বিপরীত লিঙ্গের কাউকে চিকিৎসার স্বার্থে দেখা বা স্পর্শ করা
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমাদের দেশের সম্মানিত আলেমগনের কাছে প্রশ্ন আপনারা দয়া করে কি বলবেন .
মহিলা ডাক্তার বা নার্সের দ্বরা ১০০% ছতর ঢেকে বা ছতর রক্ষা করে আই ভিএফ করা সহ বেশীরভাগ গাইনী চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় আমার কি করা উচিৎ?
ছতর উন্মুক্ত করে যেসব চিকিৎসা দিতে হয় সে ক্ষেত্রে আমাদের ফিকাহ বিদরা কি ফতোয়া দিয়েছেন, দয়াকরে যদি কেউ শেয়ার করতেন! উপকৃত হতাম!
আর আমি কি ছতর নষ্ট করে যে রোগি চিকিৎসা করে আসছি গত ৩০ বছর যাবৎ তাহলে কি আমি হারাম কাজ করেছি এতদিন?
আমি কি এ গুনাহর কাজ করা থেকে বিরত থাকতে পেশা পরিবর্তন করবো? দয়াকরে জানাবেন বিজ্ঞ আলেম সমাজ!!
বিশেষ করে চিকিৎসার জন্য নারীদের একজন নারী চিকিৎসক বা নারী নার্সের সমানে ছতর খুলে চিকিৎসা দিতে হলে সে ক্ষেত্রে কি সত্যি হারাম বা কি ফতোয়া? আসলে গাইনী চিকিৎসা ছতর রক্ষা করা দেয়া প্রায় অসম্ভব। সে ক্ষেত্রে আমরা যারা হালাল হারাম মেনে চলি, তাদের কি করনীয় সে গাইডলাইন যেন ফেকাহবিদরা দেন এ নিবেদন।
বীর্জ পরীক্ষাকালে নিজের স্ত্রীর সামনে সেম্পল কালেকশন সম্ভব না হলে মাস্টেরবেশন করে সেম্পল কালেকশন করা কী নিষিদ্ধ বা হারাম কিনা,এ বিষয়ে ফতোয়া জানতে চাই। দয়াকরে জানাবেন।
দুঃখের বিষয় চিকিৎসা শাস্ত্রের এত বেশি অগ্রগতি হয়েছে যে, নবিজীর সঃ আমলে , এ বিষয় গুলো খুব একটা ফেস করতে হয় নি। এ নতুন বিষয়গুলো নিয়ে ফেকাহবিদরা যদি একটা আন্তর্জাতিক কনসেনসাসে আসতেন এবং তা ব্যপক প্রচার প্রচারণা করে মুসলিম জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারতেন তবে ইসলামের ব্যপক দাওয়াতের কাজ হতো।
আমি আমার সংস্পর্শে আসা অনেক আলেমর কাছে আমার চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজের শরীয়া ভিত্তক সকনফিশন দুর করতে অনেক সময় প্রশ্ন করার পরও সদুত্তর পাইনি। অজানা কারণে ওনারা এ বিষয়ে কথা বা প্রশ্ন এরিয়ে যান।
অথচ আমদের দেশে এমন কোন সংস্থা নাই যেখানে যোগাযোগ করে আমি শরিয়া ভিত্তিক সমস্যার সমাধান পাবো!
অপেক্ষায় থাকলাম রেফারেন্স সহ কোন মুফতি সমাধান দিবেন।
Answer
উত্তর প্রদানে সহায়ক মূলনীতি ও প্রয়োজনীয় উল্লেখ্য বিষয়:
ইসলামে পর্দা ও লজ্জাস্থান (সতর) সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে চিকিৎসার মতো প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রয়োজন (দারুরাহ) নিষিদ্ধ বিষয়কে অনুমোদন করে। এই নীতি অনুসারে, যদি কোনো রোগীর চিকিৎসা সতর উন্মুক্ত না করে সম্ভব না হয়, তবে সে পরিমাণ উন্মুক্ত করা জায়েয, তবে শর্ত হলো:
- যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই উন্মুক্ত করা হবে।
- প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো অংশ দেখা বা স্পর্শ করা যাবে না।
- সম্ভব হলে একই লিঙ্গের চিকিৎসক/নার্স দ্বারা চিকিৎসা করানো হবে।
- যদি একই লিঙ্গের চিকিৎসক না থাকে, তবে বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসক দ্বারা চিকিৎসা করানো জায়েয হবে (প্রয়োজনের তাগিদে)।
১. গাইনী চিকিৎসায় সতর উন্মুক্ত করার বিধান
প্রশ্নের সারাংশ:
মহিলা ডাক্তার/নার্সের সামনে মহিলা রোগীর সতর উন্মুক্ত করে গাইনী চিকিৎসা দিতে হয়। এটি কি হারাম? ফিকাহবিদদের ফতোয়া কী?
ফতোয়া:
যদি একই লিঙ্গের (মহিলা চিকিৎসক, মহিলা নার্স) দ্বারা চিকিৎসা হয়, তবে শুধু প্রয়োজনীয় পরিমাণ সতর উন্মুক্ত করা জায়েয। কারণ:
-
কুরআন: আল্লাহ বলেন, “তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।” (সূরা বাকারা: ১৯৫)
চিকিৎসা না করালে রোগীর জীবন বিপন্ন হতে পারে, তাই তা ‘ধ্বংস’ থেকে রক্ষার অন্তর্ভুক্ত। -
হাদিস: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “যখন আমি তোমাদেরকে কোনো বিষয়ে আদেশ করি, তখন তা যথাসাধ্য পালন করো।” (বুখারি, মুসলিম)
এখানে ‘যথাসাধ্য’ পালনের অর্থ হল, সম্পূর্ণ পর্দা রক্ষা করা সম্ভব না হলেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ পর্দা রক্ষা করতে হবে। -
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: “যদি কোনো রোগীর চিকিৎসায় তার লজ্জাস্থান দেখা বা স্পর্শ করা জরুরি হয়, তবে তা জায়েয, তবে অপ্রয়োজনীয় তাকানো বা স্পর্শ করা হারাম।” (মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ২১/৫৩০)
-
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: “মহিলা ডাক্তারের জন্য মহিলা রোগীর সতর দেখা জায়েয, তবে শর্ত হলো: একান্ত প্রয়োজন, এবং সম্ভব হলে নিজ ঘরের লোক (স্বামী, মাহরাম) বা অন্য কোনো মহিলা উপস্থিত থাকবে।” (ফাতাওয়া নুর ‘আলাদ দারব, ১২/২)
-
শায়খ ইবনে বায (রহ.)-এর ফতোয়া: “যদি কোনো মহিলার স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয়, তবে প্রথম পছন্দ হবে মহিলা ডাক্তার। যদি না থাকে, তাহলে কোনো মাহরাম পুরুষের উপস্থিতিতে পুরুষ ডাক্তার দেখতে পারেন।” (মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবনে বায, ৬/৩৭৮)
সিদ্ধান্ত:
- গাইনী চিকিৎসায় মহিলা চিকিৎসক/নার্সের সামনে সতর উন্মুক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া জায়েয, কারণ এটি প্রয়োজন (দারুরাহ)। তবে শুধু প্রয়োজনীয় অংশ এবং যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই উন্মুক্ত করতে হবে।
- সম্পূর্ণ সতর ঢেকে রাখার কোনো বিকল্প না থাকলে এই অনুমতি প্রযোজ্য।
২. গত ৩০ বছর ধরে সতর উন্মুক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া: কি হারাম কাজ হয়েছে?
প্রশ্নের সারাংশ:
আমি (প্রশ্নকর্ত্রী) একজন নারী চিকিৎসক/নার্স, ৩০ বছর ধরে রোগীদের চিকিৎসা করছি, সতর উন্মুক্ত করে। এটা কি হারাম কাজ? পেশা পরিবর্তন করা উচিত?
ফতোয়া:
-
যদি চিকিৎসাটি প্রয়োজনীয় (জীবন রক্ষা বা রোগ নিরাময়ের জন্য) হয়, এবং একই লিঙ্গের চিকিৎসকের মাধ্যমে করা হয়, তবে তা হালাল ও বৈধ। নিচের শর্তগুলো মানলে কোনো গুনাহ হবে না:
ক) রোগীকে বোঝানো হবে যে, যতটুকু সম্ভব পর্দা রক্ষা করা হবে।
খ) অপ্রয়োজনীয় কোনো অংশ দেখা বা স্পর্শ করা হবে না।
গ) চিকিৎসার সময় অন্য কোনো মহিলা বা মাহরাম উপস্থিত না থাকলেও চলে (যেহেতু চিকিৎসক নিজেই মহিলা)। -
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন: “প্রয়োজন নিষিদ্ধ বিষয়কে বৈধ করে দেয়, যদি সেই প্রয়োজন শরিয়ত স্বীকৃত হয়।” (ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন, ২/১২)
-
শায়খ সালেহ আল-ফওজান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন: “মহিলা ডাক্তার মহিলা রোগীর চিকিৎসা করলে, যদি রোগীর সতর দেখা অপরিহার্য হয়, তবে তা জায়েয। কারণ নারীদের জন্য নারী ডাক্তারই সবচেয়ে উত্তম।” (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফওজান, ২/২১৫)
অতএব:
- আপনি যে কাজ করেছেন, তা যদি উপরোক্ত শর্ত মেনে করে থাকেন, তবে গুনাহ হবে না।
- পেশা পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। বরং আপনি একজন নারী চিকিৎসক হিসেবে নারী রোগীদের সেবা করে সওয়াবের কাজ করছেন, যদি নিয়ত থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রোগীর কল্যাণ। তবে সতর রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
৩. বীর্যপরীক্ষার জন্য মাস্টারবেশন (হস্তমৈথুন) করে সেম্পল সংগ্রহ
প্রশ্নের সারাংশ:
স্ত্রীর সামনে সেম্পল কালেকশন সম্ভব না হলে মাস্টারবেশন করে বীর্যস্যাম্পল সংগ্রহ করা কি জায়েয?
ফতোয়া:
-
মূলনীতি: হস্তমৈথুন (মাস্টারবেশন) ইসলামে হারাম। কুরআনে বলা হয়েছে: “তারা তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী, তবে তাদের স্ত্রী বা দাসীদের ক্ষেত্রে ছাড়া… অতএব যে কেউ এদের বাইরে কিছু চায়, তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।” (সূরা মু’মিনুন: ৫-৭)
-
তবে প্রয়োজনের (দারুরাহ) ভিত্তিতে কিছু আলেম হস্তমৈথুনকে অনুমতি দিয়েছেন যদি কোনো বৈধ বিকল্প না থাকে এবং চিকিৎসার জন্য অত্যাবশ্যক হয়। যেমন:
-
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: “যদি বীর্যপরীক্ষার জন্য অন্য কোনো বৈধ উপায় (যেমন স্ত্রীর সাথে সহবাসের সময় কনডম ব্যবহার বা ইখতিলাম-স্বপ্নদোষ) না থাকে, তবে মাস্টারবেশন জায়েয। তবে একে অপছন্দ করা উচিত এবং যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত।” (ফাতাওয়া ইসলামিয়া, ৪/২৮৭)
-
শায়খ আল-আলবানী (রহ.) বলেন: “বীর্যস্যাম্পল সংগ্রহের জন্য যদি অন্য কোনো হালাল পদ্ধতি না থাকে, তবে মাস্টারবেশন করার অনুমতি আছে, কিন্তু এটি সর্বপ্রথম এবং সর্বোত্তম উপায় নয়।” (সিলসিলা সহীহা, ১/৮৯)
-
তবে শায়খ ইবনে বায (রহ.) এবং শায়খ সালেহ আল-ফওজান (হাফির) সাধারণভাবে হস্তমৈথুনকে হারাম মনে করেন এবং চিকিৎসার জন্যও অনুমতি দেন না, বরং তারা স্ত্রীর সহায়তা (বা সহবাসের সময় কনডম/গ্লাসে সংগ্রহ) বা স্বপ্নদোষ (ইখতিলাম) পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন। (ইবনে বায: মাজমু‘ ফাতাওয়া, ২২/২৮১; ফওজান: আল-মুনতাকা, ৩/১৩৭)
-
সুস্থ ও নিরাপদ পন্থা:
- প্রথম পদক্ষেপ: স্ত্রীর সাথে সহবাসের সময় কনডম ব্যবহার করে স্যাম্পল সংগ্রহ করা। এটি জায়েয, কারণ কনডম ব্যবহার নিষিদ্ধ নয়, বিশেষ করে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তায়।
- দ্বিতীয় পদক্ষেপ: সহবাস শেষে বাহিরে স্যাম্পল সংগ্রহ (ইনজাকুল মণী) করা, তবে তা সহবাসের পর হতে হবে এবং কোনো প্রকার হস্তমৈথুন ছাড়া।
- যদি কোনো উপায়ই না থাকে: তাহলে অনেক ফিকাহবিদের মতে প্রয়োজনে হস্তমৈথুন জায়েয, কিন্তু সেটি শর্ত সাপেক্ষে: শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় পরিমাণ, এবং বারবার নয়।
সিদ্ধান্ত:
- অধিকাংশ সালাফি আলেমের মতে, যদি অন্য কোনো বৈধ উপায় থাকে, তবে হস্তমৈথুন করা হারাম।
- যদি কোনো বৈধ উপায় না থাকে এবং চিকিৎসা জরুরি হয়, তবে প্রয়োজনে মাস্টারবেশন করার অনুমতি রয়েছে (শর্তসাপেক্ষে)। তবে অধিকতর নিরাপদ পন্থা হল স্ত্রীর সাথে সহবাসের মাধ্যমে বা কনডম ব্যবহার করে স্যাম্পল সংগ্রহ করা।
- উত্তম: আপনার স্ত্রীকে সাথে নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিন এবং ডাক্তারকে জানান যে, আপনি শুধুমাত্র জরুরি অবস্থায় মাস্টারবেশন করতে ইচ্ছুক; ডাক্তার অন্য কোনো পদ্ধতি সুপারিশ করতে পারেন।
৪. সাধারণ উপদেশ ও দাওয়াতের প্রস্তাব
শেষে প্রশ্নকর্ত্রী যে অভিযোগ করছেন—আলেমরা এ বিষয়ে একমত হতে পারেন না, এবং কোনো প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে সরাসরি শরিয়তসম্মত সমাধান পাওয়া যায়—এ প্রসঙ্গে বলব:
- ইসলামী ফিকহে ইজতিহাদের জন্য বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন নতুন সমস্যা নিয়ে আলেমদের ঐক্যবদ্ধ ফতোয়া দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমি (মক্কা, জেদ্দা) এবং ইসলামী ফিকহ একাডেমি (ভারত, পাকিস্তান) ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। তবে তা সর্বজনীন নাও হতে পারে।
- প্রয়োজনে আপনি স্থানীয় কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা ইসলামিক অনলাইন ফতোয়া পোর্টাল (যেমন: islamqa.info, islamweb.net) থেকে ফতোয়া নিতে পারেন।
- আপনার মতো একজন নারী চিকিৎসকের জন্য আমি বলব, আপনি যে কাজ করছেন তা যদি প্রয়োজন ও সতর্কতার সাথে করেন, তবে তা বৈধ। আপনার আত্মবিশ্বাস ধরে রাখুন এবং আল্লাহর কাছে ইখলাসের সাথে কাজ করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীন বুঝার ও পালনের তাওফিক দিন। আমিন।