অন্য ধর্মের এবং অস্বচ্ছ ইনকাম এমন ব্যক্তির দেওয়া খাবার খাওয়া প্রসঙ্গে
Halal and Haram · Hanafi
Question
উস্তাদ, আমি একটি প্রতিষ্ঠানে কয়েক মাসের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিযুক্ত হয়েছি। এখন সেই প্রতিষ্ঠানের একজন হিন্দু কর্মকর্তা একটি পরীক্ষায় পাশ করেছেন, তাই তিনি অফিসের সবাইকে আগামীকাল দুপুরে লাঞ্চ করাবেন। (ব্যাপার হলো, এই কিছুদিনে যা বুঝতে পারলাম- অফিসে তাদের মধ্যে ঘুষের প্রচলন রয়েছে। বিভিন্নভাবে তারা ঘুষ নিয়ে থাকেন বলে মনে হলো)।
এখন আমার ২টি প্রশ্ন।
১. ওনার দেওয়া খাবার কি খাওয়া যাবে?
২.
[- তিনি একজন হিন্দু কর্মকর্তা (নিশ্চয়ই তিনি হালাল-হারাম বাছ-বিচার করেন না)
- তার ইনকামের সাথে ঘুষের মিশ্রণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
- অফিসের সবার সাথে আমাকেও নিশ্চয়ই লাঞ্চ দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ; সেক্ষেত্রে ডিরেক্ট সেটা রিজেক্ট করে দেওয়াও মুশকিল।]
-এমতাবস্থায় আমার করণীয় কী?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটির দুটি মূল দিক রয়েছে: (১) অমুসলিম (হিন্দু) ব্যক্তির দেওয়া খাবার খাওয়ার হুকুম এবং (২) ঘুষের অর্থ মিশ্রিত থাকার সম্ভাবনায় সেই খাবার গ্রহণের বিধান। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. হিন্দু কর্মকর্তার (অমুসলিম) দেওয়া খাবার খাওয়া
মূলনীতি: অমুসলিম ব্যক্তির নিকট থেকে খাদ্য গ্রহণ করা জায়েয, যদি তা নিম্নোক্ত শর্তে হয়—
- খাবারটি যবেহকৃত পশুর গোশত না হয় (যেমন হিন্দুদের নিকট গোশত সাধারণত ‘যবেহ’ ছাড়া প্রাপ্ত, তাই তা হারাম)।
- খাবারে সরাসরি নাজাসাত (অপবিত্র বস্তু) মিশ্রিত না হয় (যেমন মদ, শূকরের চর্বি ইত্যাদি)।
- খাবারটি কোনো ধর্মীয় উৎসব বা পূজার নৈবেদ্য না হয় (যেমন প্রতিমার উদ্দেশ্যে নিবেদিত খাবার)।
ওপরের আলোকে, যদি উক্ত হিন্দু কর্মকর্তা শুধুমাত্র নিরামিষ খাবার (যেমন ভাত, ডাল, সবজি, রুটি ইত্যাদি) অথবা হালালভাবে প্রস্তুত কোনো খাবার (যেমন হালাল গোশতের তরকারি) দেন, তাহলে তা খাওয়া জায়েয। কিন্তু যদি তিনি কোনো মাংসের পদ দেন, তবে তা যবেহকৃত হালাল পশুর কিনা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত খাওয়া জায়েয নয়। আর যদি খাবারে মদ, শূকরের মাংস বা কোনো নাপাক বস্তু মিশ্রিত থাকার সন্দেহ হয়, তাহলে তা পরিহার করা ওয়াজিব।
(সূত্র: ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৮৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৯; বাহিশ্তী জেওর, ৩/২৪)
২. ঘুষের অর্থ মিশ্রিত থাকার সমস্যা
আপনি জানিয়েছেন যে ওই প্রতিষ্ঠানে ঘুষের প্রচলন রয়েছে এবং প্রশ্নকর্তার ইনকামে ঘুষ মিশ্রিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। হানাফি ফিকহের আলোকে এই বিষয়ে বিস্তারিত নিয়ম হলো:
ক. যদি জানা যায় যে, ব্যক্তির সমুদয় সম্পদ হারাম (যেমন শুধু ঘুষ দিয়েই উপার্জন), তাহলে তার দেওয়া কোনো খাবার গ্রহণ করা জায়েয নয়। কারণ নবী করীম ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে, তার শরীর হারাম দ্বারা লালিত হয়, তাই তার জন্য জাহান্নামের আগুনই উপযুক্ত।" (মুসনাদে আহমাদ)
খ. যদি তার সম্পদ মিশ্রিত হয়—অর্থাৎ কিছু হালাল ও কিছু হারাম—তবে ফিকহবিদগণের মতভেদ আছে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, যদি হারাম অর্থের পরিমাণ নগণ্য হয় এবং অধিকাংশ হালাল হয়, তবে তার কাছ থেকে উপহার গ্রহণ করা জায়েয। কিন্তু যদি হারাম অংশ প্রাধান্য পায়, তবে তা গ্রহণ না করাই উত্তম। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, মিশ্রিত সম্পদ থেকেও গ্রহণ করা জায়েয, তবে তাকওয়ার দাবি হলো পরিহার করা। (রদ্দুল মুহতার, ৯/৫৪৮; ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩৪৩)
গ. যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন যে ওই ব্যক্তির ইনকামে ঘুষের পরিমাণ কতটুকু, এবং প্রতিষ্ঠানে ঘুষের প্রচলন থাকলেও তার ব্যক্তিগত উপার্জনের সবটুকুই যে ঘুষ তা নিশ্চিত নন, তাই এখানে সাধারণ নিয়ম হলো—যতক্ষণ না হারাম হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ বা প্রবল ধারণা (গালিবুয জ়ন্ন) না হয়, ততক্ষণ মূলত খাবার হালালই গণ্য হবে। কারণ ইসলামে বস্তু সম্পর্কে মূল বিধান হলো হালাল, যতক্ষণ না হারাম প্রমাণিত হয়। (উসুলুশ শাশী, পৃ. ২৮৬)
তবে তাকওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে এবং ঘুষের সাথে সম্পর্কিত পাপ থেকে বাঁচার জন্য নিম্নোক্ত করণীয় অনুসরণ করা উচিত।
আপনার করণীয় (প্র্যাকটিক্যাল সমাধান)
যেহেতু আপনি অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী এবং সরাসরি অস্বীকৃতি জানানো মুশকিল, তাই নিচের পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করতে পারেন—
(ক) সম্ভাব্য অজুহাত ব্যবহার করুন:
- বলতে পারেন, "আজকে আমার পেট খারাপ, ডাক্তার উপবাসের পরামর্শ দিয়েছেন।"
- বলতে পারেন, "আমি আজকে রোজা রাখছি (নফল রোজা)।" (নফল রোজা রাখা সুন্নত, এটি একটি উত্তম অজুহাত)।
- বলতে পারেন, "আমার আগে থেকেই দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা আছে, অন্য কেউ খেতে পারেন।"
(খ) যদি লাঞ্চে অংশ নিতেই বাধ্য হন, তাহলে:
- নিশ্চিত হয়ে নিন যে খাবারে কোনো হারাম বস্তু নেই (যেমন মাংস থাকলে তা হালালভাবে যবেহকৃত কিনা জিজ্ঞাসা করুন অথবা নিরাময় পদ গ্রহণ করুন)।
- মনে রাখবেন, শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে খাবারকে হারাম বলা যাবে না; বাস্তব প্রমাণ লাগবে।
(গ) ঘুষের বিষয়ে করণীয়:
- প্রতিষ্ঠানে ঘুষের প্রচলন থাকলে আপনি একজন মুসলিম হিসেবে এর বিরোধিতা করবেন—অন্তত নিজে ঘুষ দেবেন না এবং ঘুষের পক্ষে কোনো উৎসাহ দেবেন না।
- যদি আপনার ওপর ঘুষের চাপ আসে, তবে স্পষ্টভাবে ‘না’ বলুন এবং বিকল্প ন্যায়সঙ্গত পথ বের করুন।
সারসংক্ষেপ
১. হিন্দু কর্মকর্তার দেওয়া খাবার (নিরামিষ বা হালাল মাংস) খাওয়া জায়েয, যদি তা নিজে থেকে আপত্তিকর না হয়। ২. তার উপার্জনে ঘুষ মিশ্রিত থাকার সম্ভাবনার কারণে খাবারটি বর্জন করা তাকওয়ার দাবি, তবে জোর করে খাওয়ালে বা সন্দেহ মাত্রের জন্য তা হারাম হবে না। ৩. বিনয়ের সাথে অজুহাত দেখিয়ে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকাই উত্তম। যদি বাধ্য হন, তবে হালাল নিশ্চিত করে গ্রহণ করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিকের তাওফিক দান করুন এবং হারাম থেকে দূরে রাখুন। আমীন।
উল্লেখিত কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন), ৯/৫৪৮
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৮৮
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৯
- বেহেশতি জেওর, ৩/২৪
- ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩৪৩
- উসুলুশ শাশী, পৃ. ২৮৬