হাজবেন্ডকে না জানিয়ে কোথাও যাওয়া কি জায়েয?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: স্বামীকে না জানিয়ে কলেজে যাওয়া কি জায়েজ?
উত্তর
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তর দেওয়া হলো:
স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া জায়েজ নয়। বিশেষ করে যখন স্বামী স্পষ্টভাবে আপনাকে বলেছেন যে ৮ দিন ক্লাস না করতে। তাই স্বামীকে না জানিয়ে কলেজে যাওয়া জায়েজ হবে না।
দলিল ও ব্যাখ্যা
১. কুরআন ও হাদীসের আলোকে
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যখন কোনো স্ত্রী তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া বের হয়, তখন তার উপর আল্লাহর অভিসম্পাত ও ফেরেশতাদের অভিশাপ বর্ষিত হয় যতক্ষণ না সে তওবা করে বা ফিরে আসে।" (সুনানুল বায়হাকী, ৭/৯৩; কানযুল উম্মাল, হাদীস: ৪৫১২৮)
হাদীসে আরও এসেছে:
"তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল, আর স্ত্রী তার স্বামীর ঘর ও সম্পদের দায়িত্বশীল।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৮৯৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৮২৯)
২. হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহ থেকে
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) -এ বলা হয়েছে:
"স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর জন্য ঘর থেকে বের হওয়া জায়েজ নয়, যদিও তা পিতামাতার সাথে দেখা করার জন্যও হয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৩৮)
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) -তে এসেছে:
"স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে স্ত্রীর বাইরে যাওয়া বা স্বামীর ঘর ত্যাগ করা বৈধ নয়।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৪২)
বেহেশতী জেওর -এ মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) বলেন:
"স্ত্রীর জন্য স্বামীর ইচ্ছার বিপরীতে বাইরে যাওয়া জায়েজ নয়। স্বামী যদি অনুমতি না দেয়, তাহলে স্ত্রীকে বাধ্য হয়ে ঘরে থাকতে হবে।" (বাহিশতী জেওর, দশম অধ্যায়)
৩. ফাতাওয়া উসমানী ও ইমদাদুল ফাতাওয়া থেকে
ফাতাওয়া উসমানী -তে এসেছে:
"স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া কলেজ বা স্কুলে যেতে পারবে না। যদি পড়ালেখা ফরজ বা ওয়াজিব না হয়, তবে স্বামীর অনুমতি নেওয়া জরুরি।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৫৪)
ইমদাদুল ফাতাওয়া -তে মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) লিখেছেন:
"স্ত্রী যদি স্বামীকে না জানিয়ে কোথাও যায়, তবে তা নাজায়েজ ও গুনাহ। স্বামী জানতে পারলে রাগ করবে এটা আশংকা থাকলে তো আরও বড় গুনাহ।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩১)
আপনার বিশেষ পরিস্থিতির বিবেচনা
শিক্ষার গুরুত্ব
শিক্ষা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্বামীর অনুমতি ছাড়া গোপনে পড়াশোনার জন্য বের হওয়া জায়েজ নয়। কারণ স্বামীর আনুগত্য ফরজ, আর পড়ালেখা সাধারণভাবে ফরজ নয় (যদি না এটি দ্বীনী শিক্ষা হয় যা ফরজে আইন)।
স্বামীর সাথে সমঝোতা
আপনি আপনার স্বামীর সাথে বিনীতভাবে আলোচনা করতে পারেন। আপনার পড়াশোনার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে বলতে পারেন। সম্ভবত তিনি দুইদিনের জন্য অনুমতি দিতে পারেন। কিন্তু তার অনুমতি ছাড়া গোপনে যাওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
শিক্ষকদের অপছন্দ
আপনার শিক্ষকরা যদি মেয়েদের পড়ানোর ব্যাপারে কোনো আপত্তি না রাখেন, তাহলে সেটি ভিন্ন কথা। কিন্তু তারা যদি শরীয়তবিরোধী কোনো বিষয় অপছন্দ করেন, তবে সেটি তাদের ব্যক্তিগত মতামত মাত্র।
সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ
আপনার করণীয়:
-
স্বামীর সাথে আলোচনা করুন - আপনার শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তাকে বুঝিয়ে বলুন। তিনি হয়তো ২ দিনের জন্য অনুমতি দিতে পারেন।
-
সমঝোতার চেষ্টা করুন - আপনি ৮ দিনের মধ্যে ৫ দিন তার সাথে থাকবেন, কিন্তু বাকি ৩ দিন আপনি ক্লাস করতে চান - এ বিষয়ে আলোচনা করুন।
-
কখনোই স্বামীকে না জানিয়ে বা তার অনুমতি ছাড়া বের হবেন না - এটি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে নাজায়েজ।
-
স্বামীর কথা শুনুন - যেহেতু স্বামী আপনাকে ৮ দিন তার সাথে থাকতে বলেছেন এবং তিনি ৫ দিন আপনার সাথে থাকবেন, আপনার উচিত তার কথা মেনে নেওয়া। এটি আপনার বৈবাহিক সম্পর্কের জন্যও কল্যাণকর।
সারসংক্ষেপ: স্বামীকে না জানিয়ে কলেজে যাওয়া জায়েজ নয়। আপনাকে স্বামীর কথাই শুনতে হবে এবং তার সাথে আলোচনা করে কোনো সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য সহজ করে দিন এবং আপনার শিক্ষা ও পারিবারিক জীবনে বরকত দান করুন। আমীন।