আপনার এলাকায় স্থাপন করা এবং ছেলে-নাতিরা তা দেখবে:

  1. আপনার জন্য মুখ ও পূর্ণাঙ্গ পর্দা করা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়, কারণ অমাহরাম পুরুষরা (ছেলে ও নাতি) তা দেখবে।

  2. ক্যামেরার অবস্থান পরিবর্তন - যদি সম্ভব হয়, ক্যামেরা শুধুমাত্র বৃদ্ধের এলাকায় ফোকাস করে রাখা উচিত, যাতে আপনার এলাকা না পড়ে।

  3. ক্যামেরা বন্ধ করার অনুরোধ - আপনি যদি বাড়ির শেয়ার হন, তবে ক্যামেরা এমনভাবে স্থাপন করতে বলা উচিত যাতে আপনার উপরিভাগ না পড়ে।

  4. মুখ না ঢাকলে গুনাহ হবে - সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে আপনার দৃশ্য অমাহরাম পুরুষের কাছে পৌঁছলে এবং আপনি মুখ না ঢাকলে গুনাহ হবে। কারণ আপনি এই অবস্থায় পর্দার আদেশ লঙ্ঘন করছেন।

মুফতী তাকী উসমানী (দা.বা.) স্পষ্টভাবে বলেন:

"যদি ক্যামেরা এমন জায়গায় থাকে যেখানে মহিলাদের যাতায়াত হয় এবং অমাহরাম পুরুষ তা দেখে, তবে মহিলাদের জন্য পর্দা করা ওয়াজিব।" (ইসলাহী খুতুবাত, ৩/২৮৭)


চূড়ান্ত ফাতাওয়া

আপনার অবস্থার সারসংক্ষেপ:

| অবস্থা | বিধান | |--------|--------| | ৮০ বছর বয়সী অসুস্থ বৃদ্ধের সামনে | চেহারা খোলা রাখা জায়েয, তবে পর্দা উত্তম | | সিসি ক্যামেরায় অমাহরাম পুরুষের দেখা | মুখ ও পূর্ণ পর্দা করা ওয়াজিব |

ব্যবহারিক সমাধান:

  1. বৃদ্ধের সামনে: আপনি চেহারা খুলে রাখতে পারেন, তবে শালীন পোশাক ও সাধারণ পর্দা বজায় রাখুন।

  2. সিসি ক্যামেরার ক্ষেত্রে:

    • বাড়ির মালিক বা বৃদ্ধের ছেলেদের সাথে কথা বলে ক্যামেরার অবস্থান পরিবর্তন করুন
    • ক্যামেরা যেন শুধু বৃদ্ধের বিছানা ও প্রয়োজনীয় এলাকায় ফোকাস করে
    • আপনার রুম, রান্নাঘর বা যেখানে আপনি চলাফেরা করেন সেসব এলাকা যেন ক্যামেরার আওতায় না আসে
  3. অস্থায়ী ব্যবস্থা: যতদিন ক্যামেরা সক্রিয় আছে, ততদিন আপনি পুরোপুরি পর্দা করে চলবেন, বিশেষ করে মুখ ঢেকে রাখবেন।

  4. পরিশেষে: যদি ক্যামেরার দৃশ্য পরিবর্তন করা সম্ভব না হয়, তবে সেখানে আপনার অবস্থান পুনর্বিবেচনা করাই উত্তম।

তথ্যসূত্র

  1. রদ্দুল মুহতার - ইবনে আবিদীন (১/৪০৬, ৬/৩৭০)
  2. ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) - (৫/৩২৯)
  3. ইমদাদুল ফাতাওয়া - মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (৪/২৬২)
  4. মা'আরিফুল কুরআন - মুফতী মুহাম্মদ শফী (৬/৪০৪)
  5. ফাতাওয়া উসমানী - মুফতী তাকী উসমানী (২/৩৩৫)
  6. কিতাবুল আছল - ইমাম মুহাম্মদ বিন হাসান শায়বানী
  7. আল-হিদায়া - ইমাম আবুল হাসান আলী বিন বাকর আল-মারগীনানী
  8. উসুলুশ শাশী - নিজামুদ্দীন শাশী
  9. শারহু মাআনিল আসার - ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবী
  10. ইসলাহী খুতুবাত - মুফতী তাকী উসমানী (৩/২৮৭)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.