সুদের টাকা দানের নিয়তে ডিপিএস করা কি জায়েজ?
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
জাযাকুমুল্লাহু খইরান ফিদ্দুনিয়া ওয়াল আখিরহ
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন: ডিপিএস (DPS) বা সঞ্চয়পত্র মূলত সুদভিত্তিক একটি লেনদেন, যা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে হারাম ও নিষিদ্ধ। কারণ এতে সুদ (রিবা) জড়িত থাকে।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে সুদের বিধান:
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
"যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতের দিন দাঁড়াবে না, তবে ঐ ব্যক্তির মত, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। এটা এজন্য যে, তারা বলে, বেচাকেনাও তো সুদের মতই। অথচ আল্লাহ বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, এর সাক্ষী ও লেখক—সকলেই অভিশপ্ত।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮)
আপনার স্বামীর বিষয়ে ফয়সালা:
আপনার স্বামীর ডিপিএস করা এবং সেখানে সুদের টাকা জমা হওয়া—উভয়টিই হারাম। তবে তিনি যদি ইতিমধ্যেই এই কাজটি করে ফেলে থাকেন, তাহলে এখন করণীয়:
১. মূল টাকা ফেরত নেওয়া: তিনি ডিপিএসে যত টাকা জমা দিয়েছেন, সেটি মূলধন হিসেবে ফেরত নেওয়া জায়েজ। এটি তার নিজের সম্পদ।
২. সুদের টাকা দান করা: ডিপিএস থেকে প্রাপ্ত সুদের টাকা তিনি নিজে ব্যবহার করতে পারবেন না। এটি অবশ্যই দান করে দিতে হবে—তবে এই দান সওয়াবের নিয়তে নয়, বরং হারাম সম্পদ থেকে বাঁচার জন্য এবং নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"সুদের টাকা দান করা জায়েজ, তবে এর দ্বারা সওয়াবের আশা করা যাবে না, বরং এটি একটি অপবিত্র বস্তুকে পরিষ্কার করার মতো।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৯/২৩৭)
৩. তাওবা করা: তাকে অবশ্যই আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের সুদভিত্তিক লেনদেন থেকে বিরত থাকার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। শায়খ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যে ব্যক্তি সুদভিত্তিক লেনদেনে জড়িত হয়েছে, তার জন্য ওয়াজিব হলো অবিলম্বে তা থেকে বেরিয়ে আসা এবং তাওবা করা। আর সুদের টাকা দান করে দিলে তা তার জন্য ক্ষতিকর হবে না।" (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায: ১৯/২৪৫)
৪. আপনার স্বামীর নিয়ত: তিনি যদি বলেন যে, 'টাকা খরচ না করার নিয়তে ডিপিএস করেছি'—তবে ইসলামী শরিয়তে সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সুদমুক্ত বৈধ উপায় রয়েছে, যেমন ইসলামী ব্যাংক বা সুদবিহীন সঞ্চয় প্রকল্প। তাই তার নিয়ত ভালো হলেও পদ্ধতি হারাম হওয়ায় তা গ্রহণযোগ্য নয়।
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
'এটা কি তার জন্য জায়েজ হবে?'
- ডিপিএস করাটা জায়েজ নয়—এটি স্পষ্ট হারাম।
- সুদের টাকা দান করা জায়েজ—কিন্তু তা সওয়াবের জন্য নয়, বরং নিজের সম্পদকে হারাম থেকে পরিশুদ্ধ করার জন্য। এক্ষেত্রে তিনি দায়মুক্ত হবেন, তবে সওয়াব পাবেন না।
- তবে তিনি যদি এখনো ডিপিএসে টাকা রাখেন এবং ভবিষ্যতে সুদ নেওয়ার নিয়ত করেন, তাহলে এটি জায়েজ হবে না। তাকে অবিলম্বে ডিপিএস বন্ধ করে মূল টাকা ফেরত নিতে হবে এবং সুদ দান করে দিতে হবে।
বিজ্ঞ আলেমদের মতামত:
শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:
"সুদের টাকা নিজের জন্য ব্যবহার করা হারাম। এটি দান করে দেওয়া ওয়াজিব, তবে এই দানের মাধ্যমে সওয়াবের নিয়ত করা যাবে না। বরং এটি কেবল অপবিত্র সম্পদ থেকে বাঁচার জন্য।" (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান: ১০/২৪২)
শায়খ মুহাম্মাদ ইবন সালিহ আল-উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যে ব্যক্তি সুদের টাকা পেয়েছে, সে তা নিজে খেতে পারবে না, বরং তা দান করে দিতে হবে। আর যদি সে তা দান করে, তাহলে তার জন্য তা জায়েজ। কিন্তু সে এর দ্বারা সওয়াবের আশা করবে না।" (আশ-শারহুল মুমতি': ৬/৪০০)
সারসংক্ষেপ:
| বিষয় | ফয়সালা | |------|---------| | ডিপিএস বা সুদভিত্তিক সঞ্চয়পত্র করা | হারাম ও নিষিদ্ধ | | সুদের টাকা নিজে খাওয়া | হারাম | | সুদের টাকা দান করা | জায়েজ (তবে সওয়াব নেই, কেবল দায়মুক্তি) | | তাওবা ও ডিপিএস বন্ধ করা | অতীব জরুরি |
পরামর্শ:
আপনার স্বামী যেন অবিলম্বে ডিপিএস বন্ধ করে সুদমুক্ত বৈধ উপায়ে সম্পদ সঞ্চয় করেন। ইসলামী শরিয়তে সম্পদ রক্ষার জন্য অনেক হালাল পন্থা আছে, যেমন ইসলামী ব্যাংকিং, শরিয়াহ-সম্মত বিনিয়োগ ইত্যাদি। আল্লাহ তাওবা কবুল করুন এবং হালাল রিজিক দান করুন। আমীন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।