মায়ের পরের ঘরের মেয়ে কি মাহরাম
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমার দাদির সাথে আমার দাদার বিয়ের পর আমার বাবা হয় তিনিই তাদের একমাত্র সন্তান, এরপর দাদা-দাদির ডিভোর্স হয়ে যায় দাদির অন্যত্র বিয়ে হয় এবং সেখানে ৬ জন মেয়ে হয় , দাদির পরের ঘরের মেয়েগুলো কি আমার বাবার মাহরাম? তাদের প্রতি কি আমার বাবার কোনো দায়িত্ব কর্তব্য আছে?
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো: আপনার দাদির দ্বিতীয় স্বামীর ঘরে জন্ম নেওয়া মেয়েরা (অর্থাৎ আপনার দাদির ৬ মেয়ে) আপনার বাবার জন্য মাহরাম নন। বরং তারা আপনার বাবার জন্য নন-মাহরাম। ফলে আপনার বাবার জন্য তাদের সঙ্গে পর্দা করা ও শরয়ি দৃষ্টি বজায় রাখা জরুরি। আর তাদের প্রতি আপনার বাবার কোনো ভরণপোষণ বা অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নেই, কারণ তারা আপনার বাবার বৈমাত্রেয় বোন (মায়ের দিক থেকে) হলেও পিতার দিক থেকে কোনো সম্পর্ক নেই।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও দলিল:
১. মাহরামের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, মাহরাম হলো সেই নারী/পুরুষ যাদের সঙ্গে বিবাহ চিরতরে হারাম এবং পর্দা করা ওয়াজিব নয়। মাহরাম হওয়ার কারণ তিনটি:
১. রক্ত সম্পর্ক (যেমন: মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততি)।
২. বৈবাহিক সম্পর্ক (যেমন: শ্বশুর-শাশুড়ি, সৎ-মা/সৎ-বাবা)।
৩. দুধ সম্পর্ক (যেমন: দুধ-মা, দুধ-ভাইবোন)।
(সূত্র: আল-হিদায়া, ২/২৯৭; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৫)
২. আপনার বাবার সঙ্গে দাদির দ্বিতীয় ঘরের মেয়েদের সম্পর্ক
- আপনার দাদা-দাদির তালাকের পর দাদি দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং সেখানে ৬টি মেয়ে জন্ম নেয়।
- এই মেয়েরা আপনার বাবার মায়ের দিক থেকে সৎ-বোন (মায়ের গর্ভজাত কিন্তু বাবার ভিন্ন)।
- ইসলামি পরিভাষায় এদের বলে "الْأُخْتُ مِنَ الْأُمِّ" (বৈমাত্রেয় বোন- শুধু মায়ের দিক থেকে)।
মাহরাম হওয়ার শর্ত:
কোরআন ও হাদিসে মাহরাম নারীদের তালিকার মধ্যে বৈমাত্রেয় বোন (শুধু মায়ের দিক থেকে) উল্লেখ নেই। বরং কোরআনে বলা হয়েছে:
"حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ..."
(সূরা আন-নিসা: ২৩)
অর্থ: "তোমাদের ওপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মায়েরা, তোমাদের মেয়েরা, তোমাদের বোনেরা..."
এই আয়াতে "أَخَوَاتُكُمْ" (তোমাদের বোন) বলতে রক্তের বোন, বৈমাত্রেয় বোন (বাবার দিক থেকে), এবং বৈপিত্রেয় বোন (মায়ের দিক থেকে)—সবাই অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং হানাফি ফিকহ অনুসারে, বৈমাত্রেয় বোন (মায়ের দিক থেকে) মাহরাম নয় যদি তাদের পিতা ভিন্ন হয়। কারণ মাহরাম হওয়ার জন্য পিতার দিক থেকে সম্পর্ক আবশ্যক।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত:
- বৈপিত্রেয় বোন (শুধু পিতার দিক থেকে) → মাহরাম।
- বৈমাত্রেয় বোন (শুধু মায়ের দিক থেকে) → মাহরাম নন।
(সূত্র: বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৭৯)
হাদিসের আলোকে:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"يَحْرُمُ مِنَ الرَّضَاعِ مَا يَحْرُمُ مِنَ النَّسَبِ"
(সহিহ বুখারী: ২৬৪৫; সহিহ মুসলিম: ১৪৪৫)
অর্থ: "দুধ সম্পর্কের কারণেও সেসব সম্পর্ক হারাম হয় যা বংশগত কারণে হারাম হয়।"
অর্থাৎ রক্ত ও দুধ সম্পর্কের মাধ্যমে মাহরাম হয়, কিন্তু বিবাহের মাধ্যমে সৎ সম্পর্ক (যেমন: সৎ বোন) কেবলমাত্র তখনই মাহরাম হয় যখন বিবাহের কারণে পিতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে আপনার বাবার সঙ্গে এদের কোনো পিতৃত্বের সম্পর্ক নেই, কারণ আপনার দাদি দ্বিতীয় স্বামীর ঘরে সন্তান জন্ম দিয়েছেন।
৩. তাদের প্রতি আপনার বাবার দায়িত্ব
- যেহেতু তারা আপনার বাবার মাহরাম নন, তাই তাদের ভরণপোষণ, অভিভাবকত্ব বা উত্তরাধিকারের কোনো অধিকার নেই।
- তবে সাধারণ ইসলামি ভ্রাতৃত্বের দৃষ্টিতে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, সদাচারণ ও সহযোগিতা করা উৎসাহিত (যদি পর্দা ও শরয়ি সীমারেখা বজায় থাকে)।
- আপনার বাবার জন্য তাদের সঙ্গে পর্দা করা ওয়াজিব, যেমন অন্য নন-মাহরাম নারীর সঙ্গে পর্দা করা জরুরি।
সারসংক্ষেপ:
| বিষয় | বিধান |
|---|---|
| দাদির দ্বিতীয় ঘরের মেয়েরা কি বাবার মাহরাম? | না, তারা নন-মাহরাম। |
| তাদের প্রতি বাবার দায়িত্ব? | ভরণপোষণ বা অভিভাবকত্ব নেই। শুধু ইসলামি ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে শিষ্টাচার। |
| পর্দার বিধান? | বাবার জন্য তাদের থেকে পর্দা করা ওয়াজিব। |
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।