পেশাবের রাস্তা দিয়ে কিছু বের হয়েছে মনে হলে, নামাজ কি হবে?
Taharah Purity · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমি আবার অযু করে ফরজ আদায় করতে মসজিদে যাই, ততখনে জামাত ও শেষ। তাই একা আদায় করি।
বর্তমানে আমার করনীয় কি?
Answer
উত্তর
আপনার প্রশ্নটি ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) ও পবিত্রতা সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা। নিচে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে, এবং বিশেষত শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম, শাইখ ইবনে বায, শাইখ আলবানী, শাইখ ইবনে উসাইমীন ও শাইখ সালেহ আল-ফাওযান রহিমাহুমুল্লাহ-এর মতামতের ভিত্তিতে উত্তর প্রদান করা হলো।
১. আপনার জোহরের ৪ রাক‘আত সুন্নাত সালাতের ব্যাপারে বিধান
- আপনি উক্ত সুন্নাত সালাত আদায় করেছিলেন ওযু অবস্থায়। সালাতের মধ্যে আপনার মনে হয়েছিল যে প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে কিছু বের হয়েছে, কিন্তু আপনি শয়তানের ওয়াসওয়াসা মনে করে সালাত চালিয়ে যান।
- সালাত শেষে আপনি দেখতে পান যে, সূচের অগ্রভাগের মতো সামান্য পরিমাণ তরল বের হয়েছে। আপনার দৃঢ় ধারণা যে এটি সালাতের ভিতরেই হয়েছিল।
এক্ষেত্রে মূলনীতি হলো:
যদি কোনো ব্যক্তি সালাতে থাকাকালীন কোনো নাপাকী (পেশাব, বায়ু ইত্যাদি) বের হওয়ার ব্যাপারে শুধু সন্দেহ পোষণ করে, তবে তার সালাত বৈধ থাকবে এবং সে সালাত চালিয়ে যাবে। কারণ শয়তান ওয়াসওয়াসা দিয়ে সালাত নষ্ট করতে চায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا كَانَ فِي الصَّلَاةِ، جَاءَهُ الشَّيْطَانُ، فَقَالَ: إِنَّكَ أَحْدَثْتَ، فَلَا يَنْصَرِفَنَّ حَتَّى يَسْمَعَ صَوْتًا أَوْ يَجِدَ رِيحًا» “তোমাদের মধ্যে যখন কেউ সালাতে থাকে, তখন শয়তান এসে বলে: ‘তুমি ওযু ভঙ্গ করেছ’, সুতরাং সে যেন সালাত থেকে বের না হয়, যতক্ষণ না সে শব্দ শোনে বা গন্ধ পায়।”
(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৬১)
- তবে আপনার ক্ষেত্রে সালাত শেষে আপনি নাপাকীর অস্তিত্ব দেখেছেন এবং দৃঢ় ধারণা করছেন যে তা সালাতের ভিতরেই বের হয়েছিল।
শাইখ ইবনে উসাইমীন রহিমাহুল্লাহ বলেন:
“যদি কোনো ব্যক্তি সালাত শেষে কিছু আর্দ্রতা দেখে এবং নিশ্চিত হয় যে তা সালাতের ভিতরেই বের হয়েছে, তাহলে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে এবং তাকে পুনরায় আদায় করতে হবে। কিন্তু যদি সে নিশ্চিত না হয়, বরং সন্দেহ করে, তাহলে তার সালাত সহীহ।”
(মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন, ১১/২২৬)
-
কিন্তু আপনার ব্যাপারে বিশেষ বিবেচনা:
যেহেতু আপনি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত (প্রায়ই মনে হয় কিছু বের হয়েছে), তাই আপনার ধারণা ওয়াসওয়াসার কারণে বেশী প্রভাবিত। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন:
“যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত, সে সাধারণ মানুষের মতো নিশ্চিত হতে পারে না; বরং তার নিশ্চিত ধারণাও ওয়াসওয়াসার কারণে দুর্বল। তাই শরী‘আত তাকে আদেশ দিয়েছে যে, সে সন্দেহের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করুক এবং ইবাদত চালিয়ে যাক।”
(মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ২১/২২০) -
শাইখ ইবনে বায রহিমাহুল্লাহ-এর ফতোয়া:
“ওয়াসওয়াসীর জন্য বিধান হলো, সে তার সন্দেহ ও ধারণার দিকে ভ্রুক্ষেপ করবে না। সালাত শেষে যদি কোনো আর্দ্রতা দেখে, তবে সেটা পেশাব না জিনি বা ঘাম হতে পারে। সে যদি সালাতের ভিতর তা বের হওয়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হয়, তবে তার সালাত সহীহ। আর সাধারণত ওয়াসওয়াসীর পক্ষে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তাই তাকে সালাত পুনরায় পড়তে হবে না।”
(নূরুন ‘আলাদ দারব, ফতোয়া নং ১১)
সুতরাং আপনার জোহরের সুন্নাত সালাত সহীহ হয়েছে বলে গণ্য হবে, ইনশাআল্লাহ। কারণ আপনি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত, এবং সালাতের ভিতর বের হওয়ার ব্যাপারে আপনার ধারণা পুরোপুরি নিশ্চিত নয় বরং একটি দৃঢ় ধারণা মাত্র, যা ওয়াসওয়াসার কারণে উৎপন্ন হয়েছে। আপনি সালাত চলাকালে সেটা অনুভব করেও ওয়াসওয়াসা মনে করে সালাত চালিয়ে গিয়েছিলেন—এটাই সঠিক পদ্ধতি। পরে দেখলেও সেই মুহূর্তে আপনি নিশ্চিত ছিলেন না, তাই আপনার সালাত ভঙ্গ হয়নি।
২. ফরয সালাতের ব্যাপারে
আপনি আবার অযু করে ফরয সালাত আদায় করেছেন। এটি সম্পূর্ণ সহীহ ও যথেষ্ট। জামা‘আত শেষ হয়ে গেলে একাকী পড়াতে কোনো দোষ নেই।
৩. বর্তমানে আপনার করণীয়
ক. ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার উপায়:
১. আপনি যখন ওযু করবেন বা সালাত আদায় করবেন, তখন শয়তানের এই ওয়াসওয়াসাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করুন। যদি মনে হয় কিছু বের হয়েছে, তবে নিশ্চিত শব্দ বা গন্ধ না পেলে তা গ্রাহ্য করবেন না।
২. সালাত শেষে নিজের কাপড় বা শরীর চেক করবেন না। এতে ওয়াসওয়াসা বেড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِذَا وَجَدَ أَحَدُكُمْ فِي بَطْنِهِ شَيْئًا، فَأَشْكَلَ عَلَيْهِ أَخَرَجَ مِنْهُ شَيْءٌ أَمْ لَا، فَلاَ يَخْرُجَنَّ مِنَ الْمَسْجِدِ حَتَّى يَسْمَعَ صَوْتًا أَوْ يَجِدَ رِيحًا» “যদি তোমাদের কারো পেটে কিছু অনুভব হয় এবং সে সন্দেহ করে যে তা থেকে কিছু বের হয়েছে কি না, তবে সে যেন মসজিদ থেকে বের না হয়, যতক্ষণ না শব্দ শোনে বা গন্ধ পায়।” (সহীহ মুসলিম)
খ. সালাত পুনরায় আদায় করা প্রসঙ্গে:
- আপনার জোহরের সুন্নাত সালাত পুনরায় পড়তে হবে না, কারণ উপরোক্ত আলোচনা অনুযায়ী তা সহীহ।
- ফরয সালাতও যথাযথভাবে আদায় হয়েছে, তাই পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নেই।
গ. সাধারণ নির্দেশনা:
-
আপনার ওয়াসওয়াসা দীর্ঘস্থায়ী হলে একজন আলিম বা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিতে পারেন। তবে সবচেয়ে বড় প্রতিকার হলো আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং শয়তানের কুমন্ত্রণাকে তুচ্ছজ্ঞান করা।
-
শাইখ সালেহ আল-ফাওযান হাফিযাহুল্লাহ বলেন:
“ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হলো, এতে মনোযোগ না দেওয়া এবং ‘আমি আল্লাহর উপর ভরসা করলাম’ বলে ইবাদত চালিয়ে যাওয়া। শয়তান পালিয়ে যায় যখন তাকে উপেক্ষা করা হয়।”
(আল-মুনতাকা, ২/১৩৪)
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | সিদ্ধান্ত | |------|-----------| | জোহরের সুন্নাত (৪ রাক‘আত) | সহীহ; পুনরায় পড়তে হবে না। | | ফরয (একাকী পড়া) | সহীহ; জামা‘আত ছুটে যাওয়ায় দোষ নেই। | | ওয়াসওয়াসা মোকাবেলা | সন্দেহ উপেক্ষা করুন, চেক না করা, নিশ্চিত না হলে কিছুই গণ্য নয়। |
আল্লাহই তাওফীকদাতা। আপনার ইবাদতগুলো কবুল করুন এবং ওয়াসওয়াসা থেকে রক্ষা করুন। আমীন।
আল্লাহু আলাম।