পরিবারের অমতে বা অভিভাবক ছাড়া মেয়ের বিয়ে করার বিধান এবং দ্বীনদার পাত্রের গুরুত্ব।

Family Life · Hanafi

Question No: 2900
Questioner: Jerin
Question Asked: 20 Jul 2026, 11:06 AM
Reviewed & Published: 20 Jul 2026, 11:10 AM
Views: 65
Tokens: 6,342
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আ'লাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আইওএমের আমার এক বোন অনেক বছর ধরে বিয়ের জন্য চেষ্টা করছে কিন্তু হচ্ছে না। আপুর বয়স প্রায় ২৮ /২৯ হতে চললো। আপুর মেইন সমস্যা তার পরিবারে। আপু দ্বীনদার ছেলেকে বিয়ে করতে চায় কিন্তু তার পরিবার তেমনটা চায় না।চায় না বলতে বিরোধী না কিন্তু দ্বীনকে প্রাধান্য দেওয়া আহামরি পছন্দ করেন না। বিরক্তি প্রকাশ করেব। আপুর অনেক বিয়ের সম্বন্ধই এসেছে কিন্তু আপুর বাবা তার কোনো দায়িত্ব নেই নি। এমনকি তার ভরণপোষণের দায়িত্বও নেয় না আর না তার সাথে কোন প্রকার কথা বলে। এক কথায় বাসা থেকে কেউ দায়িত্ব নিয়ে আপুকে বিয়ে দিচ্ছে না। সবার গা ছাড়া ভাব। ফ্যামিলির সবাইকে মুখ ফুটে বলেও বুঝিয়েছে। আপুর হালত এমন যে না সে বলতে পারছে আর না সে সহ্য করতে পারছে। নিজের চিন্তাকে হেফাজত করা তার জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার জিন-যাদুর সমস্যাও আছে। তার বিয়ে করার ইচ্ছা অত্যাধিক তীব্র। এমতাবস্থায় তার কি করা উচিত? ফ্যামিলি ব্যাতিত কোনো ভাবে বিয়ে করা সম্ভব বা কি করা যেতে পারে?
তার এই হালত থেকে বের হওয়ার জন্য আপনার কাছে কিছু পরামর্শ চাচ্ছি।

জাযাকাল্লাহ খইরন।

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমত, আপনার বোনের জন্য আমাদের আন্তরিক দু‘আ যে আল্লাহ তাআলা তার জন্য উত্তম পাত্র ও সহজ উপায়ে বিয়ের ব্যবস্থা করে দিন। আমীন।

আপনার বোনের সমস্যাটি বেশ জটিল, তবে ইসলামী নির্দেশনার আলোকে আমরা কয়েকটি ধাপে সমাধানের চেষ্টা করব।


১. দ্বীনদার পাত্রের গুরুত্ব

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ خُلُقَهُ وَدِينَهُ فَزَوِّجُوهُ
“যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি (বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে) আসে, যার চরিত্র ও দ্বীন তোমরা পছন্দ কর, তাহলে তাকে বিয়ে দাও।”
(তিরমিযী, হাদীস: ১০৮৪; ইবনু মাজাহ, হাদীস: ১৯৬৭)

আপনার বোন দ্বীনদার পাত্র চাওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার যদি দ্বীনকে অগ্রাধিকার না দেয়, তবে তাদের সাথে নম্রভাবে বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকুন। তবে বাবা বা অভিভাবক যদি অন্যায়ভাবে বাধা দেন, তাহলে ইসলাম তাদের এখতিয়ার সীমিত করেছে।


২. অভিভাবক ছাড়া বিয়ে করার শর‘ঈ বিধান

হানাফী মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মনের নারী নিজে নিজে বিয়ে করার অধিকার রাখেন— যদি তিনি সাক্ষী ও মোহরসহকারে বিয়ে করেন। তবে অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া বিয়ে করাকে ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) মাকরূহ বলেছেন, কিন্তু বিয়ে শুদ্ধ হবে। আর ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে, অভিভাবক ছাড়া নারীর বিয়ে শুদ্ধ নয়। কিন্তু ফতোয়া সাধারণত ইমাম আবূ হানীফার মতের ওপরেই দেওয়া হয়, বিশেষ করে প্রয়োজনের সময়।

রদ্দুল মুহতার-এ এসেছে:

وَالصَّحِيحُ أَنَّهَا تَنْكِحُ نَفْسَهَا بِكْرًا كَانَتْ أَوْ ثَيِّبًا، إلَّا أَنَّ ذَلِكَ مَكْرُوهٌ لِأَنَّهُ تَشْبِيهٌ بِالْبَغَايَا
“সঠিক মত হলো: নারী (প্রাপ্তবয়স্কা) নিজে নিজে বিয়ে করতে পারে, সে কুমারী হোক বা বিধবা; তবে এটা মাকরূহ, কারণ তা ব্যভিচারিণীদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।”
(রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫)

তবে আপনার বোনের পরিবার যদি একেবারেই দায়িত্ব না নেয়, তাহলে তিনি তার পক্ষ থেকে অন্য কোনো আত্মীয় (যেমন চাচা, মামা, বড় ভাই) বা স্থানীয় ইমাম/মসজিদের কমিটি-কে অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ করতে পারেন। হানাফী ফিকহে ‘ওয়ালী’র ধারাবাহিকতা হলো: পিতা, তারপর পিতার পিতা, তারপর ভাই, তারপর চাচা— এভাবে। যদি কেউই না থাকে বা সবাই অস্বীকার করে, তাহলে সুলতান বা কাজী অথবা নির্ভরযোগ্য মুসলিম ব্যক্তি অভিভাবক হতে পারেন।

(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৭৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৮৭)


৩. বিশেষ পরিস্থিতিতে করণীয়

  • প্রথমে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যান— তাদেরকে দ্বীনদার পাত্রের ফজিলত বোঝান। হতে পারে তারা বোঝে না, তাই ধৈর্য ও হিকমতের সাথে বুঝান।
  • যদি পরিবার সম্পূর্ণ অসহযোগিতা করে এবং বিয়ে দিতে অস্বীকার করে, তাহলে আপনি (অর্থাৎ প্রশ্নকর্তা) বা বোনের পক্ষ থেকে কোনো দ্বীনদার ব্যক্তি (যেমন: মসজিদের ইমাম) অভিভাবক হয়ে বিয়ের আয়োজন করতে পারেন। বিয়ের সময় দুইজন সাক্ষী ও মোহর নির্ধারণ করতে হবে।
  • বাবা যদি দায়িত্ব না নেয়, তাহলে তার অনুমতি নেওয়া জরুরি নয়, বরং অন্য অভিভাবকের মাধ্যমে বিয়ে করাই শরীয়তসম্মত হবে। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২১৫)

৪. জিন-যাদুর সমস্যা ও মানসিক চাপ

  • জিন বা যাদুর কারণে আপনি যদি মনে করেন বিয়ে আটকে আছে, তাহলে নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত (সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস) করুন এবং সকাল-সন্ধ্যার দু‘আ পড়ুন।
  • রুকইয়াহ (আইনি ঝাড়ফুঁক) করাতে পারেন কোনো দ্বীনদার আলেমের মাধ্যমে।
  • মানসিক চাপ কমানোর জন্য তাহাজ্জুদ, ইস্তিগফার ও দরুদ শরীফ বেশি করে পড়ুন। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখুন।

৫. গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

  • ইস্তিখারা করুন— বিয়ে করার আগে নিয়মিত ইস্তিখারা পড়ুন এবং শুভ সিদ্ধান্ত নিন।
  • কোনো সুলুক-সাধনা বা স্বপ্নের পিছনে না ছুটে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিন।
  • প্রয়োজনে একজন বিচারক (কাজী) বা আলেমের সাহায্য নিন— যিনি অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
  • ধৈর্য ধরুন। বিয়ে আল্লাহর ইচ্ছায় হয়। যখন সময় হবে, সহজ উপায়ে হয়ে যাবে।

সারসংক্ষেপ

আপনার বোন যদি প্রাপ্তবয়স্কা ও সুস্থ মস্তিষ্কের হন, তাহলে তিনি পরিবারের অনুমতি ছাড়াই বিয়ে করতে পারেন— তবে উত্তম হলো অভিভাবকের সমর্থন নেওয়া। যেহেতু পরিবার দায়িত্ব নিচ্ছে না, তাই তিনি স্থানীয় ইমাম বা কোনো দ্বীনদার আত্মীয়কে অভিভাবক করে বিয়ে করতে পারেন। বিয়ের জন্য শুধু দ্বীনের মানদণ্ডে পাত্র নির্বাচন করুন এবং সাক্ষী-মোহর ঠিক রাখুন।

আল্লাহ তাওফীক দিন।

জাযাকাল্লাহ খইরন


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.