পেশাবের সন্দেহে বিছানা কি নাপাক?
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
পবিত্রতা ও অপবিত্রতা (পাক-নাপাক) সংক্রান্ত উত্তর
প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার
একটি শিশু ঘুম থেকে ওঠার পর দীর্ঘক্ষণ বিছানায় খেলা-ধুলা ও খাওয়া-দাওয়া করে। পরে ডায়পার পরিবর্তনের সময় দেখা যায়, ডায়পার ভেদ করে পেশাব শিশুর গায়ে লেগে আছে এবং হালকা ভেজা ভাব ও পেশাবের গন্ধ আছে। কিন্তু বিছানার চাদর চেক করে কোনো ভেজা ভাব পাওয়া যায়নি। এখন প্রশ্ন হলো—সতর্কতাবশত বিছানার চাদর-কাঁথা ধুয়ে নেওয়া উচিত, নাকি যেহেতু বিছানায় পেশাবের ভেজা ভাব দেখা যায়নি, তাই তা পাক বিবেচনা করা যাবে?
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين
মূল নীতি: নিশ্চিত বস্তু সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না (اليقين لا يزول بالشك)
ইসলামি ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো—কোনো বস্তু পাক (পবিত্র) ছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হলে মূল অবস্থা (পবিত্রতা) বজায় থাকবে, যতক্ষণ না নাপাকির অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়।
الْأَصْلُ فِي الْأَشْيَاءِ الطَّهَارَةُ "আসল (মূল অবস্থা) হলো—সব বস্তু পবিত্র।"
(আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম; উসুলুশ-শাশী)
হানাফি ফিকহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. নাপাকি স্থানান্তরের শর্ত: হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, কোনো ভেজা বা তরল নাপাকি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত হলো—
- নাপাকির বাস্তব অস্তিত্ব (অর্থাৎ ভেজা ভাব, রং বা গন্ধ) থাকা।
- যে বস্তুতে নাপাকি লাগার সন্দেহ, সেখানে নাপাকির স্পষ্ট চিহ্ন না দেখা গেলে তা পাকই গণ্য হবে।
যদি কোনো কাপড়ে নাপাকি লাগার সন্দেহ হয়, কিন্তু কোনো চিহ্ন (রং, গন্ধ, ভেজা) না পাওয়া যায়, তবে তা পাক বলে গণ্য হবে।
(রদ্দুল মুহতার, ১/২০৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৯)
২. শিশুর পেশাব ও বিছানার চাদরের ক্ষেত্রে প্রয়োগ:
- এখানে শিশুর ডায়পার ভেদ করে পেশাব বের হয়েছে এবং শিশুর গায়ে লেগেছে। কিন্তু বিছানার চাদরে কোনো ভেজা ভাব, রং বা গন্ধ পাওয়া যায়নি।
- সুতরাং, শুধুমাত্র সম্ভাবনা বা সন্দেহের ভিত্তিতে বিছানার চাদর ও কাঁথাকে নাপাক বলা যাবে না।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত:
"পেশাব বা নাপাকি লাগার পর তা শুকিয়ে গেলে বা চিহ্ন না থাকলে, জায়গাটি পাক বলে গণ্য হবে, যদি না নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে সেখানে নাপাকি লেগেছে।"
(বাদায়িউস সানায়ি, ১/৮৫; আল-হিদায়া, ১/২৩)
৩. মাটির বা বসার জায়গার ক্ষেত্রে হালকা নাপাকি: যদি বিছানায় পেশাব লেগে থাকার নিশ্চিত প্রমাণ না থাকে, তাহলে তা পাকই ধর্তব্য হবে। তবে সতর্কতা হিসেবে (ইহতিয়াত) ধুয়ে নেওয়া ভালো, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম):
"যদি নাপাকির অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া না যায়, তাহলে মূল অবস্থা (পাক) বজায় রাখবে এবং ধোয়া জরুরি নয়। তবে যদি কেউ সতর্কতাবশত ধুয়ে নেয়, তবে তা উত্তম।"
(ফাতাওয়া উসমানি, ১/২২২)
৪. ইমদাদুল ফাতাওয়া (হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি রহ.)-এর নির্দেশনা:
"কাপড়ে যদি নাপাকি লাগার শুধু সন্দেহ থাকে, কিন্তু কোনো চিহ্ন না পাওয়া যায়, তাহলে সেই কাপড় পরিধান করে নামাজ পড়া জায়েজ। তবে যদি গন্ধ বা রং থাকে, তাহলে তা ধোয়া জরুরি।"
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/১৬১)
শিশুর পেশাবের বিশেষ বিধান (ছেলে বা মেয়ে শিশু):
- ছেলে শিশুর পেশাব: যে শিশু শুধু দুধ পান করে (দুধপোষ্য) এবং ঘাস-ঘাস জাতীয় খাবার খায়নি, তার পেশাব ছিটিয়ে (নাশ) দেওয়া যথেষ্ট। কিন্তু এখানে শিশুটি খাওয়া-দাওয়া করেছে, তাই এটি সাধারণ পেশাবের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।
- মেয়ে শিশুর পেশাব: মেয়ে শিশুর পেশাব ধুয়ে ফেলা জরুরি।
হাদিস:
"ছেলে শিশুর পেশাব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: 'তার পেশাবে ছিটিয়ে দাও (পানি ফেলে দাও), আর মেয়ে শিশুর পেশাব ধুয়ে ফেলো।' "
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৫২৫; মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৪৩৬)
তবে এখানে শিশুটি খাওয়া-দাওয়া করার কারণে—সে আর শুধু দুধপোষ্য শিশু নয়। তাই নাপাকি পুরোপুরি ধুয়ে ফেলা জরুরি।
সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ:
১. যেহেতু বিছানার চাদর ও কাঁথায় কোনো ভেজা ভাব বা পেশাবের চিহ্ন (গন্ধ/দাগ) পাওয়া যায়নি, তাই তা পাক (পবিত্র) গণ্য হবে। 2. শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে বিছানার চাদর ও কাঁথা ধোয়া জরুরি নয়। তবে সতর্কতা ও ইহতিয়াতের খাতিরে যদি কেউ ধুয়ে নেয়, তবে তা উত্তম ও নিরাপদ পন্থা। 3. শিশুর গায়ে পেশাব লেগে থাকলে সেটি ধুয়ে ফেলা জরুরি (কারণ এখানে শিশুটি খাবার খেয়েছে)। 4. প্রধান নীতি:
اليقين لا يزول بالشك
(নিশ্চিত অবস্থা সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না)
চূড়ান্ত ফতোয়া:
বিছানার চাদর ও কাঁথা পাক। ধোয়া জরুরি নয়। তবে যদি আপু সতর্কতাবশত ধুয়ে নেন, তাতে কোনো ক্ষতি নেই এবং এটি উত্তম।
والله تعالى أعلم بالصواب
(আল্লাহ তায়ালাই সবচেয়ে ভালো জানেন)