সূরা সাফফাতের ১০০ নম্বর আয়াত কি শুধু নিঃসন্তানদের জন্য?
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
কিছুদিন আমাকে আমার এক আত্নীয় বোন চিন্তাগ্রস্ত হয়ে অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করে। আমার ওই বোনের ৩সন্তা। ৩জনেই একেবারে পিঠাপিঠি৷ যার জন্য আপুর একটু কষ্ট হয়। তবে সে সন্তুষ্টচিত্তে সন্তান লালন-পালন করছেন।
সে তার সন্তানদের জন্য ইবরাহীম আলাইহিস সালামের করা দুআ টি করেন।।رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ
কিন্তু সে হটাৎ খুবই চিন্তিত হয়ে জানতে চায় এই দুয়া কি শুধু নিঃসন্তান রা পড়ে?। সে পিঠাপিঠি বাচ্চা পালতে গিয়ে যেহেতু খুবই কষ্ট এর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তাই এখন পরবর্তীতে এখন আর সন্তান চান না। এদেরকেই উত্তম ভাবে বড় করতে চান।
মুলত তার অন্তরে ভয়।।
আমি তাকে বুঝিয়েছি। কিন্তু সে ফতোয়া জানতে চাচ্ছে - তার মনে ওয়াসওয়াসা আসতেছে বা সে শিওর হয়ে জানতে চাচ্ছে সে কি তার ৩সন্তানের জন্য এই দুয়া করতে পারবে?
নাকি এই দুয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আবার সন্তান চেয়ে প্রার্থণা বুঝাচ্ছে?
খুবই আফওয়ান প্রশ্নটা এরকম হওয়ায়। ওই বোনের মনের অস্থিরতা কমাতে এখানে প্রশ্ন করা।
Answer
উত্তর
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
প্রশ্নটির জন্য ধন্যবাদ। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যা অনেকের মনে জাগতে পারে। নিচে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এবং নির্ভরযোগ্য সালাফী উলামাদের মতামত অনুযায়ী উত্তর প্রদান করা হলো।
দুআটির অর্থ ও প্রসঙ্গ
সূরা আস-সাফফাতের ১০০ নম্বর আয়াতে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বলেছেন:
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ
"হে আমার রব! আমাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত (একটি সন্তান) দান করুন।" (সূরা আস-সাফফাত: ১০০)
এটি ইবরাহীম (আ.)-এর একটি দুআ, যা তিনি সন্তান প্রার্থনা করে করেছিলেন। তিনি তখন নিঃসন্তান ছিলেন এবং আল্লাহ তাকে ইসমাইল ও ইসহাক (আলাইহিমাস সালাম)-এর মতো সৎ সন্তান দান করেন।
দুআটি কি শুধু নিঃসন্তানদের জন্য?
এই দুআ শুধু নিঃসন্তানদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। এর ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:
১. দুআর শব্দগত বিশ্লেষণ
দুআটিতে "هَبْ لِي" (আমাকে দান করুন) শব্দটি সাধারণ। এটি নতুন সন্তান চাওয়ার জন্যও হতে পারে, আবার বিদ্যমান সন্তানদের জন্য সৎকর্মশীল হওয়ার দুআ হিসেবেও হতে পারে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"দুআর শব্দগুলো সাধারণ। কোনো ব্যক্তি যদি তার বিদ্যমান সন্তানদের জন্য এই দুআ করে যে, 'হে আল্লাহ! তাদেরকে সৎকর্মশীল বানান', তাহলে তা জায়েজ এবং উত্তম।" (মাজমু’ ফাতাওয়া)
২. বিদ্যমান সন্তানদের জন্য দুআ করা
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"ইবরাহীম (আ.) নিঃসন্তান অবস্থায় এই দুআ করেছিলেন। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি তার ইতিমধ্যে থাকা সন্তানদের জন্য এই দুআ করে, তাহলে তা জায়েজ। কারণ সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে যে, তার সন্তানরা যেন সৎকর্মশীল হয়।" (তাফসীর সূরা আস-সাফফাত)
৩. দুআর মাধ্যমে নতুন সন্তান প্রার্থনা বুঝায় কি?
না, এটি জরুরি নয়। দুআটি পড়ার অর্থ এই নয় যে, আপনি নতুন সন্তান চাইছেন। আপনি যদি শুধু বিদ্যমান সন্তানদের জন্য দুআ করেন, তাহলে আপনার নিয়ত অনুযায়ী তা গণ্য হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
"নিশ্চয়ই আমল নির্ভর করে নিয়তের উপর, এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়ত করে তাই পায়।" (সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)
৪. ওয়াসওয়াসা দূর করার উপায়
শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"শয়তান মানুষকে বিভিন্ন ওয়াসওয়াসায় ফেলে। আপনার বোনের উচিত আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং দুআ করতে থাকা। দুআ শুধু নিঃসন্তানদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। তিনি তার সন্তানদের জন্য এই দুআ পড়তে পারেন এবং এর মাধ্যমে তাদের সৎকর্মশীল হওয়ার জন্য প্রার্থনা করতে পারেন।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব)
৫. উত্তম বিকল্প দুআ
যদি তার মনে আরও প্রশান্তি চায়, তাহলে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শেখানো দুআ পড়তে পারেন:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
"হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য ইমাম বানিয়ে দিন।" (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)
উপসংহার
-
সূরা আস-সাফফাতের ১০০ নম্বর আয়াতের দুআটি শুধু নিঃসন্তানদের জন্য নয়। যে কোনো মুসলিম পিতামাতা তাদের সন্তানদের জন্য এটি পড়তে পারেন।
-
এই দুআ পড়লে নতুন সন্তান প্রার্থনা করা বুঝায় না। নিয়তের উপর ভিত্তি করে তা গণ্য হবে। তিনি যদি শুধু বিদ্যমান সন্তানদের সৎকর্মশীল হওয়ার জন্য দুআ করেন, তাহলে তা বৈধ।
-
ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার উপায়: শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে, দুআ কোনো নির্দিষ্ট অবস্থার জন্য সীমাবদ্ধ নয়।
-
শাইখ সালিহ আল-ফাওজান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন: "ইবরাহীম (আ.)-এর দুআটি সাধারণ। এটি নতুন সন্তান চাওয়ার জন্যও ব্যবহার করা যায়, আবার বিদ্যমান সন্তানদের সৎকর্মশীল করার জন্যও। কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।" (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওজান)
সারকথা: আপনার বোন তার ৩ সন্তানের জন্য এই দুআ পড়তে পারেন। এতে কোনো সমস্যা নেই। এটি তাকে সন্তানদের ভালোভাবে লালন-পালন করার শক্তিও দেবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহই সর্বজ্ঞানী।